“ওহ আচ্ছা। কি হয়েছিল?”
উদাসীন ভঙ্গিতে কাধ নাড়লেন প্রফেসর। “আমার অফিসে আসতো না সে, তাই বাধ্য হয়ে আমিই তার রুমে যাই। গোটা সেশনের পুরোটা সময় কিছু না বলে বিছানায় বসে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকে। কথা তো বলেইনি, একবারের জন্যে আমার দিকে তাকায়ওনি।” হতাশ ভঙ্গিতে হাত নাড়লেন তিনি। একসময় মনে হয় পুরো ব্যাপারটাই সময় নষ্ট।”
সায় দেয়ার ভঙ্গিতে মাথা নাড়লাম। “আচ্ছা, এমনটাও তো হতে পারে
“কি?” কৌতূহলী দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেন ডায়োমেডেস। “নির্দ্বিধায় বলো।”
“এটাও তো হতে পারে যে অ্যালিসিয়া হয়তো শৈশবের কোন চরিত্রের সাথে আপনার মিল খুঁজে পেয়েছে। এমন কোন চরিত্র যার সামনে মুখ খুলতে ভয় পেতো সে। বাবার সাথে তার সম্পর্ক কেমন ছিল, এটা অবশ্য আমি জানি না। কিন্তু…”
মুখে ছোট একটা হাসি একে আমার কথা শুনছেন ডায়োমেডেস, যেন কৌতুকের মজার অংশটা শোনা অপেক্ষায় আছেন। কিন্তু তোমার মনে হচ্ছে যে তুলনামূলক কম বয়সি কারো সামনে হয়তো মুখ খুলবে সে? যেমন…তুমি? তোমার ধারণা তুমি ওকে সাহায্য করতে পারবে, থিও? ওকে এই দশা থেকে উদ্ধার করতে পারবে? আবারো কথা বলাতে পারবে?”
“উদ্ধার করতে পারবে কি না সেটা ঠিক বলতে পারছি না, কিন্তু তাকে আসলেও সাহায্য করতে চাই আমি। অন্তত সেই চেষ্টাটুকু করার সুযোগ পেলে ভালো হতো।”
মুখের হাসিটা এখনও অটুট আছে ডায়োমেডেসের। “তুমিই প্রথম ওকে সুস্থ করার স্বপ্ন দেখোনি। আমার বিশ্বাস ছিল, আমি হয়তো পারবো, কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। অ্যালিসিয়াকে একটা নির্বাক মৎসকুমারীর সাথে তুলনা করা যায়। তাকে দেখে সব দক্ষ সাইকোথেরাপিস্টরা ছুটে আসবে সাহায্য করার আশায়।” আবারো শব্দ করে হাসলেন প্রফেসর। “ব্যর্থতার বিষয়ে এই বয়সে আমাকে বেশ কঠিন একটা শিক্ষা দিয়েছে ও। তোমারও হয়তো সেই শিক্ষাটা দরকার।”
দৃষ্টি নামিয়ে নিলাম না ইচ্ছে করেই। “যদি আমি সফল হই, তাহলে কিন্তু শিক্ষাটা পেতে হবে না।”
এবারে হাসিটা মুছে গেল ডায়োমেডেসের মুখ থেকে। এখন তার মনে কি চলছে, সেটা বোঝা মুশকিল। চুপ থাকলেন কিছু সময়, এর মাঝে একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলেন।
“তাহলে দেখা যাক কি হয়, নাকি? আগে অ্যালিসিয়ার সাথে দেখা করো। তার সাথে তো বোধহয় পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়নি তোমাকে?”
“না, এখন অবধি হয়নি।”
“ইউরির সাথে এ ব্যাপারে কথা বলল। আমাকে পরে রিপোর্ট দেবে।”
“ঠিক আছে,” উত্তেজনা চেপে বললাম। “দেব।”
.
