“আমি কিন্তু কেবল যারা আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে তাদেরই আক্রমণ করেছি। আর আমি কখনও তোমাদের কথা ভুলে যাইনি। তোমাদের স্বাধীনতা আমার মসনদের চেয়েও বেশি কাম্য ছিল আমার কাছে।” চারপাশে তাকিয়ে, বাবর দেখে গবাক্ষের সরু ফাঁক দিয়ে ফ্যাকাশে, ধুসর আলোর একটা ধারা লুকিয়ে কখন যেন কামরায় প্রবেশ করেছে। প্রায় সকাল হয়ে এসেছে।
“তুমি এটা অর্জন করেছে। কিন্তু যা হয়ে গেছে তা হয়ে গেছে। এখন আমাদের ভবিষ্যতের দিকে তাকাতে হবে।” এসান দৌলতের কণ্ঠে একটা সতেজতা ফুটে থাকে এবং তার দৃষ্টি বাবর নিজের উপরে অনুভব করলে সে অস্বস্তিবোধ করে, যেন কোনো বাচ্চা ছেলে এখনই তার ওস্তাদের কাছে ধমক খাবে। “বাবর, তুমি এই ক’দিনে কি শিখেছো?” নানীজান তার দিকে ঝুঁকে এসে তার কব্জি আঁকড়ে ধরে। “ তোমার কথা অনুযায়ী মসনদহীন দিনগুলো থেকে তুমি কি শিখেছো?”
যুক্তিসঙ্গত একটা প্রশ্ন। এই বিপজ্জনক, মরীয়া সময় তাকে কি শিক্ষা দিয়েছে? “বিশ্বস্ত বন্ধু আর মিত্রের গুরুত্ব,” সে অবশেষে কথা খুঁজে পেয়ে বলে, “এবং তাদের যোগ্যতা অনুসারে প্রতিদান দেয়া। এছাড়া পরিষ্কার উদ্দেশ্য, একাগ্রচিত্ত কৌশল আর সেটা অর্জনের পথে কোনো কিছুকে বাধা হিসাবে গণ্য না করার প্রয়োজনীয়তা।”
এসান দৌলত সন্তুষ্টির মাথা নাড়েন। “অবশ্যই। এবং এছাড়া আর কি?”
“আমি শিখেছি একজন সুলতানের পক্ষে সবসময়ে উদারতা দেখান সম্ভব না, শ্রদ্ধা অর্জনের জন্য তাকে কঠোর হতে হবে- কখনও নির্মম। অন্যথায় তাকে দুর্বল মনে হবে। নেতৃত্ব দেবার বদলে সবার ভালবাসার পাত্রে পরিণত হবার ঝুঁকি দেখা দিতে পারে। আর সেই সাথে মিষ্টিভাষী ষড়যন্ত্রকারীর ফাঁদে পা দিয়ে বসতে পারে। আমি শিখেছিঃ আনুগত্য অর্জন করতে হলে কেবল কৃতজ্ঞতা আর সম্ভ্রম উদ্রেক করলেই চলবে না। এর সাথে সামান্য ভয়েরও মিশেল থাকতে হবে। আমি প্রথমবার ফারগানার শাসক হবার পরে বাকী বেগ, বাবা কাশক, আর ইউসুফকে প্রাণদণ্ড দেয়া উচিত ছিলো। তার বদলে আমি কেবল তাদের শাহী দায়িত্বপালন থেকে অব্যাহতি দিয়েছিলোম এবং জীবন ধারণের জন্য কোনো বাধা না দিয়ে বরং মনের ভিতরে তাদের তিক্ততা পোষণের সুযোগ দিয়েছি। এছাড়া, সমরকন্দ দখল করার পরে গ্রান্ড উজিরের কতিপয় সমর্থককেও কড়কে দেয়া উচিত ছিলো।
“তারচেয়েও বড় কথা, আমার নিয়তির প্রতি আমি আর কখনও অবহেলা প্রদর্শন করবো না। আমাদের সাথে আমার সাথে যা ঘটেছে তারপরেই কেবল আমি হাল্কা হাল্কা বুঝতে পারছি মানুষ তৈমূর লোক হিসাবে কেমন ছিলেন। মাঝে মাঝে তার নিজেকে কেমন একা মনে হয়েছে- নিজের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কাজ করতে গিয়ে তাকে কেমন অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়েছিলো। আর তাছাড়া, তাদের সব দায়দায়িত্ব পরে বহুবছর ধরে তাকে নিজের কাঁধে বহন করতে হয়েছিলো… আমি নেতৃত্ব দেবার মতো সাহসও অর্জন করেছি…ওয়াজির খানের মতো আমার যতো দক্ষ পারিষদ থাকুক আমার নিয়তি কেবল আমিই নির্ধারণ করতে পারি।
