মানুষের দৈনন্দিন সমস্যা বিভিন্নমুখী এবং গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক যন্ত্র বিভিন্ন পার্টি এবং জাতির ক্ষমতার দ্বন্দ্বে এ সমস্যাকে খুবই লঘু দৃষ্টিতে দেখে। আইনতঃ অথবা সংবিধানগত কোন পরিবর্তন না ঘটিয়ে একটি ভিন্নরকম যন্ত্র সৃষ্টি করা অসম্ভব নয়। যা জাতির অথবা পার্টিগত ভাবাবেগ নিরোধ করে শুধুমাত্র শত্রুদের নিপাত না করে যে সকল প্রচেষ্টা সকলের জন্য উপকারী তার উদ্যোগ গ্রহণ করতে সমর্থ হবে। আমার পরামর্শ হলো, স্বদেশে পার্টি সরকার এবং বিদেশে বৈদেশিক অফিসে কূটনীতির মাধ্যমে না করে, যেমন বলেছি তেমনি স্বতঃস্ফূর্তভাবে অনুসন্ধান করলে বর্তমান সভ্যতাকে যা ধ্বংস করেছে, তা নিরোধের একটি পন্থা পাওয়া যাবে জ্ঞান সব সময়েই তাকে, সদিচ্ছাও সবসময়ে থাকে, কিন্তু যে পর্যন্ত না জ্ঞান এবং সদিচ্ছা প্রচারের মধ্যেই শক্তি অর্জন করে।
১২. স্বাধীন চিন্তা এবং সরকারী প্রচারণা
মন কিউর কনওয়ে যার সম্মানার্থে আজ আমরা সকলে এখানে সমবেত হয়েছি, তিনি চিন্তার স্বাধীনতা এবং ব্যক্তিস্বাধীনতা এই দুই মহান লক্ষ্যের জন্য প্রাণপাত করেছেন। এ দু’ বিষয়ে তাঁর সময় থেকে এ পর্যন্ত অনেক নতুন কিছুর প্রকাশ এবং অনেক কিছুর বিলোপ ঘটেছে পুরনো যুগের তুলনায় নতুন বিপদ আলাদাভাবে এ দু’জাতীয় স্বাধীনতা হরনের ভীতি প্রদর্শন করেছে। এ দু’রকমের স্বাধীনতা সংরক্ষণ করার জন্য যদি অতন্দ্র জনমতকে জাগরিত করা না হয় তাহলে আজ থেকে একশ বছর পর্যন্ত এ-দুরকমের স্বাধীনতার ঘাটতি পূরণ হবে না। আমার এ প্রবন্ধের উদ্দেশ্য দোষগুলোকে দেখানো এবং কিভাবে সেগুলোর সঙ্গে মোকাবেলা করা যায় তা বিবেচনা করা।
স্বাধীন চিন্তা বলতে কি বোঝায় তাই নিয়ে আমাদের আলোচনা শুরু করা যাক। এ বক্তব্যের আবার দু’রকম তাৎপর্য আছে। সংকীর্ণ অর্থে স্বাধীন চিন্তা বলতে প্রাচীন ধর্মসমূহের মতবাদকে অস্বীকার করা বোঝায়। এ অর্থে যে লোক মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, সিন্টো ধর্মমত অথবা উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত অন্য কোন মতবাদকে সত্য বলে বিশ্বাস করেন না তাঁকে স্বাধীন চিন্তাবিধ বলা যায়। খ্রিষ্টান অধিবাসীদের দেশে যে মানুষ আল্লাহকে বিশ্বাস করেন না তাঁকে স্বাধীন চিন্তাবিদ বলা হয়, আবার বৌদ্ধদের দেশে শুধুমাত্র স্রষ্টার প্রতি অবিশ্বাসই স্বাধীন চিন্তাবিদ হওয়ার প্রয়োজনীয় গুনাবলী নয়।
এ অর্থে স্বাধীন চিন্তার প্রয়োজনীয়তা আমি কম করে দেখতে চাইনে। আমি নিজে সর্ব প্রকার ধর্মমতকে অধিকার করি এবং বিশ্বাস করি যে সব প্রকারের ধর্ম বিশ্বাসের বিলয় ঘটবে। ধর্মীয় বিশ্বাস আল্লাহকে পাওয়ার শক্তি বিশেষ একথায় আমি সম্পূর্ণরূপে বিশ্বাস করি না। আমি সব সময় স্বীকার করতে রাজি আছি বিশেষ বিশেষ যুগের বিশেষ বিশেষ স্থানে ধর্মের কিছু সুফল ফলেছে, তখন ছিল মানুষের বিচার বুদ্ধির শৈশব অবস্থা আমরা এখন সে স্তর অতিক্রম করে যাচ্ছি।
