“জিন-ফিলিক্সের নম্বর কোথায়?” গ্যাব্রিয়েল বলে। “আমি এখনই ফোন করবো ওকে।”
“না, ডার্লিং, প্লিজ। এরকম কিছু কোরো না। আমি নিশ্চিত লোকটা জিন-ফিলিক্স না।”
“আসলেই?”
“হ্যাঁ। তাছাড়া ওরকম কিছু তো হয়নি। আমি বোধহয় একটু বাড়াবাড়িই করছি। থাক, বাদ দাও।”
“কতক্ষণ ছিল লোকটা এখানে?”
“খুব বেশিক্ষণ না। এই ধরো এক ঘন্টা, এর পরেই উধাও হয়ে যায়।”
“উধাও হয়ে যায় মানে?”
“মানে গায়েব হয়ে যায়।”
“ওহ। আচ্ছা জান, রাগ কোরো না। একটা কথা জিজ্ঞেস করি?”
“কি?” ওর প্রশ্নের ধরণটা ভালো লাগলো না আমার।
“পুরো ব্যাপারটা তোমার কল্পনা নয় তো?”
“না,” দৃঢ় কণ্ঠে বলি। “বিশ্বাস করো আমার কথা।”
“বিশ্বাস তো করছিই।”
কিন্তু ওর কথা শুনে বুঝতে পারি যে আমাকে পুরোপুরি বিশ্বাস করছিল না তখন। বিশ্বাস করার ভান করছিল। সত্যি বলতে, প্রচণ্ড রাগ লাগে তখন। এত রাগ যে…আজকে এখানেই লেখা থামাতে হবে। নতুবা এমন কিছু লিখে ফেলবো যেটা নিয়ে পরে পস্তাতে হতে পারে।
.
১৪ অগাস্ট
আজ সকালে ঘুম থেকে উঠেই জানালার কাছে চলে যাই। মনে মনে আশা করছিলাম লোকটাকে হয়তো দেখতে পাবো, তাহলে গ্যাব্রিয়েলকেও ডেকে দেখানো যাবে। কিন্তু তার কোন চিহ্নই ছিল না বাইরে। নিজেকে আরো বেশি আহাম্মক মনে হয় তখন।
বিকেলে সিদ্ধান্ত নেই গরমের মধ্যেও হাঁটতে বের হবো। আসলে বাড়ি থেকে কিছুক্ষণের জন্যে পালাতে চাইছিলাম। হাঁটতে হাঁটতে পার্লামেন্ট হিলের কাছে চলে যাই, চারপাশে অনেকেই রোদ পোহাচ্ছিল। একটা খালি বেঞ্চ দেখতে পেয়ে বসে পড়ি। লন্ডনের অনেকটা দেখা যায় ওখান থেকে।
কিন্তু গোটা সময় মনে হচ্ছিল যে কেউ আমার ওপরে নজর রাখছে। বারবার পিছু ফিরে তাকালেও সন্দেহজনক কিছু চোখে পড়েনি। কিন্তু কেউ একজন ছিল সেখানে, বুঝতে পারছিলাম সেটা।
বাসায় ফেরার পথে পুকুর পাড় দিয়ে হাঁটছি এসময় হঠাই মুখ তুলে তাকাই। সাথে সাথে থমকে যাই সেখানেই। পুকুরের অন্যপাশ থেকে আমার দিকেই তাকিয়ে ছিল লোকটা। চেহারা ভালো করে বোঝা যাচ্ছিল না অবশ্য, কিন্তু আমার চিনতে ভুল হয় না।
ভয়ের একটা শীতল স্রোত বয়ে যায় শিরদাঁড়া বেয়ে। পেটের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। আপনা থেকেই চেঁচিয়ে উঠি:
“জিন-ফিলিক্স? আমাকে অনুসরণ করছো কেন? বন্ধ করো এসব!”
