লোকটার ব্যাপারে আমার সব কিছু বলা শেষ হলে লম্বা একটা সময় কিছু বললেন না তিনি। তার এই অভ্যাসটাও আমাকে বিরক্ত করে। কথা বলার আগে অনেকক্ষণ ধরে ভাবেন, যেন ইচ্ছে করে অপেক্ষা করাচ্ছে আমাকে। শব্দ বলতে কেবল নিচতলা থেকে কুকুরটার ঘেউঘেউ কানে আসছে। আওয়াজটা শুনতে শুনতে এক ধরণের ঘোরের মধ্যে চলে যাই। ডঃ ওয়েস্ট যখন আচমকা কথা বলে ওঠেন, তখন আসলেও চমকে যাই।
“আমাদের মধ্যে আগেও এ বিষয়ে কথা হয়েছে, তাই না অ্যালিসিয়া?”
শূন্যদৃষ্টিতে তার দিকে তাকাই আমি। ধরতে পারছি না কি বলতে চাচ্ছেন। “হয়েছে কি?”
“হ্যাঁ, হয়েছে,” মাথা নাড়েন ডঃ ওয়েস্ট।
“আপনি বোধহয় ভাবছেন যে পুরোটাই আমার কল্পনা। কিন্তু বিশ্বাস করুন, বানিয়ে বলছি না।”
“গতবারও এটাই বলেছিলেন। মনে আছে কি হয়েছিল?”
জবাব দেইনি। আসলে তাকে সেই সন্তুষ্টিটুকু দিতে চাচ্ছিলাম না। চোখ পাকিয়ে চুপচাপ বসে থাকি, ছোট বাচ্চাদের মতন।
ডঃ ওয়েস্ট অবশ্য আমার জবাবের অপেক্ষা করলেন না। বাবার মৃত্যুর পর কি ঘটেছিল সে বিষয়ে কথা বলেই গেলেন। সবসময় একটা আতঙ্কের ভেতরে থাকতাম তখন, মনে হতো কেউ আমাকে দেখছে সর্বক্ষণ, নজর রাখছে। “আমরা আগেও এ বিষয়ে কথা বলেছি, বুঝলেন তো?”
“কিন্তু এবারে পরিস্থিতি ভিন্ন। গতবার শুধু ওরকমটা মনেই হয়েছিল আমার, কাউকে দেখিনি। এবারে আসলেও একজনকে দেখেছি।”
“কাকে দেখেছেন?”
“ইতোমধ্যে বলেছি আপনাকে। একটা লোককে।”
“তার বর্ণনা দিন তো?”
“সেটা পারবো না,” দ্বিধান্বিত স্বরে বলি।
“কেন পারবেন না?”
“আসলে তাকে ঠিকমতো দেখতে পারিনি কোনবারই। বলেছিল তো আপনাকে-দূর থেকে লক্ষ্য রাখে সে।”
“আচ্ছা।”
“তাছাড়া ইচ্ছে করেই একটা কাপ আর সানগ্লাস পরে আসে, যাতে চেহারাটা দেখতে না পাই।”
“অনেকেই কিন্তু এই আবহাওয়ায় সানগ্লাস চোখে দিয়ে বাইরে বের হয়। মাথায় ক্যাপও পড়ে। তারা সবাই কি কারো ওপর নজর রাখে?”
মেজাজ গরম হতে শুরু করে আমার। “আমি জানি আপনি কি চাইছেন।”
“কি?”
“আপনি আমার মুখ থেকেই শুনতে চাচ্ছেন যে ভুলভাল দেখছি আমি। বাবা মারা যাবার পর মাথা বিগড়ে যেতে শুরু করেছিল, সেরমটাই হচ্ছে আবারো-এটাই তো বলাতে চাচ্ছেন আমাকে দিয়ে, নাকি?”
“আপনার কি ধারণা? সেরকম কিছু কি হচ্ছে আপনার সাথে?”
“না। তখন মানসিকভাবে অসুস্থ ছিলাম আমি। কিন্তু এবারে একদম ঠিক আছি। কোন সমস্যা নেই। একটা লোক আমাদের বাসার ওপর নজর রাখছে প্রতিনিয়ত, এটা নিশ্চয়ই আপনার কাছে সমস্যা মনে হচ্ছে না!।”
মাথা নাড়লেন ডঃ ওয়েস্ট কিন্তু তৎক্ষণাৎ কিছু বললেন না। নোটবুকে কী যেন টুকে নিলেন।
“আপনাকে আবারো কিছু ওষুধ খেতে হবে। সাবধানতাবশতই কাজটা করছি আমি। এবারে পরিস্থিতি আগের মত খারাপ হতে দেয়া চলবে না, বুঝেছেন?”
