অবশেষে খেলাটার প্রতি তার বিরক্তি জন্মায় কিন্তু ভেতরের জমে ওঠা হতাশা আর ক্ষোভ নিঃসৃত হওয়ায়, বাবর ঘামে ভিজে ওঠা ঘোড়াটাকে অবশেষে রেহাই দেয়। চারপাশে তাকাতে সে দেখে ওয়াজির খান তার দিকেই তাকিয়ে রয়েছে। এই প্রথম সে তার চোখে বিরক্তি দেখতে পায়। কিন্তু বাবর তাতে বিন্দুমাত্র লজ্জি বোধ করে না। জীবিত বা মৃত, সে তার শত্রুদের সাথে তাদের প্রাপ্য ব্যবহারই করেছে।
“চলো এবার যাওয়া যাক।” সে আদেশ দেয়। “গাভা এখনও অনেক দূরে, আর আমাদের গৃহকর্তাকে অপেক্ষা করিয়ে রাখাটা ঠিক হবে না।” বাবর ঘোড়ার পাঁজরে এত জোরে খোঁচা দেয় যে সেটা ছুটতে শুরু করে। বাবর সরাইখানা থেকে সোজা নদীর অগভীর অংশের দিকে এগিয়ে যায়।একবারও পেছনে ফিরে তাকায় না। আঙ্গিনায় পড়ে থাকা রক্তাক্ত মাথাগুলোকে ইতিমধ্যে কাকের দল ঠোকরাতে শুরু করেছে এবং সরাইখান মেয়ে দুটো পা ঈষৎ ধনুকের মত ফাঁক করে এগিয়ে গিয়ে চকরাখদের লাশগুলো হাতিয়ে দেখে যে বাবরের লোকেরা ভুলে কিছু রেখে। গেছে নাকি, যা তাদের বেশ্যাবৃত্তির পাওনার উপরি বলে বিবেচিত হতে পারে।
***
তিন সপ্তাহ পরে। উঁচু পাহাড়ী এলাকার তৃণভূমির উজ্জ্বল সবুজ ঘাসের মাঝে মাঝে ফুটে থাকা হলুদ গোলাপী আর সাদা ফুলের মাঝ দিয়ে বাবর আর তার লোকেরা দুলকি চালে ঘোড়া দাবড়ে শাহরুখিয়ার দিকে এগিয়ে যায়। গাভার অভিযানে ক্ষয়ক্ষতি হলেও তারাই জয়ী হয়েছে। তিনশ গজ দূরে ঘোড়ার পিঠে বসে থাকা অবস্থায় বাবর নিজে তীর ছুঁড়ে দূর্গের সেনাপতিকে হত্যা করেছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা তার নিজের ব্যবহৃত ছোট নিখুঁতভাবে বাঁকানো ধনুক দিয়ে তীর ছোঁড়ার অভ্যাসে কাজ হয়েছে। ত্রিশটা শর ভর্তি তূণীর সে এক মিনিটের ভিতরে খালি করে ফেলতে পারে।
সেনাপতি মারা যাবার পরে, প্রতিরোধকারীদের মনোবল ভেঙে যায়। ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে সেনানিবাসের সৈন্যরা কেবল আত্মসমর্পনই করেনি, নিজেদের লুটের মাল পুরো তাদের হাতে তুলে দিয়েছে। যা বাবর আর তার লোকদের ঘোড়ার পিঠে ঝোলানো চামড়ার থলির উপচে পড়া আকৃতি সাক্ষ্য দিচ্ছে।
ওয়াজির খান খুব খুশি হবে। এবারের অভিযান বাবরকে তার বুড়ো বন্ধুটির সহায়তা ছাড়াই পরিচালনা করতে হয়েছে। সরাইখানা আক্রমণ করার পরের দিন ওয়াজির খানের ঘোড়া সাপের ভয়ে বেমাক্কা লাফিয়ে উঠতে সে পড়ে গিয়ে উরুতে ব্যথা পেয়েছিলো। বাবরের সনির্বন্ধ অনুরোধে তিনি শাহরুখিয়ায় ফিরে যেতে রাজি হন বাইসানগারের সাথে যোগ দিতে, যাকে তারা সেখানের নিরাপত্তার দায়িত্ব দিয়ে এসেছে।
