“সত্যটা শুনতে খারাপ লাগছে? তুমিই ওর ওষুধের ডোজ কমানোর ব্যাপারে ঘোট পাকিয়েছে-”
হেসে ফেললাম। “ঘেট পাকিয়েছি? ওকে যে পরিমাণ ওষুধ দেয়া হতো তাতে একটা ঘোড়াও কাবু হয়ে পড়বে।”
“ফালতু কথা।”
ডায়োমেডেসের দিকে ফিরলাম। “আপনিও কি একই কথা ভাবছেন?”
মাথা ঝাঁকালো ডায়োমেডেস। “প্রশ্নই আসেনা,” বলে চোখ নামিয়ে নিলেন। “তবে এটা ঠিক যে ওষুধের ডোজের তারতম্যের কারণে সমস্যা হয়েছে।”
“আমি এটা মানতে নারাজ।”
“তুমি বোধহয় গোটা ব্যাপারটার সাথে একটু বেশিই জড়িয়ে ফেলেছে নিজেকে,” দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন ডায়োমেডেস। “আর এ মুহূর্তে কোন ভুলের সুযোগ নেই আমাদের-এটা খুব ভালো করেই জানো। ক্লিনিকের ভবিষ্যৎ একটা সুতোয় দুলছে এখন। আমাদের প্রতিটা ভুল ট্রাস্টকে ইন্ধন যোগাবে ক্লিনিকটা বন্ধ করে দিতে।”
প্রফেসরকে এভাবে হাল ছেড়ে দিতে দেখে বিরক্ত লাগছে। তাই বলে তো অ্যালিসিয়াকে কড়া ডোজের ওষুধ দিয়ে একঘরে করে রাখতে পারি না আমরা! তাহলে জেলখানার সাথে পার্থক্যটা কি থাকলো?”
“তোমার কথার সাথে একমত আমি, থিও,” ইন্দিরা বলে উঠলো এ সময়। “সমস্যাটা হচ্ছে আমাদের ঝুঁকি নেয়ার কোন ইচ্ছেই নেই। তাই একজন রোগিকে ইচ্ছেমতন ওষুধ দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখাই যৌক্তিকভাবে অনেকে। কিন্তু সাইকোলজিস্ট বা সাইকোথেরাপিস্ট হিসেবে আমাদের আরো সাহসী হতে হবে। রোগিদের সাময়িক উন্মাদনাটুকু নিয়ন্ত্রণের চেষ্টাই সবচেয়ে ভালো সমাধান, এভাবে আটকে রাখাটা পাশবিক।”
চোখ বাঁকালো ক্রিস্টিয়ান। কিছু একটা বলার জন্যে মুখ খুলতে যাবে এ সময় হাত উঁচিয়ে তাকে থামালেন ডায়োমেডেস। “সেজন্যে বড় দেরি হয়ে গেছে। আসলে দোষটা আমারই। সাইকোথেরাপি অ্যালিসিয়ার জন্যে নয়। শুরুতেই মানা করে দেয়া উচিৎ ছিল।”
ডায়োমেডেস মুখে বলছেন, পুরো দোষ তার, কিন্তু মনে মনে আসলে আমাকেই দোষি ভাবছে সবাই। সবার চোখ এখন আমার দিকে। ডায়োমেডেসের দৃষ্টিতে হতাশা, ক্রিস্টিয়ানের দৃষ্টিতে বিদ্রূপ আর ইন্দিরার দৃষ্টিতে খেলা করছে দুশ্চিন্তা।
“অ্যালিসিয়ার ছবি আঁকা থামিয়ে দিতে পারেন আপনারা। কিন্তু তার থেরাপি বন্ধ করবেন না-তাহলে আর তার স্বাভাবিক জীবন যাপনের কোন আশাই থাকবে না,” চেষ্টা করলাম যাতে কণ্ঠে মিনতির ভাব না ফোটে।
“আমার তো এখন মনে হচ্ছে অ্যালিসিয়া আর কখনোই স্বাভাবিক হবে না,” প্রফেসর মাথা ঝাঁকিয়ে বললেন।
“আমাকে আর কয়েকটা দিন সময়-”
“না,” ডায়োমেডেসের কণ্ঠের দৃঢ়তা শুনেই বুঝতে পারলাম, এ বিষয়ে আলোচনা করা বৃথা।
আমার সুযোগ শেষ।
.