মাথা ঝাঁকিয়ে না করে দিলাম। “কোন ওষুধ খাবো না আমি।”
“বেশ। যদি ওষুধ না-ই খান, তাহলে কিন্তু এর পরিণাম নিয়ে ভাবতে হবে আপনাকে।”
“কি পরিণাম? আপনি কি আমাকে ভয় দেখাচ্ছেন?”
“আমার সাথে এর কোন লেনদেন নেই। আমি আপনার স্বামীর ব্যাপারে কথা বলছি। গতবার আপনার ওরকম পরিস্থিতি দেখে গ্যাব্রিয়েলের কেমন লেগেছিল?”
কল্পনায় গ্যাব্রিয়েলকে নিচতলার লিভিংরুমে দেখতে পেলাম। কুকুরটা তার পাশে বসেই ঘেউঘেউ করে চলেছে। “জানিনা আমি, ওকেই জিজ্ঞেস করছেন না কেন?”
“আপনি কি এটাই চান, আবারো সেই পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাক সে? আপনার কি মনে হয় না তার সহ্যের একটা সীমা আছে?”
“কী বলছেন এসব? গ্যাব্রিয়েল আমাকে ছেড়ে চলে যাবে? আপনার এটাই ধারণা?”
কথাটা ভাবতেও কষ্ট হচ্ছে আমার। ওকে হারাতে হবে, এটা চিন্তাই করতে পারি না। গ্যাব্রিয়েলকে নিজের কাছে রাখার জন্যে যে কোন কিছু করতে রাজি আমি। তাই রাজি হয়ে যাই ডঃ ওয়েস্টের কথায়। বলি যে যদি যে অশরীরি কেউ আমার মাথার ভেতরে কথা বলার চেষ্টা করে, তাহলে তাকে অবশ্যই জানাবো। ওষুধগুলোও খাবো নিয়মিত।
সন্তুষ্টি ফোটে ডঃ ওয়েস্টের চেহারায়। বলেন যে নিচতলায় গিয়ে গ্যাব্রিয়েলের সাথে দেখা করতে পারি আমরা। সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় মনে হচ্ছিল তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেই। দিলেই ভালো হতো।
বাসায় ফেরার পথে খুব খুশি দেখায় গ্যাব্রিয়েলকে। বারবার হাসিমুখে আমার দিকে তাকাচ্ছিল। “তোমার মতো সাহসী মেয়ে খুব কমই দেখেছি আমি। সব ঠিক হয়ে যাবে, দেখো।”
মাথা নাড়লেও ওর কথার জবাবে কিছু বলিনি ইচ্ছে করেই। কারণ ডঃ ওয়েস্টের কাছে যাওয়াটা সময় নষ্ট ছাড়া আর কিছু নয়।
একাই সবকিছু সামলাতে হবে আমাকে।
আসলে কাউকে বলাটাই ভুল হয়েছিল। কালকে বার্বিকে মেসেজ করে বলবো ব্যাপারটা ভুলে যেতে। জানি যে আমার মেসেজ পেয়ে বিরক্ত হবেন তিনি। তার নাটক শুরুতেই থামিয়ে দিচ্ছি আমি। কিন্তু কিছুদিন পরেই ভুলে যাবেন। আমিও ভাব ধরবো যে সব ঠিকঠাক চলছে। কেউ এক মুহূর্তের জন্যেও কিছু বুঝতে পারবে না।
একটা ফার্মেসি থেকে আমার ওষুধগুলো কিনে ফেলে গ্যাব্রিয়েল। বাসায় ফিরেই সরাসরি রান্নাঘরে গিয়ে গ্লাসে পানি ঢেলে আনে। হলুদ ওষুধগুলো আমার হাতে দিয়ে বলে, “খেয়ে ফেলো।”
“আমি বাচ্চা নই। এভাবে হাতে তুলে দেয়ার কিছু নেই।”
“আমি জানি তুমি বাচ্চা নও, কিন্তু এগুলো যে আসলেও খাচ্ছো, সেটা নিশ্চিত করতে চাইছিলাম।”
