“চকরাখ হানাদারদের অবশ্যই খুঁজে বের করে তার হত্যার আমরা বদলা নেবো। তোমার অধীনস্ত কয়েকজন গুপ্তদূতকে হত্যাকারীদের খুঁজতে পাঠাও।”
“সুলতান, আমার মনে হয় না তার কোনো দরকার আছে। বণিক লোকটা মারা যাবার আগে আমাকে বলেছে যে, সে চকরাখদের বলতে শুনেছে তারা সরাইখানায় যাচ্ছে, সেখানে আরও শিকার যদি তারা খুঁজে পায়…”
“তাহলে আমরা প্রথমে সরাইখানায় যাবো।”
***
গানের সুর বন্য আর কর্কশ চকরাখদের নিজেদের মতোই অনেকটা। মদের নেশায় চুরচুর হয়ে থাকা পুরুষদের কণ্ঠস্বর নতুন মাত্রায় উঠে এমন সব অশ্লীল ক্রিয়াকলাপের বর্ণনায় মেতেছে যা একাধারে শারিরীকভাবে অসম্ভব আর মোটাদাগের যে বাবর চেষ্টা করেও হাসি চাপতে পারে না। সে আড়চোখে ওয়াজির খানের দিকে তাকিয়ে দেখে সেও হাসছে।
লম্বা ঘাসের আড়ালে বাবর তার চারপাশে শুয়ে থাকা লোকদের ইশারা করে। সবাই। তারমতো পেটের উপরে ভর দিয়ে শুয়ে আছে, লুকিয়ে অপেক্ষা করছে। তারপরে সে গুঁড়ি মেরে মাটির ইট দিয়ে তৈরি একতলা সরাইখানার দিকে এগিয়ে যায় যেটা ফারগানার অন্যতম খরস্রোতা একটা নদীর অগভীর অংশের পাড়ে অবস্থিত। যেখানে হল্লাবাজেরা মচ্ছবে মেতেছে। নূপুরের নিক্কন ধ্বনি ভেসে আসতে বোঝা যায় ভেতরে বাইজি মেয়েরাও আছে। সেই সাথে কুপিত নারী কণ্ঠের সহসা একটা তীক্ষ্ণ চিৎকার আর তার সঙ্গে ভেসে আসে- পুরুষ কণ্ঠের অট্টহাসি।
দুপুর মাত্র অতিক্রান্ত হয়েছে। কিন্তু বিশজন বা তার কিছু বেশি চাকরাখরা ইতিমধ্যেই বেহেড মাতাল হয়ে পড়েছে। তারা এমনকি তাদের ঘোড়াগুলিকে ঠিকমতো বাঁধার কষ্টও করেনি এবং কিছু ঘোড়া, যাদের কেশর পুরু আর লেজ এতো লম্বা যে মাটিতে ঘষা খাচ্ছে, ইতিমধ্যেই ছুটে পালিয়েছে। চারো ব্যবসায়ীর কাছ থেকে লুট করা মালামালও তারা ভিতরে নিয়ে যাবার গরজ দেখায়নি। বণিকদের মালবাহী ধুসর খচ্চরগুলো দড়ি দিয়ে একত্রে বাঁধা এবং মনোযোগ দিয়ে চরে বেড়াচ্ছে। তাদের পিঠে আটকানো বেতের ঝুড়িগুলো দেখে মনে হয় এখনও চামড়া আর লোমে ঠাসা। চাকরাখরা মনে হয় কেবল মদের পিপে নিয়ে সরাইখানার ভিতরে প্রবেশ করেছে।
বর্বর অসভ্য, বাবর ভাবে। তাদের কপালে আজ কি লেখা আছে সেটা এখনই ব্যাটারা টের পাবে। আর এই ভাবনাটা তাদের উৎফুল্ল করে তোলে। লম্বা ঘাসের উপরে মাথা তুলে বাবর চারপাশে তাকায়। কিন্তু কাউকে দেখতে পায় না। সে ঠিক যেমনটা ভেবেছিলো, ঘোড়া বা মালামাল দেখার জন্য বাইরে কোনো বাচ্চাকে রাখার কথা ব্যাটাদের মাথাতেই আসেনি। সে এবার উঠে দাঁড়িয়ে, গুটিগুটি পায়ে সরাইখানার নীচু প্রবেশদ্বারের ডান দিকে মোটা দেয়ালের গায়ে জানালার মতো দেখতে একটা ফাঁকা জায়গার দিকে এগিয়ে গিয়ে ভেতরে সতর্কতার সাথে উঁকি দেয়। ঘরটা প্রায় খালি, কেবল ভেতরের দেয়ালের গায়ে ঠেকানো অবস্থায় একটা লম্বা কাঠের টেবিল দেখা যায়। কয়েকটা তেপায়া টুল আর