এটা পরিস্কার যে চিন্তাকে স্বাধীন করতে হলে প্রথমতঃ মতামত প্রকাশের জন্য যে আইনতঃ দণ্ডের ব্যবস্থা রয়েছে তা প্রত্যাহার করতে হবে। কোন বিশাল দেশ এখনো এই স্তরের স্বাধীনতাও অর্জন করেনি, যদিও অনেক দেশ মনে করে যে তারা জনসাধারণকে অনুরূপ স্বাধীনতা দিয়েছে। যে মতবাদগুলো এখন মানুষকে ভয়ঙ্করভাবে পীড়ন করছে সেগুলোর প্রকোপ এত ভয়ানক এবং এগুলো এতই নীতিহীন যে তার প্রতি অধিকাংশ মানুষকে সহনশীলতার নীতি গ্রহণ করতে বলা এরকম অসম্ভব। যে কারণে মনের অনুসন্ধিৎসু প্রবৃত্তি নিপীড়ত, একই কারণে এ সকল দৈত্যের মতো প্রতিবন্ধকের সৃষ্টি হয়েছে। আজকের যুগের বলশেভিক মতবাদকে যে রকম ভাবা হয়, এমন এক সময় ছিল যখন প্রোটেষ্টান্ট মতবাদকেও তেমনি মারাত্মক ভাবা হতো। দয়া করে এ মন্তব্য থেকে আমাকে কেউ বলশেভিক অথবা প্রোটেষ্টান্ট ভাববেন না।
সে যাহোক আধুনিক পৃথিবীতে আইনতঃ শাস্তি হলো চিন্তার স্বাধীনতার প্রাথমিক প্রতিবন্ধক। আর অন্য দুটো বাধা হলো অর্থদণ্ড এবং প্রমাণকে বিকৃত করবার বাধা। যদি কোন মতবাদের ফলে মানুষের জীবনধারণের পেশা মুক্ত হতে না পারে তাহলে চিন্তার যে স্বাধীনতা থাকতে পারে না সে কথা দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। আরো পরিষ্কার যে কোন বিতর্কিত বিষয়ে অন্যদিকের যুক্তি শ্রমসাধ্য অনুসন্ধানের দ্বারা আবিস্কার না করে একদিকের যুক্তিকে পুনঃ পুনঃ সুন্দরভাবে আকর্ষণীয় করে তুললে সেখানেও চিন্তার স্বাধীনতা বিঘ্নিত হয়। আমার জানা মতো চীনদেশ ছাড়া সকল বড় দেশে এ দুরকমের প্রতিবন্ধক বর্তমান স্বাধীনতার শেষ আবাসস্থল ছিল (বা আছে) চীনদেশ। এ সকল বাধা তাদের বর্তমান ব্যাপকতা বৃদ্ধির সম্ভাবনা, এবং তা হ্রাস কিভাবে করা যায় তাই হলো আমার আলোচনার বিষয়।
বিশ্বাসসমূহের সঙ্গে স্বাধীন প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হতে পারলে আমরা চিন্তাকে স্বাধীন বলতে পারি। তার মানে, যখন সকল রকমের বিশ্বাস নিজস্ব বা কোন প্রকার আইনগত অথবা অর্থনৈতিক সুবিধা বা অসুবিধা থেকে মুক্ত হয়ে প্রকাশ করতে সক্ষম। এটা হচ্ছে একটা আদর্শ, বিভিন্ন কারণে তার পুরোপুরি কখনো অর্জন করা যাবে না। আমরা বর্তমানে যেমন করি তেমনি না হাতড়ে অধিকতর সন্নিকটে এর আহবান গিয়ে পৌঁছবে।
আমার জীবনের তিনটি ঘটনা প্রমাণ করবে যে আধুনিক ইংল্যাণ্ডে খ্রিষ্টান ধর্মের স্বপক্ষেই সকল কিছু করা হয়। প্রকাশ্যে নিরীশ্বরবাদে বিশ্বাস করবার যে কি বিপদ অনেক মানুষ এখনো জানে না বলেই আমার ব্যক্তিগত জীবনের ঘটনার কথা উল্লেখ করলাম।
