ধর্ম এবং রাজনীতির ক্ষেত্রে আইনস্টাইন কিছুর উদ্ভাবন যদি করতেন তাহলে কি হতো? ইংরেজরা তার মধ্যে প্রশিয়ান উপাদান খুঁজে পেতো, ইহুদী বিরোধীরা তার মধ্যে ইহুদী ষড়যন্ত্রের গন্ধ পেতো। সমগ্র বিশ্বের জাতীয়তাবাদীরা তার মধ্যে পুষ্প সৌগন্ধময় শান্তিবাদের কীট এবং সামরিক পেশা এড়িয়ে যাবার ফন্দী আবিষ্কার করতো। পুরনো মতাবলম্বী অধ্যাপকবৃন্দ তাঁর লেখা আমদানী নিষিদ্ধ করার জন্যে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের গোয়েন্দা বিভাগকে আবেদন করত। কোন শিক্ষক তার লেখাকে সমর্থন করলে চাকুরি থেকে বরখাস্ত করা হতো। এই সময়ের মধ্যে তার মতাবলম্বী দল যদি কোন অনুন্নত দেশের সরকার পদে বরিত হতো, যেখানে তার মতবাদ ছাড়া আর কিছু শিক্ষা দেয়া বেআইনী হয়ে দাঁড়াত এবং ধীরে ধীরে তা রহস্যময় বিশ্বাসে রূপ লাভ করত, আসল তাৎপর্য কেউ বুঝতে পারত না। স্বপক্ষে বিপক্ষে টাটকা যুক্তির অনুসরণ না করে তার মতামতের সত্যতা অথবা অসারতা যুদ্ধক্ষেত্রেই নির্ধারিত হবে। এই পদ্ধতি হলো উইলিয়াম জেমসের বিশ্বাস করার ইচ্ছা করার (Will to believe) যুক্তিসঙ্গত ফলাফল থেকে উদ্ভূত।
বিশ্বাস করার ইচ্ছা বা (Will to believe) আমাদের কাঙ্খিত বিষয় নয়, যা আমাদের প্রয়োজনীয় তা হলো খুঁজে নেয়ার ইচ্ছে বা উইল টু বিলিভ বা বিশ্বাস করার ইচ্ছা সম্পূর্ণ বিপরীত।
যুক্তিগত সংশয়ের কিছু প্রয়োজনীয়তা যে রয়েছে সে কথা অস্বীকার করা যায় না। পৃথিবীতে অনেক বেশি যে অযৌক্তিক নিশ্চয়তা রয়েছে সে সম্বন্ধে অনুসন্ধান করা জরুরী প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে। গড়পড়তা মানুষের চরিত্রের বিশ্বাস প্রবণতা এবং উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত অযৌক্তিক বিশ্বাস থেকে এর অনেকগুলো উদ্ভব। বুদ্ধিবৃত্তিক পাপের এ আদি বীজগুলো যে বিভিন্ন উপায়ে অঙ্কুরিত এবং বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয় তার মধ্যে শিক্ষা, প্রোপাগাণ্ডা এবং অর্থনৈতিক চাপই প্রধান। আমরা সেগুলো আলাদাভাবে আলোচনা করছি।
(১) শিক্ষাঃ প্রত্যেক প্রাগ্রসর দেশে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার ভার রয়েছে রাষ্ট্রের হাতে। কতেক জিনিস যে মিথ্যা সে কথা সকল সরকারি চাকুরেরা পাঠ্যসূচী নির্ধারণ করেন তাঁরাও জানেন। আর কিছু যে মিথ্যা নিদেনপক্ষ অত্যন্ত সন্দেহাত্মক তা সংস্থার মুক্ত মানুষের দৃষ্টিতে ধরা পড়ে। উদাহরণস্বরূপ ইতিহাস শিক্ষাদানের ব্যাপারে ধরা যাক। স্কুলপাঠ্য বইয়ে প্রত্যেক জাতির লক্ষ্য থাকে নিজস্ব ইতিহাসের গৌরব বৃদ্ধি করা। একজন মানুষ আত্মজীবনী রচনা করার সময় কিছু বিনয় প্রকাশ করবেন এটা আশা করা স্বাভাবিক, কিন্তু একটা জাতি যখন আত্মজীবনী লেখে তখন এর গর্ব এবং দম্ভের সীমা থাকেনা। আমি যখন ছোট ছিলাম তখন পড়ানো হতো ফরাসিরা খারাপ, জার্মানেরা ভালো। এখন তারা উল্টো শিক্ষা দিয়ে থাকেন। এ দু’য়ের মধ্যে কোথাও সত্যের লেশমাত্র নেই। জার্মান স্কুলপাঠ্য বইতে ওয়াটার যুদ্ধ প্রসঙ্গে লেখা হয়েছে ওয়িলংটন যখন প্রায় পরাজিত তখন বুচার এসে পরাজয়ের হাত থেকে আত্মরক্ষা করলেন। কিন্তু ইংরেজি স্কুলপাঠ্য বইতে বুচারের কথা কদাচিৎ উল্লেখিত হয়েছে। এখানে ইংরেজ এবং জার্মান ঐতিহাসিকদের দু’জনের কেউ সত্য কথা বলছেন না। আগেকার আমেরিকান স্কুলপাঠ্য বইয়ের বৃটিশের প্রবল নিন্দা করা হতো। যুদ্ধের পর থেকে আমেরিকান স্কুলপাঠ্য বইগুলো কোন ব্যাপারে আসল সত্য উদ্ঘাটন না করে ভয়ঙ্কর ভাবে বৃটিশভক্ত হয়ে পড়েছে। আগে এবং বর্তমানে আমেরিকান শিক্ষাব্যবস্থার প্রধান উদ্দেশ্য হলো বাইরে থেকে আগত বিচিত্র ছেলেদেরকে খাঁটি আমেরিকান হিসেবে গড়ে তোলা। যে অর্থে জার্মানেরা ভালো জার্মান হিসেবে গড়ে ওঠে, জাপানিরা গড়ে ওঠে ভালো জাপানী হিসেবে সে অর্থে আমেরিকানরা ভালো আমেরিকান হিসেবে গড়ে ওঠেনা; বরঞ্চ গড়ে ওঠে খারাপ মানুষ হিসেবে। যে ভদ্রলোক অথবা ভদ্রমহিলা সব সময় আমেরিকা পৃথিবীর সুন্দরতম দেশ এ বিশ্বাসে গদগদ এবং যে কোন ঝগড়ায় উৎসাহের সঙ্গে তা সমর্থন করে, সে ভদ্রলোক অথবা ভদ্র মহিলাকে ভালো আমেরিকান বলা যেতে পারে। এ বিশ্বাসগুলো যদি সত্য হতো তাহলে একজন বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের তাদের সঙ্গে ঝগড়া করার কিছু থাকতো না। কিন্তু এগুলো সত্য হলে সেগুলো শুধু আমেরিকায় কেননা সর্বত্র শিক্ষা দেয়া উচিত। কোন বিশেষ দেশ যে সকল প্রস্তাবনার মাধ্যমে আত্মগৌরব বৃদ্ধি করে সে বিশেষ দেশের বাইরে কোথাও সে প্রস্তাবনা সমূহ যে বিশ্বাস করা হবে এতে প্রচুর সন্দেহের অবকাশ রয়েছে।
বস্তুতঃ সকল দেশই ছেলেদেরকে বিনা বাধায় উদ্ভট কুসংস্কারে দীক্ষিত করার দিকে ঝুঁকে পড়েছে। এর প্রতিক্রিয়া হলো সত্যের নামে কতকগুলো দুষিত স্বার্থের সমর্থনে মৃত্যুবরণ করবার জন্য মনকে দৃঢ় করা। অথচ তারা জানতে পারে না যে ন্যায় এবং সত্যের নামে কি মন্দ সংকল্পে আত্মসমর্পণ করে বসে আছে। যে অসংখ্য পদ্ধতিতে শিক্ষাব্যবস্থাকে নির্দেশ দেয়া হয়, এ হচ্ছে তার মধ্যে একটি; যার উদ্দেশ্য সত্যিকারের জ্ঞানদান করা নয়, মানুষকে শাসকদের ইচ্ছানুসারে নতিস্বীকার করানো। প্রাথমিক বিদ্যালয়সমূহের শিক্ষার নামে যে প্রবঞ্চনা করা হয় একটি ব্যাপক পদ্ধতির মাধ্যমে তার নিরসন না ঘটালে গণতন্ত্রের প্রচলন অক্ষুণ্ণ রাখা যাবে না।