বাবর মুখ তুলে তার নানীজানের দিকে তাকায়। “দেখে নিয়ে, আমি ঠিক তৈমূরের মতই বীর হবো। আমি শপথ করে বলছি…”
“কথাগুলো সত্যিই শুনতে ভাল লাগে।” এসান দৌলত মন্তব্য করেন। “চলো আমাদের অনেক কাজ এখনও বাকি আছে। একটা নতুন দিনের প্রভাত হচ্ছে।”
দ্বিতীয় খণ্ড – সালতানাৎবিহীন এক সুলতান
০৭. আয়োধন আর অন্তর্ধান
বৃষ্টি আর তুষারপাতের মিশ্রণের প্রকোপ বাবরের ভেড়ার চামড়ার প্রলেপ দেয়া ভারী জ্যাকেটের আবরণও আটকাতে ব্যর্থ হয়। ফারগানার উত্তরে উঁচু পর্বতমালার অভ্যন্তরে এক প্রত্যন্ত উপত্যকার ভিতর দিয়ে বয়ে যাওয়া একটা ক্ষুদ্র স্রোতস্বিনীর তীরের প্রায় কাদা হয়ে থাকা বরফের ভিতর দিয়ে তার অবশিষ্ট লোকদের সামনে থেকে ঘোড়া নিয়ে এগিয়ে চলেছে, বৃষ্টি আর তুষারপাতের হাত থেকে বাঁচতে মাথা নিচু করে রাখা।
নিজের দুটো সালতানাই হারিয়েছে এটা অনুধাবন করার পরের প্রথম দিকের মুশকিল দিনগুলোতে, বাবর আকশি দূর্গের আশেপাশেই থাকবে বলে ভেবেছিলো আশা করেছিলো সব কিছু বাজি রেখে হলেও সে তার পরিবারকে মুক্ত করতে পারবে। ওয়াজির খান অনেক কষ্টে তাকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছে যে, তার শত্রুরাও এমনই একটা মরীয়া প্রচেষ্টা আশা করছে আর তারা সেজন্য পুরোপুরি প্রস্তুত হয়ে রয়েছে। ওয়াজির খান, তার চিরাচরিত পিতৃসুলভ ভঙ্গিতে তাকে আশ্বস্ত করে পরামর্শ দিয়েছে, “আপনি যদি আপনার আম্মিজান, নানীজান আর বোনকে বাঁচাতে চান তাহলে নিজেকে বিপদের মুখে না ফেলে বরং শত্রুদের তটস্থ করে তুলেন, যাতে তারা আপনার নাম শুনলেই ভয় পায়। আর সেটা করতে হলে তাদের চাপের ভিতরে রাখেন। এখানে সেখানে তাদের আক্রমণ করে, আপনার বিরুদ্ধে সৈন্য সমাবেশ করবার আগেই সেখান থেকে সরে আসেন। ধরা ছোঁয়ার বাইরে থেকে সবসময়ে একটা ভীতির সঞ্চার করতে থাকেন। আপনার শত্রুরা যাতে শান্তিতে ঘুমাতে না পারে। আর এটা করতে পারলেই সুলতান, তারা আপনার পরিবারের ক্ষতি করার কথা চিন্তাও করতে পারবে না।”
বাবর ওয়াজির খানের বক্তব্য মোটের উপরে বুঝতে পারে। সাবধানে বিবেচনা করে, সে একটা পরিকল্পনার কথা বলে। আমাদের একটা নিরাপদ আশ্রয়স্থল চাই। যেখানে আমরা শীতকালটা কাটাতে পারবো এবং প্রথম হামলার ছক কষতে পারবো। আমার মনে আছে যে প্রতিবার গ্রীষ্মের সময়ে সামরিক প্রশিক্ষণের অংশ হিসাবে আপনি একবার আমাকে উত্তরের পার্বত্য অঞ্চলে একটা অভিযানে নিয়ে গিয়েছিলেন এবং উপত্যকার কেন্দ্রস্থলে একটা মাটির দূর্গে আমরা অবস্থান করেছিলাম। তামবালের অনুগত এক জায়গীরদার সেই নগণ্য সেনাছাউনির প্রধানের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলো। সেই দূর্গটা আমাদের জন্য চমৎকার আশ্রয়স্থল হিসাবে প্রতিপন্ন হতে পারে। কারো মাথাতেই বিষয়টা আসবে না। আপনি কি বলেন?”
