এমনকি আধুনিক ইংল্যান্ডেও এ তিনটি ঘটনা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ স্বাধীন চিন্তার সঙ্গে সম্পৃক্ত তিনরকমের অসুবিধার দৃষ্টান্ত। অন্যান্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ স্বাধীন চিন্তাবিদেরা ব্যক্তিগত জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে আরো ভয়াবহ দৃষ্টান্তের কথা বলতে পারবেন। নগদ ফল হলো, যে লোক পয়সাওয়ালা নয়,ধর্মীয় বিশ্বাস সম্পর্কে তার অকপট ভাবে কথা বলার সাহস করা উচিত নয়। শুধু মাত্র ধর্মীয় কারণে যে স্বাধীনতার ঘাটতি ঘটেছে অথবা ধর্ম স্বাধীনতাকে বাধা দিয়েছে এটা সম্পূর্ন সত্য নয়। নিরীশ্বরবাদীতার চাইতেও সাম্যবাদের বিশ্বাস অথবা স্বাধীন ভালোবাসা একজন মানুষকে অধিকতর বিপদের সম্মুখীন করে। বিশ্বাস করার চাইতেও এদের সমর্থনে যুক্তি দেখিয়ে প্রচার করা ঢের বেশী বিপজ্জনক পক্ষান্তরে রাশিয়াতে প্রকৃতভাবে এর সুবিধা অসুবিধাগুলো সম্পূর্ণভাবে আমাদের বিপরীত, সেখানে নাস্তিকতা, সাম্যবাদ এবং স্বাধীন ভালোবাসার কথা প্রচার করলে আরাম আয়েশ এবং সুযোগ সুবিধা ভোগ করা যায়। এর বিরুদ্ধে অন্য কোন রকমের মতামত প্রচার করার কোন সুযোগ সেখানে নেই। এর ফল হলো, রাশিয়াতে একদল গোঁড়া লোক কতেক সন্দিগ্ধ বিশ্বাসকে চূড়ান্ত সত্য বলে বিশ্বাস করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে, অন্যদিকে পৃথিবীর বাকি অংশে এর বিপরীত কতেক বিশ্বাসকে অন্য কোন রকমের মতামত প্রচার করার কোন সুযোগ সেখানে নেই। এর ফল হলো, রাশিয়াতে একদল গোড়া লোক কতেক সন্দিগ্ধ বিশ্বাসকে চূড়ান্ত সত্য বলে বিশ্বাস করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে, অন্যদিকে পৃথিবীর বাকি অংশে এর বিপরীত কতেক বিশ্বাসকে অন্য অবস্থার ফলে দু’দিকেই অনিবার্যভাবে যুদ্ধ, নির্যাতন এবং তিক্ততার সৃষ্টি হয়।
উইলিয়াম জেমস বিশ্বাস করার ইচ্ছে (Will to believe) প্রচার করতেন, আমি ‘সংশয় পোষণ করার ইচ্ছে’ (Will to doubt) প্রচার করতে চাই। আমাদের কোন বিশ্বাসের সঙ্গে সত্যের সঠিক মিল নেই। প্রত্যেক রকমের বিশ্বাসে কিছু পরিমাণ অস্পষ্টতা, এবং ভুলের মরীচিকা বুৰ্তমান। আমাদের বিশ্বাসে অধিক পরিমাণ সত্যের আমদানি কি করে ঘটাতে হয় তা সকলেরই জানা পদ্ধতি। সবদিকের বক্তব্য মনোযোগ পূর্বক শ্রবণ করে, আমাদের নিজস্ব গোঁড়ামিকে বিপরীতধর্মী গোঁড়ামিসম্পন্ন মানুষের সঙ্গে আলাপ করে, নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা অর্জন করে এবং যে সমস্ত অনুমান এবং যুক্তি অসিদ্ধ প্রমাণিত হয়েছে সে সমস্ত যুক্তিকে বর্জন করার মনোভাব গড়ে তুললে আমাদের বিশ্বাসকে সত্যের নিকটবর্তী করে তুলতে পারি। এ সকল পদ্ধতি বিজ্ঞানে অনুসৃত হয়ে বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের প্রতিষ্ঠা করেছে। বিজ্ঞানের প্রত্যেক মানুষ যার প্রকৃত বৈজ্ঞানিক জ্ঞামের দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে, অবশ্যই