১.৭
থেরাপি রুমটা তুলনামূলক ছোট, আয়তাকার। জেলখানার কক্ষের মতনই আসবাবপত্রের বালাই নেই। জানালাটাও বন্ধ, খিল দেয়া। ছোট একটা টেবিলের ওপর গোলাপী রঙের টিস্যবক্স, নিশ্চয়ই ইন্দিরার কাজ। ক্রিস্টিয়ানের মধ্যে ওর রোগিদের টিস্যু দেয়ার সৌজন্যবোধটুকু আছে বলে মনে হয় না।
রুমের প্রাচীন, রঙ উঠে যাওয়া চেয়ার দুটোর একটায় বসে পড়লাম আমি। সময় পার হচ্ছে ধীরে ধীরে, কিন্তু অ্যালিসিয়ার দেখা নেই। বোধহয় আসবে না সে, কে জানে? আমার সাথে দেখা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। মানা করে দেয়ার পূর্ণ অধিকার তার আছে অবশ্য।
কিছু না করে চুপচাপ বসে থাকতে পারলাম না বেশিক্ষণ। নার্ভাস লাগছে ভেতরে ভেতরে। উঠে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। ধলোমাখা কাঁচ ভেদ করে কোনমতে বাইরের দৃশ্য দেখা যায়।
মূল চত্বরটা আরো তিন তলা নিচে; একটা টেনিস কোর্টের সমান, চারপাশে লাল ইটের দেয়াল। বেশ উঁচু হওয়াতে দেয়াল টপকানো সম্ভব হবে না ভেতরের অধিবাসীদের পক্ষে। তবে কেউ না কেউ তো চেষ্টা করেছিলই নিশ্চয়ই। রোগিদের প্রতিদিন বিকেলে ত্রিশ মিনিট বাইরের খোলা হাওয়ায় সময় কাটানোর সুযোগ দেয়া হয়। ইচ্ছে থাকুক আর না থাকুক, বের হতেই হবে। তবে এই প্রচণ্ড ঠাণ্ডার মধ্যে কেউ যদি বের না হতে চায়, তবে তাকে দোষ দেয়া যাবে না। কেউ একা দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করছে, আবার কেউ অপ্রকৃতিস্থের মতন ইতস্তত পায়চারি করছে চত্বরের এক মাথা থেকে আরেক মাথা অবধি। যাদের অবস্থা তুলনামূলক ভালো, তারা একসাথে জড়ো হয়ে সিগারেট ফুকছে আর আড্ডা দিচ্ছে। তাদের কণ্ঠস্বর আর হাসির শব্দ শুনতে পাচ্ছি।
এবারেও প্রথম দর্শনে অ্যালিসিয়াকে খুঁজে পেলাম না। কিছুক্ষণ খোঁজার পর খেয়াল করলাম চত্বরের একদম কোণার দিকে দেয়াল ঘেঁষে একা দাঁড়িয়ে আছে সে। দেখে মনে হচ্ছে পাথর কুঁদে তৈরি কোন মূর্তি। এসময় ইউরিকে দেখলাম তার দিকে এগিয়ে যেতে। পাশেই দাঁড়ানো নার্সের সাথে কিছুক্ষণ কথা বলল সে। নার্স অনুমতি দেয়ার ভঙ্গিতে মাথা নাড়লে ধীর পদক্ষেপে অ্যালিসিয়ার দিকে এগিয়ে গেল লাটভিয়ান লোকটা।
আমি ওকে বলে দিয়েছি অ্যালিসিয়াকে খুব বেশি কিছু না বলতে। শুধু এটুকু জানালেই চলবে যে নতুন সাইকোথেরাপিস্ট তার সাথে দেখা করতে চেয়েছে। ইউরিকে বিশেষভাবে বলেছি, কথাটা যেন অনুরোধের সুরে বলে। কোন প্রকার জোর-জবরদস্তির প্রশ্নই আসে না। অ্যালিসিয়াকে দেখে অবশ্য মনে হচ্ছে না যে কেউ ওর সাথে কথা বলছে এটা বুঝতে পারছে। আগের মতনই ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। কিছুক্ষণ পর উল্টোদিকে ঘুরে হাঁটতে শুরু করে ইউরি।
আসবে না তাহলে। ধুর, আগেই ভাবা উচিৎ ছিল ব্যাপারটা। সময় নষ্ট হলো শুধু শুধু।