আজ রাতে তারা বিজয় উদযাপন করবে। সে তার লোকদের সম্মান জানাতে তাদের মাঝে উলুশ বিতরণ করবে। যোদ্ধাদের ভিতরে যারা সবচেয়ে সাহসিকতা আর বীরত্ব প্রদর্শন করেছে প্রথা অনুযায়ী আজ সে ভোজসভার শেষে তাদের মাঝে লুটের মালের সিংহভাগ বিলিয়ে দেবে এবং বাইসানগার আর ওয়াজির খানকে গাভা আক্রমণের কাহিনী শোনাবে। তার গল্প শুনে ওয়াজির খান সম্ভবত হেসে অস্থির হবেন এবং সদা গম্ভীর বাইসানগারের মুখেও সে আজ হয়তো হাসির আভাস দেখতে পাবে।
পাথরের তৈরি দূর্গের অভ্যন্তরস্থ প্রাঙ্গনে প্রবেশের সাথে সাথে, বাবর তার ঘোড়ার পিঠ থেকে লাফিয়ে নেমে তাদের খোঁজে আশেপাশে তাকায়। বাইসানগারকে সে কোথাও খুঁজে পায় না। কিন্তু ওয়াজির খানকে আস্তাবলের সামনে দাঁড়িয়ে ঘোড়ার খুরের উপরের আর পেছনের অংশের কেশগুচ্ছ পর্যবেক্ষণ করতে দেখে। তার বুড়ো বান্ধবকে সামান্য খোঁড়াতে খোঁড়াতে তার দিকে এগিয়ে আসতে দেখলে: বাবর ভ্রূ কোঁচকায়। তারপরে সে তাকিয়ে দেখে ওয়াজির খানের মুখ আনন্দে আলোকিত হয়ে রয়েছে।
“সুলতান, দারুণ সুখবর আছে! সত্যিই চমকে দেবার মত সুখবর!”
“কি হয়েছে?”
“এক সপ্তাহ আগে আকশি থেকে এক বার্তাবাহক এসেছে। আপনার সৎ-ভাই জাহাঙ্গীরের পক্ষে তামবালের বাণী নিয়ে সে এসেছে। অন্তত বার্তাবাহকের তাই ভাষ্য এবং সে বলেছে তারা আপনার আম্মিজান, নানীজান আর আপনার বোনকে আপনার কাছে পাঠাতে সম্মত আছেন।”
“সে কি এর বিনিময়ে কিছু দাবি করেছে?”
“সুলতান, প্রকাশ্যে তারা কিছু দাবি করেনি। আপনাকে সে কতোটা শ্রদ্ধা করে কেবল সে সম্পর্কে কিছু মধুর বাক্য ছাড়া।”
বাবরের হৃৎপিণ্ড আনন্দে নেচে উঠে। তার পরিবার শীঘ্রই তার সাথে মিলিত হবে। এই খবরটা আবার তাকে আবেগতাড়িত করে তোলে।
“তারা এখানে কবে নাগাদ পৌঁছাবে?”
“সবকিছু ঠিক থাকলে আগামীকাল সূর্যাস্ত নাগাদ তাদের এখানে পৌঁছাবার কথা।”
পরের দিন সন্ধ্যাবেলা, গোধূলির অস্তমিত আলোয় বাবরকে দূর্গের প্রকারবেষ্টিত সমতল ছাদে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। আজকের দিনের অধিকাংশ সময় সে এখানেই কাটিয়েছে। অস্থিরচিত্তে রাস্তাটা যেখানে একটা গিরিখাদের দিকে বাঁক নিয়েছে, সেদিকে চোখ কুঁচকে তাকিয়ে রয়েছে। ঘনায়মান আধো-অন্ধকারের ভিতর থেকে সে পিঠের দুপাশে ঝুড়ি ঝুলছে উটের এমন একটা তরঙ্গায়িত সারিকে বাঁক ঘুরে এগিয়ে আসতে দেখে। তাদের ঠিক পেছনেই রয়েছে যাত্রার শেষ পর্যায়ে মেয়েদের অভ্যর্থনা জানাতে। আর তাদের নিরাপদে দূর্গে নিয়ে আসবার জন্য, ওয়াজির খানের পরামর্শে, বাইসানগারের অধীনে পাঠানো সৈন্যবাহিনীর একটা চৌকষ দল।