স্বীকার করতে রাজি হবেন সে সম্বন্ধে বৈজ্ঞানিক জ্ঞান লাভ করতে হবে নব-আবিস্কারে প্রগতির সঙ্গে সঙ্গে সে বিষয়কেও সংশোধন করে নিতে হবে। সংশোধন করে না নেয়া হলে সকল ক্ষেত্রে অসমর্থ হলেও বিশেষ বিশেষ ব্যাপারে তা বাস্তব সত্যের কাছাকাছি পৌঁছুতে সমর্থ হবে। বিজ্ঞানে যখন অনুমানে নির্ভরশীল কোনো জ্ঞানের সন্ধান পাওয়া যায় তখন তা পরীক্ষামূলক এবং সন্দেহে পরিপূর্ণ।
ধর্ম এবং রাজনীতি যদিও পক্ষান্তরে বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের কোন আবেদন নেই তবুও প্রত্যেকে চায় যে ক্ষুধা, কারাবাস এবং যুদ্ধের ওপর নির্ভরশীল এমন একটা গোড়া নীতি তাতে থাকা প্রয়োজনীয়তাকে অন্যান্য মতামতের সঙ্গে যুক্তির আলোকে ঝালিয়ে পৃথক করে দেখবার কোন প্রয়োজন নেই। এ সমস্ত ব্যাপার মানুষ যদি পরীক্ষামূলকভাবে নিরীশ্বরবাদী ধাঁচের মনের অধিকারী হতে পারে তাহলে আধুনিক পৃথিবী দশভাগের নয় ভাগ দোষমুক্ত হতে পারত। এক পক্ষ যখন হৃদয়ঙ্গম করতে সমর্থ হবে যে উভয়পক্ষের দোষ আছে তখন যুদ্ধ করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। তখন নির্যাতনের অবসান হবে। শিক্ষার লক্ষ্য হবে মনকে প্রসার করা সংকীর্ণ করা নয়। ক্ষমতাসীনদের অযৌক্তিক খেয়ালের অনুসারে না হয়ে মানুষকে তার ক্ষমতানুসারে কাজের জন্য বাছাই করা হবে। সুতরাং একমাত্র বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন সংশয় যদি প্রবর্তন করা হয় তাহলে লক্ষ লক্ষ বছর ধরে পৃথিবীর সুখ সন্তুষ্টি বিধান করা যাবে।
আপেক্ষিক গুরুত্ব মতবাদের (Theory of relativity) প্রবর্তন এবং পৃথিবীতে তার ব্যাপক প্রসারে মনের বৈজ্ঞানিক মেজাজের উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। জার্মান সুইস শান্তিবাদী ইহুদী আইনস্টাইনকে যুদ্ধের প্রাথমিক বছরগুলোতে জার্মান সরকার গবেষণা অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ করলেন। একটি ইংরেজ অভিযাত্রীদল ১৯১৯ সনে অস্ত্র সংবরণ চুক্তির পরে একটি সূর্যগ্রহণে তার মতামতের সত্যতা যাচাই করলেন। তার থিয়োরি পদার্থবিদ্যার পুরোনো থিয়োরিগত ধারণাতে এক বিপ্লবের সঞ্চার করে। ডারউইনের মতবাদ যেমন সৃষ্টিতত্ত্বের ধারণাকে চুরমার করে ফেলে তেমনি তার মতবাদও গোড়া গতিবাদের ধারণার সম্পূর্ণ নিরসন করে। তা সত্ত্বেও তার মতবাদের সমর্থনে যখন ব্যাপক প্রমাণ প্রদর্শিত হলো পদার্থবিজ্ঞানীরা সর্বত্র তা গ্রহণ করতে কোন রকমের উষ্ম প্রকাশ করেননি। তাদের কেউ, এমন কি আইনস্টাইন নিজে দাবি করতে পারবেন না যে তিনি শেষ কথা বলেছেন, একথা তিনি নিজেও বলবেন না। তিনি সমাধান করতে পারেন নি, এমন বহু সমস্যা রয়ে গেছে। সুতরাং নিউটনের মতবাদকে তিনি যেমন বিশুদ্ধ করে নিয়েছেন, তার মতবাদেরও তেমনি বিশুদ্ধিকরণের প্রয়োজন রয়েছে। এই বিশ্লেষণাত্মক গোঁড়ামিমুক্ত মনের গ্রহণশীলতা হলো সত্যিকারের বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি।
