প্রথম দাবিটা সে ছয়মাস আগে জানায় এবং তারপরে প্রায়শই তার পুনরাবৃত্তি করেছিলো তার আম্মিজান, নানীজান আর বোনের মুক্তির বদলে এক বছর আকশি দূর্গ আক্রমণ না করবার প্রতিশ্রুতি। তিনমাস আগে তামবাল এক বার্তাবাহকের মাধ্যমে প্রেরিত এক চিঠিতে অনেক মধুর ভাষায় জানায় এসান দৌলত, খুতলাঘ নিগার আর খানজাদা প্রত্যেকেই সুস্থ আছে এবং শাহী পরিবারের উপযুক্ত ব্যবহারই করা হচ্ছে তাদের সাথে। কিন্তু চিঠিতে সে তাদের মুক্তি দেবার তার কোনো অভিপ্রায়ের কথা উল্লেখ করেনি।
বাবর এখন পূর্বদিকে পঞ্চাশ মাইল দূরে অবস্থিত শহর গাভার দিকে অগ্রসর হচ্ছে কিছুদিন আগে তামবাল ভাড়াটে চকরাখ যোদ্ধাদের সহায়তায় সেখানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে। সেখানে একটা হিসাব মেলানো এখনও বাকি আছে। সেখানকার দূর্গের চাকরাখ সর্দার তার সৎভাই আর তামবালকে শাহী প্রতিনিধি হিসাবে মেনে নিয়ে প্রথম আনুগত্য প্রদর্শনকারীদের অন্যতম। শহরটা দখল করলে তামবালকে আরেকটা জোরালো সঙ্কেত পাঠানো হবে যে, সময় হয়েছে বাবরের কাছে তার পরিবারকে ফেরত পাঠাবার।
এক ক্ষুদ্র নহরের পাশে সাময়িক যাত্রাবিরতি করে বাবর আর তার লোকেরা ঘোড়াগুলোকে পানি পান করার সুযোগ দেয়। ঘোড়ার দুধ থেকে তৈরি টক পনির কোনোক্রমে গলধঃকরণের ফাঁকে বাবর তাকিয়ে দেখে তার এক গুপ্তদূত ঘোড়ায় চড়ে এগিয়ে আসছে। বাবর চমকে উঠে দেখে তার পর্যানে একটা দেহ আড়াআড়িভাবে বাঁধা রয়েছে। লোকটার দিকে দৌড়ে গিয়ে বাবর চিৎকার করে জানতে চায়, “কি হয়েছিলো? এই লোকটা কে?”
“লোকটা একটা ব্যবসায়ী। পথের পাশে পেটে তরবারির আঘাত নিয়ে নিজেরই রক্তে অর্ধচেতন অবস্থায় পড়ে থাকার সময়ে তাকে আমি খুঁজে পেয়েছি। আমি তাকে আমার ঘোড়ার পিঠে তুলে নেবার কিছুক্ষণ পরেই বেচারা মারা যায়। অবশ্য মারা যাবার আগে সে আমাকে বলেছে যে আরও তিনজন ব্যবসায়ীর সাথে সে। এখান থেকে দশ মাইল দূরে একটা ছোট সরাইখানার উদ্দেশ্যে যাবার পথে তারা চকরাখ হানাদারদের হামলার শিকার হয়। তার তিন সঙ্গীকে হত্যা করে তাকেও মৃত ভেবে তাদের সব মালপত্র নিয়ে তারা চলে গেছে।”
“চকরাখ হানাদারদের অবশ্যই খুঁজে বের করে তার হত্যার আমরা বদলা নেবো। তোমার অধীনস্ত কয়েকজন গুপ্তদূতকে হত্যাকারীদের খুঁজতে পাঠাও।”
“সুলতান, আমার মনে হয় না তার কোনো দরকার আছে। বণিক লোকটা মারা যাবার আগে আমাকে বলেছে যে, সে চকরাখদের বলতে শুনেছে তারা সরাইখানায় যাচ্ছে, সেখানে আরও শিকার যদি তারা খুঁজে পায়…”
“তাহলে আমরা প্রথমে সরাইখানায় যাবো।”
***
গানের সুর বন্য আর কর্কশ চকরাখদের নিজেদের মতোই অনেকটা। মদের নেশায় চুরচুর হয়ে থাকা পুরুষদের কণ্ঠস্বর নতুন মাত্রায় উঠে এমন সব অশ্লীল ক্রিয়াকলাপের বর্ণনায় মেতেছে যা একাধারে শারিরীকভাবে অসম্ভব আর মোটাদাগের যে বাবর চেষ্টা করেও হাসি চাপতে পারে না। সে আড়চোখে ওয়াজির খানের দিকে তাকিয়ে দেখে সেও হাসছে।
লম্বা ঘাসের আড়ালে বাবর তার চারপাশে শুয়ে থাকা লোকদের ইশারা করে। সবাই। তারমতো পেটের উপরে ভর দিয়ে শুয়ে আছে, লুকিয়ে অপেক্ষা করছে। তারপরে সে গুঁড়ি মেরে মাটির ইট দিয়ে তৈরি একতলা সরাইখানার দিকে এগিয়ে যায় যেটা ফারগানার অন্যতম খরস্রোতা একটা নদীর অগভীর অংশের পাড়ে অবস্থিত। যেখানে হল্লাবাজেরা মচ্ছবে মেতেছে। নূপুরের নিক্কন ধ্বনি ভেসে আসতে বোঝা যায় ভেতরে বাইজি মেয়েরাও আছে। সেই সাথে কুপিত নারী কণ্ঠের সহসা একটা তীক্ষ্ণ চিৎকার আর তার সঙ্গে ভেসে আসে- পুরুষ কণ্ঠের অট্টহাসি।
দুপুর মাত্র অতিক্রান্ত হয়েছে। কিন্তু বিশজন বা তার কিছু বেশি চাকরাখরা ইতিমধ্যেই বেহেড মাতাল হয়ে পড়েছে। তারা এমনকি তাদের ঘোড়াগুলিকে ঠিকমতো বাঁধার কষ্টও করেনি এবং কিছু ঘোড়া, যাদের কেশর পুরু আর লেজ এতো লম্বা যে মাটিতে ঘষা খাচ্ছে, ইতিমধ্যেই ছুটে পালিয়েছে। চারো ব্যবসায়ীর কাছ থেকে লুট করা মালামালও তারা ভিতরে নিয়ে যাবার গরজ দেখায়নি। বণিকদের মালবাহী ধুসর খচ্চরগুলো দড়ি দিয়ে একত্রে বাঁধা এবং মনোযোগ দিয়ে চরে বেড়াচ্ছে। তাদের পিঠে আটকানো বেতের ঝুড়িগুলো দেখে মনে হয় এখনও চামড়া আর লোমে ঠাসা। চাকরাখরা মনে হয় কেবল মদের পিপে নিয়ে সরাইখানার ভিতরে প্রবেশ করেছে।
বর্বর অসভ্য, বাবর ভাবে। তাদের কপালে আজ কি লেখা আছে সেটা এখনই ব্যাটারা টের পাবে। আর এই ভাবনাটা তাদের উৎফুল্ল করে তোলে। লম্বা ঘাসের উপরে মাথা তুলে বাবর চারপাশে তাকায়। কিন্তু কাউকে দেখতে পায় না। সে ঠিক যেমনটা ভেবেছিলো, ঘোড়া বা মালামাল দেখার জন্য বাইরে কোনো বাচ্চাকে রাখার কথা ব্যাটাদের মাথাতেই আসেনি। সে এবার উঠে দাঁড়িয়ে, গুটিগুটি পায়ে সরাইখানার নীচু প্রবেশদ্বারের ডান দিকে মোটা দেয়ালের গায়ে জানালার মতো দেখতে একটা ফাঁকা জায়গার দিকে এগিয়ে গিয়ে ভেতরে সতর্কতার সাথে উঁকি দেয়। ঘরটা প্রায় খালি, কেবল ভেতরের দেয়ালের গায়ে ঠেকানো অবস্থায় একটা লম্বা কাঠের টেবিল দেখা যায়। কয়েকটা তেপায়া টুল আর একটা আধ ভাঙা বেঞ্চি দেখা যায়। ঘরের মাঝে মোটাসোটা, বোচা-নাকের একটা মেয়ে পরনে রঙচটা হলুদ রঙের ঢোলা সালোয়ারের উপরে লাল ফুলের ছাপ দেয়া একটা আঁটোসাঁটো কামিজ, পায়ে আর হাতের কব্জিতে ঘুঙুর বাঁধা। নীল সালোয়ার কামিজ পরিহিত লম্বা আরেকটা মেয়ে তার নোংরা হাতে একটা খঞ্জনী, বর্গাকার পাথরের মেঝের উপরে খালি পায়ে সজোরে পদাঘাত করে বৃত্তাকারে আবর্তিত হচ্ছে। সে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই চকরাখদের কয়েকজন, ভেড়ার চামড়ার তৈরি টুপির নিচে তাদের গোলাকার মুখ ঘামে ভিজে আছে, টলোমলো পায়ে মেয়েদের বুকে পাছায় বৃথা চেষ্টা করে থাবা দিতে এবং মুখ থুবড়ে মাটিতে আছড়ে পড়লে তাদের সঙ্গীসাথীদের উদ্দীপনা আরও বেড়ে যায়।