কিন্তু লোকটা দাঁড়িয়েই থাকে। যত দ্রুত সম্ভব পকেট থেকে ফোন বের করে তার একটা ছবি তুলি। এতে লাভ কি হয়েছে, জানি না। এরপর উল্টোদিকে ঘুরে হাঁটতে শুরু করি, একবারও পেছনে তাকাইনি। ভয় হচ্ছিল যে পেছনে ফিরলেই দেখতে পাবো কাছাকাছি চলে এসেছে।
তা সত্তেও নিজেকে আটকাতে পারিনি। ঘরে তাকাই। কিন্তু আবারো উধাও হয়ে গিয়েছিল সে।
মনেপ্রাণে চাইছিলাম যাতে জিন-ফিলিক্স না হয় লোকটা।
বাসায় ফেরার পর খুব অস্থির লাগছিল। সব পর্দা টেনে বাতি নিভিয়ে দেই। কি মনে করে জানালা দিয়ে বাইরে একবার উঁকি দিতেই থমকে যাই। বাইরে দাঁড়িয়ে আছে লোকটা, রাস্তার অন্যপাশে। দৃষ্টি আমার দিকে। কি করবো বুঝে উঠতে পারছিলাম না।
এসময় কেউ আমার নাম ধরে ডাক দেয়ায় চমকে উঠি।
“অ্যালিসিয়া? আছো?”
পাশের বাসার বিরক্তিকর মহিলাটা আবার এসেছিল। বার্বি হেলমান। দ্রুত এগিয়ে গিয়ে পেছনের দরজাটা খুলে দেই। ইতোমধ্যে বাগানে ঢুকে পড়েছিল সে, হাতে ওয়াইনের বোতল।
“কেমন আছো ডার্লিং? স্টুডিওতে দেখলাম না তাই ভাবলাম কি করছে।”
“একটু বাইরে গিয়েছিলাম। কেবলই ফিরেছি।”
“ওয়াইন?” বাচ্চাদের মত করে বলল সে, এরকমটা প্রায়ই করে মহিলা। বিরক্ত লাগে আমার।
“আসলে, কাজ করতে হবে আমাকে এখন।”
“আরে কাজ তো আমারো আছে। একটু পরেই ইটালিয়ান ক্লাসে যাবো। এর আগে একটু গল্পগুজব করি দু’জনে।”
আমার জবাবের অপেক্ষা না করেই ভেতরে ঢুকে পড়লো সে। ঘর অন্ধকার দেখে জানালার পর্দাগুলো সরিয়ে দিল বিনা অনুমতিতে। তাকে থামাতে যাবো এসময় বাইরে তাকিয়ে দেখি লোকটা চলে গেছে।
আমি আসলে ঠিক জানি না যে কেন বার্বিকে তার ব্যাপারে বলেছি। মহিলাকে একদমই পছন্দ কই না আমি, ভরসা করা তো দুরের কথা। আসলে ওই সময়টা বাসায় যে-ই থাকতো, তাকেই বলতাম কথাগুলো। ওয়াইন পেটে যাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই কাঁদতে শুরু করি। বিস্ফোরিত নয়নে কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থাকে বার্বি। আমার সব বলা শেষ হলে হাত থেকে ওয়াইনের গ্লাসটা নামিয়ে রাখে টেবিলে। “আরো কড়া কিছু দরকার।” কেবিনেট থেকে হুইস্কি বের করে দুটো মগে ঢেলে একটা আমার দিকে এগিয়ে দেয়।
“এই নাও, এটা এখন দরকার তোমার।”
আসলেও দরকার ছিল। মাথাটা একটু শান্ত হয় অবশেষে। এবারে আমার শোনার পালা। একটানা কথা বলতে থাকে বার্বি। বারবার বলছিল যে আমাকে ভয় দেখানোর কোন উদ্দেশ্য নেই তার, কিন্তু তার কথাগুলো ভয়ংকরই শোনাচ্ছিল। “এরকমটা টিভিতে হাজারবার দেখেছি আমি। কিছু করার আগে রেকি করে নিচ্ছে হারামিটা।”
“আপনার কি মনে হয়? লোকটা চোর?”
কাঁধ নাচায় বার্বি। “ধর্ষকও হতে পারে। তাতে কিছু আসে যায়? ভালো উদ্দেশ্যে যে আসেনি, এটা নিশিচত।”
হেসে ফেলি তখন। আসলে এটা ভেবে স্বস্তি পাচ্ছিলাম যে কেউ একজন আমার কথা বিশ্বাস করেছে-হোক সেটা বার্বি। তাকে আমার ফোনে ভোলা ছবিটা দেখাই।