প্রথম ঘটনাটি ঘটেছিল আমার জীবনের খুবই শৈশবকালে। আমার বাবা ছিলেন স্বাধীন চিন্তাবিদ। আমার তিন বছর বয়সের সময় তিনি মারা যান। তার ইচ্ছে ছিলনা যে আমি কোনরকমের কুসংস্কারের মধ্যে বেড়ে উঠি; এজন্য দু’জন স্বাধীন চিন্তাবিদকে তিনি আমার অভিভাবক নিযুক্ত করেছিলেন। আদালত তার উইলকে অগ্রাহ্য করে আমাকে খ্রিষ্টধর্মে শিক্ষা দিলো। আমি ভয় পেয়েছিলাম কিন্তু এর কোন প্রভাব আমার ওপর পড়েনি; তা বলে সে দোষ আইনের নয়। যদি তিনি আমাকে খ্রিস্টমতে লফিয়ান, মিউগলটোনিয়ান অথবা সেভেনথডে এডভেটিষ্ট হিসেবে শিক্ষিত করার কথা বলে যেতেন তাহলে আদালত স্বপ্নেও আপত্তি করার কথা ভাবতোনা। একজন বাবার মৃত্যুর পরে তার ছেলেকে কল্পিত কুসংস্কারে দীক্ষিত করার জন্যে বলে যাবার অধিকার আছে, কিন্তু তার ছেলে কুসংস্কার মুক্ত হিসেবে বেড়ে উঠবে একথা বলে যাবার অধিকার নেই।
দ্বিতীয় ঘটনা ঘটে ১৯১০ সালে। উদারনৈতিক পার্টির থেকে তখন আমার পার্লিয়ামেন্টের নির্বাচনে দাঁড়াবার ইচ্ছে ছিল। পার্টি হুইপ বিশেষ একটি নির্বচনী এলাকা থেকে আমার নাম সুপারিশও করেছিলেন। আমি উদারনৈতিক সভায় বক্তৃতা দান করলাম। তারা সকলে আমার সম্বন্ধে সন্তুষ্টি প্রকাশ করলেন, সুতরাং আমার অংশ গ্রহণ করার সবকিছু এরকম ঠিকঠাক হয়ে গেলো। এর পরে আভ্যন্তরীণ ক্ষুদ্র একটি অভিসন্ধিপরায়ন দল আমার কাছে জিজ্ঞেস করলেন, আমি নিরীশ্বরবাদী কিনা। জবাবে আম স্বীকার করলাম যে, আমি একজন নিরীশ্বরবাদী। তারা আরো জিজ্ঞেস করলেন যে মাঝে মাঝে গির্জায় যেতে রাজি আছি কিনা। জবাবে আমি রাজি নই বলে জানিয়ে দিলাম। তারপরে তারা আরেকজন সদস্যকে মনোনয়ন দান করলেন, যিনি ঠিকমত পাশ করে গেলেন এবং তখন থেকে পার্লামেন্টের সদস্য। তিনি বর্তমান সরকারে ও (১৯২২) একজন সদস্য।
এর অল্প কিছুদিন পরেই তৃতীয় ঘটনাটি ঘটল। আমাকে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ট্রিনিটি কলেজে লেকচারারের পদ গ্রহণ করার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হলো, কিন্তু ফেলো হিসেবে নয়। ফেলো এবং লেকচারারের মধ্যে মাইনের কোন প্রভেদ নেই। প্রভেদ হলো কলেজের পরিচালনা ব্যবস্থায় ফেলোর ভূমিকা আছে, খুব গুরুতর নৈতিকতাহীনতার অপরাধ ছাড়া মেয়াদ ফুরাবার আগে ফেলোকে বরখাস্ত করা যায় না। কেরাণি-গোষ্ঠীর অকেরাণি সুলভ একটি ভোট বাড়ানোর ইচ্ছে না-থাকার জন্যেই আমাকে ফেলোশিপ প্রদান করা হয়নি। এর ফল হলো ১৯১৬ সালে যুদ্ধ সম্বন্ধে আমার মতামতের সঙ্গে তাদের যখন মিল হলো না তখন তারা আমাকে বরখাস্ত করতে সক্ষম হলো। আমাকে যদি লেকচারারশিপের আয়ের ওপর নির্ভর করতে হতো, তাহলে আমাকে অনাহারে মরতে হতো।