২.৩৪
প্রফেসর ডায়োমেডেসের কিন্তু সেদিন ভুল আন্দাজ করেছিলেন। তুষারপাত হয়নি। বরং প্রচণ্ড বৃষ্টি শুরু হয়ে যায় বিকেলের দিকে। মুহুর্মুহ বজ্রপাতে একটু পরপর কেঁপে উঠছিল চারপাশ।
অ্যালিসিয়ার জন্যে থেরাপি রুমে অপেক্ষা করছি। আজকেও বৃষ্টি ঝরছে বাইরে। ভেতরে ভেতরে খুবই ক্লান্ত আর বিষণ্ণ আমি। অ্যালিসিয়াকে সাহায্য করার আগেই সুযোগটা হারালাম; এখন আর কিছু করা সম্ভব নয় আমার পক্ষে।
দরজায় কেউ কড়া নাড়লো এসময়, তাকিয়ে দেখি অ্যালিসিয়াকে নিয়ে এসেছে ইউরি। যতটা ভেবেছিলাম তার চাইতেও খারাপ অবস্থা তার। চেহারা একদম ফ্যাকাসে, যেন জীবন্ত লাশের দিকে তাকিয়ে আছি। ঠিকঠাক হাঁটতেও পারছে না, ডান পাটা অনবরত কাঁপছে। ক্রিস্টিয়ানকে মনেমনে গালি দিলাম আবারো, ওর প্রেসক্রাইব করা ওষুধ খেয়েই অ্যালিসিয়ার এই অবস্থা।
ইউরি চলে যাবার পর লম্বা একটা সময় চুপচাপ ঘরটায় বসে থাকি দু’জনে। অ্যালিসিয়া চোখ নামিয়ে রেখেছে। এক পর্যায়ে মুখ খুলতেই হলো আমাকে। এমনভাবে কথাগুলো বললাম যেন স্পষ্ট শুনতে পায় সে।
“অ্যালিসিয়া, আপনাকে যে আইসোলেশন রুমে আটকে রাখা হয়েছে, সেজন্যে আমি দুঃখিত। আসলেও দুঃখিত।”
কোন প্রতিক্রিয়া নেই।
“এলিফের সাথে যা করেছেন,” দ্বিধান্বিত স্বরে বললাম, “সেটার জন্যে আমাদের বোধহয় আর থেরাপি চালিয়ে যাবার সুযোগটা নেই। তবে সিদ্ধান্তটা আমার ছিল না, আমি বরং এর প্রতিবাদ করেছি। আপনি চাইলে আমাকে জানাতে পারেন, এলিফ এবং আপনার মাঝে ঠিক কী হয়েছিল? নিশ্চয়ই ভেতরে ভেতর অপরাধবোধ হচ্ছে আপনার? সে ব্যাপারেও আলোচনা করতে পারি আমরা।”
অ্যালিসিয়া কিছু বলল না। এই ঘোরের মধ্যে আমার কথা তার মাথায় আদৌ ঢুকছে কি না, সে ব্যাপারে সন্দিহান আমি।
“আচ্ছা আমার কেমন লাগছে আগে সেটা বলি নাহয়। এই মুহূর্তে আসলে প্রচণ্ড রাগ হচ্ছে আমার। কারণ আমরা একসাথে ঠিকমতো কাজ শুরু করার আগেই সুযোগটা হারাতে হচ্ছে। আপনার ওপরেও রাগ হচ্ছে কারণ আপনি আরেকটু চেষ্টা করলেই আজ এই দিন দেখতে হতো না।”
এবার মাথা তুলে আমার দিকে তাকালো অ্যালিসিয়া।
“জানি আপনি ভয় পাচ্ছেন। আপনাকে সাহায্য করার চেষ্টা করেছি। আমি, কিন্তু সুযোগটা দেননি। আর এখন পুরো পরিস্থিতিই বিগড়ে গেছে।”
চুপ হয়ে গেলাম। পরাজিত মনে হচ্ছে নিজেকে।
ঠিক এই সময় অ্যালিসিয়া এমন একটা কাজ করলো যা আমি সারাজীবনেও ভুলতে পারবো না।
কাঁপা কাঁপা হাতটা আমার দিকে বাড়িয়ে দেয় সে। কিছু একটা শক্ত করে ধরে রেখেছে সেখানে-একটা চামড়া দিয়ে বাঁধানো নোটবুক।