একটা আধ ভাঙা বেঞ্চি দেখা যায়। ঘরের মাঝে মোটাসোটা, বোচা-নাকের একটা মেয়ে পরনে রঙচটা হলুদ রঙের ঢোলা সালোয়ারের উপরে লাল ফুলের ছাপ দেয়া একটা আঁটোসাঁটো কামিজ, পায়ে আর হাতের কব্জিতে ঘুঙুর বাঁধা। নীল সালোয়ার কামিজ পরিহিত লম্বা আরেকটা মেয়ে তার নোংরা হাতে একটা খঞ্জনী, বর্গাকার পাথরের মেঝের উপরে খালি পায়ে সজোরে পদাঘাত করে বৃত্তাকারে আবর্তিত হচ্ছে। সে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই চকরাখদের কয়েকজন, ভেড়ার চামড়ার তৈরি টুপির নিচে তাদের গোলাকার মুখ ঘামে ভিজে আছে, টলোমলো পায়ে মেয়েদের বুকে পাছায় বৃথা চেষ্টা করে থাবা দিতে এবং মুখ থুবড়ে মাটিতে আছড়ে পড়লে তাদের সঙ্গীসাথীদের উদ্দীপনা আরও বেড়ে যায়।
এক কোণে ধোঁয়া উঠতে থাকা অগ্নিকুণ্ডের উপরে বিশাল একটা কেতলি ঝুলতে দেখা যায়। আরেক কোণে, বাবর এক চকরাখ দুবৃত্তকে কাপড় খুলে ব্যস্ত ভঙ্গিতে হাল্কা হতে দেখে, দুর্গন্ধে তার সঙ্গীসাথীদের আপাতভাবে কোনো অসুবিধা হয় না। আরেক বদমাশ উঠে দাঁড়িয়ে হলুদ বমি বৃত্তচাপ তৈরি করে ছুঁড়ে ফেলে আবার বসে পড়ে আর মনোযোগ দিয়ে জামার হাতায় পড়া বমির ফোঁটা বড়বড় নখ দিয়ে টুসকি দেয়। বাবর পুনরায় মাথা নামিয়ে নেয়। সে যা দেখার তা দেখে নিয়েছে।
মাটিতে গুঁড়ি দিয়ে সে পুনরায় ওয়াজির খান যেখানে আছে সেখানে ফিরে আসে। “মদ্যপ আহাম্মকগুলো আমাদের হাতে মারা যাবার জন্য মুখিয়ে রয়েছে। ব্যাটারা তাদের তরবারি আর ঢাল পর্যন্ত দরজার কাছে স্তূপ করে রেখেছে।”
ওয়াজির খানের একটা ক্ৰ উপরে উঠে যায়। “সুলতান, এখনই?”
“হ্যা!”
বাবর আর ওয়াজির খান উঠে দাঁড়িয়ে তাদের লোকদেরকেও উঠে দাঁড়াবার ইশারা করে। তারা এই কাজটা আগে এতোবার করেছে যে, মৌখিক আদেশের আর কোনো প্রয়োজন হয় না। ঠোঁটের উপরে আঙ্গুল চেপে, ওয়াজির খান ইশারায় ঘুরে কয়েকজনকে সরাইখানার পেছনে যেতে বলে। যদি সেখান দিয়ে পালাবার কোনো পথ থেকে থাকে। তারপরেই কেবল বাবর তার প্রিয় রণহুঙ্কারে চারপাশ প্রকম্পিত করে: “ফারগানা!”
বাবর একেবারে সামনে থেকে তার লোকদের নেতৃত্ব দেয়। মদের নেশায় মাতাল আর বিস্ময়ে আড়ষ্ঠ চকরাখরা সামান্যই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে। বাবর আর তার লোকেরা নির্মমভাবে প্রতিপক্ষের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়লে বোঁচা-নাকের সেই মেয়েটার কাছ থেকেই কেবল বলার মতো প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়। মেয়েটা তার কাচুলির ভিতর থেকে একটা খঞ্জর বের করে এবং বাবরের বাহুতে সেটা মরিয়া ভঙ্গিতে গেথে দিতে চাইলে, বাবর অনায়াসে তার ঘুঙুর পরা হাতের কব্জি ধরে এবং তাকে ঘুরিয়ে দিয়ে তার নধর নিতম্বে বুট দিয়ে একটা সপাট লাথি বসিয়ে দিতে বেচারী ছিটকে দূরে গিয়ে পড়ে।