কিন্তু এ ছাড়াও স্বাধীন চিন্তার বৃহত্তর দিগন্ত রয়েছে, আমি তার প্রয়োজন আরো তীক্ষ্ণতম বলে মনে করি। প্রকৃত প্রস্তাবে পুরনো ধর্মগুলো যে মানুষের উদারতার দিগন্ত সম্বন্ধে চিন্তার পথ রুদ্ধ করেছে এ সত্য অনুসন্ধান করলে জানা যাবে সংকীর্ণ অর্থে স্বাধীনচিন্তাকে যত সহজে সংজ্ঞায়ন করা তত সহজ নয় এবং এর মূল তাৎপর্যে পৌঁছুতে হলে কিছু সময় ব্যয় করা সুবিধাজনক হবে।
যখন আমরা কোন কিছুকে স্বাধীন বলি তা কী এবং কিসের থেকে স্বাধীন তা–বলা পর্যন্ত কোন সুনিদিষ্ট অর্থ ফুটে উঠেনা। কোন কেউ অথবা কোন কিছু যখন বাহ্যিক বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্ত তখন তাকে স্বাধীন বলা যায়। সংক্ষেপে বলতে গেলে আমাদের বলা উচিত তা কী ধরনের বাধ্যবাধকতা। সব সময় বর্তমান কিছু পরিমাণ বাহ্যিক বাধা থেকে মুক্ত যখন তখনই চিন্তাকে স্বাধীন বলা যায়।এর মধ্যে কতেক স্পষ্ট প্রতিবন্ধক আছে, চিন্তার স্বাধীনতা রক্ষা করতে হলে সে গুলোর অপসৃতি একই প্রয়োজন। কিন্তু এ ছাড়া আরো বাধা আছে, যেগুলো সূক্ষতর এবং সহজে ধরা যায় না।
স্পষ্টতর প্রতিবন্ধক সমূহকে নিয়ে শুরু করা যাক। চিন্তা তখন স্বাধীন থাকতে পারে না, যখন কোন মতামতকে বিশ্বাস বা অবিশ্বাস করলে দণ্ড দিতে হয় অথবা কোনো বিষয়ে বিশ্বাস করা বা বিশ্বাস না করার জন্যে কৈফিয়ত দিতে হয়। পৃথিবীর খুব স্বল্পসংখ্যক দেশে এখন পর্যন্ত এ সামান্য স্বাধীনতাটুকু পর্যন্ত নেই। ইংল্যাণ্ডে আল্লাহর আইনানুসারে খ্রিস্টান ধর্মের প্রতি অবিশ্বাসের কথা উচ্চারণ করা বেআইনী; যদিও সঙ্গতিপন্নদের বিরুদ্ধে সে আইন কখনও কার্যকরী নয়। খ্রিষ্ট যা শিক্ষা দিয়েছেন এবং যে বিষয়গুলো খ্রিস্টের শিক্ষার পরিপন্থী সেগুলো শিক্ষা দেওয়াও বেআইনী। সুতরাং যে কেউ অপরাধী হতে না চাইলে তাকে বলতে হবে তিনি যীশুখ্রিস্টের শিক্ষার সঙ্গে একমত কিন্তু খ্রিস্ট কী বলে গেছেন তা মুখ ফুটে বলতে পারবেন না। নৈরাজ্যবাদ এবং বহুবিবাহে বিশ্বাস করে না এবং একবার অভ্যন্তরে প্রবেশ করলে তাকে সাম্যবাদকেও অবশ্যই অবিশ্বাস করতে হবে। জাপানে মিকাডোর স্বর্গীয় উত্তরাধিকারীত্বের প্রতি অবিশ্বাস প্রকাশ করা বেআইনী। সুতরাং দেখা যাচ্ছে পৃথিবীর চারদিকে ভ্রমণ করে আসাটা বিপজ্জনক অভিযানের মতো। একজন মুসলমান একজন তলস্তয় পন্থী একজন বলশেভিক অথবা একজন সাম্যবাদী কিছু অংশে অপরাধী না হয়ে এ কাজ করতে পারে না অথবা তিনি গুরুত্বপূর্ণ সত্য বলে মনে করেন সে ব্যাপারে তার জিহ্বা একেবারে বন্ধ রাখতে হবে। কিন্তু এ ব্যবস্থা তৃতীয় শ্রেণীর যাত্রীদের জন্য সেলুনে যারা ভ্রমণ করেন তারা গায়ে পড়ে কোন ক্ষতিকর কিছু না করে যা ইচ্ছে তা বিশ্বাস করতে পারেন।
