ব্যাপকভাবে রাজনৈতিক সংশয়বাদ সম্ভবপর। মনস্তাত্ত্বিক দিক দিয়ে জাতি অথবা সামাজিক শ্রেণীর প্রতি বিদ্বেষ না পোষণ করে রাজনৈতিকদের প্রতি আমাদের শত্রুতার দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে হবে। রাজনৈতিকদের সাহায্য ব্যতিরেকে শত্রুতা ক্রিয়াশীল হবে না, যে শক্রতার লক্ষ্য তারা তা হতে পারে কারো মনস্তাত্ত্বিক সন্তষ্টির পরিচায়ক কিন্তু সামাজিকভাবে ক্ষতিকর নয়। উইলিয়াম জেমসের অনুভূত অভাব পূরণ করার জন্য যেমন প্রয়োজন তেমনি নৈতিকতাকে এমন উর্ধ্বে প্রতিষ্ঠিত করা উচিত বলে আমি মনে করি “নৈতিকভাবে যা হবে যুদ্ধের সমার্থক” হতে পারে সত্য, এর ফলে রাজনীতি দুষ্ট লোকদের হাতে পরতে পারে (যে সব লোককে আমি এবং আপনি না পছন্দ করি। কিন্তু তারও একটা সুফল থাকতে পারে। আমি ১৯২৩ সনের ২৬শে সেপ্টেম্বরের ফ্রিম্যান কাগজে একটা গল্প পড়েছিলাম যা রাজনৈতিক বাটপারির প্রয়োজনীয়তার একটা চূড়ান্ত নজির বলে বিবেচিত হতে পারে। একজন ইংরেজ একজন বয়স্ক “জাপানি রাজনীতিবিদের সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্বন্ধ পাতানোর পর জিজ্ঞেস করলেন “জাপানি ধনীরা অসাধু এবং চীনারা সাধু কারণ কি? তিনি জবাব দিলেন, কিছুদিন আগে থেকে চীনা রাজনীতিতে ভয়ঙ্কর রকমের দুর্নীতি অনুপ্রবেশ করেছে এবং চীনা আদালতে হঠকারিতা ন্যায়বিচারের স্থান দখল করেছে। সুতরাং তখন থেকে উজ্জ্বলতা এবং ধ্বংসের হাত থেকে ব্যবসাকে রক্ষা করার জন্যে চীনা ব্যবসায়ীরা কঠোর নৈতিকতা বজায় রাখতে বাধ্য হলো। তখন থেকে চীনা ব্যবসায়ীদের মুখের কথা তার হাতে লেখা দলিলের মতো হয়ে দাঁড়াল। কিন্তু জাপানের ব্যবসায়ীরা এরকম কোন অবস্থার সম্মুখীন হয়নি কারণ পৃথিবীতে একমাত্র আমাদেরই সবচেয়ে সৎ আইন ব্যবস্থা রয়েছে। সুতরাং যখন আপনি একজন জাপানির সঙ্গে ব্যবসা করেন হুঁশিয়ার হয়ে করবেন।” এই গল্প থেকে প্রমাণিত হয় যে অসাধু রাজনৈতিকরা সাধু রাজনৈতিকদের চেয়ে বেশি ক্ষতি করে।
একজন সৎ রাজনৈতিক সম্বন্ধে ধারণা পোষণ করা খুব সহজ নয়। সৎ রাজনৈতিকের খুব সহনশীল সংজ্ঞা হলো তিনি ব্যক্তিগত লাভ লোভের বশবর্তী হয়ে কোন রাজনৈতিক কর্মে আত্মনিয়োগ করেন না। এই অর্থে মি. লয়েড জর্জকেও সৎ বলা যায়। তার পরবর্তী পর্যায়ে যে লোকের কথা আসবে সে লোক কেবলমাত্র অর্থনৈতিক লক্ষ্য ছাড়া ক্ষমতা লাভ এবং ক্ষমতা অটুট রাখার জন্য রাজনৈতিক কর্মে আত্মনিয়োগ করেন না। এই অর্থে লর্ড গ্রেকেও একজন সৎ রাজনৈতিক বলে অভিহিত করা যায়। শেষ এবং কঠোর অর্থে তিনি একজন সৎ রাজনৈতিক, যিনি জনসাধারণের কাজ নিস্পৃহতাসহকারে করে থাকেন। কিন্তু সত্যবাদিতা এবং সম্মানের জন্য পরিচিতরা তাকে কখনো নীচ দৃষ্টিতে দেখে না। এই অর্থে স্বৰ্গতঃ লর্ড মর্লি ছিলেন একজন সৎ রাজনৈতিক। সতোর কারণেই রাজনীতি থেকে তিনি বিতাড়িত হয়েছিলেন। কিন্তু যে রাজনীতিবিদ সৎ উচ্চতর অর্থে তিনিও ক্ষতি করেন, তৃতীয় জর্জকে এর দৃষ্টান্ত হিসেবে গণ্য করা যায়। বোকামি এবং অচেতন পক্ষাপাতিত্ব প্রতিহিংসার চেয়েও বেশি ক্ষতি করে। অধিকন্তু একজন সৎ রাজনৈতিক গণতন্ত্র সহ্য করেনা যদি না তিনি ডেভোনশায়ারের ডিউকের মতো ধড়িবাজ হতে না পারেন। কেবলমাত্র ধড়িবাজেরা জাতির অর্ধেক মানুষের কুসংস্কারে অংশগ্রহণ করতে পারে। সুতরাং যে লোক সক্ষম ও জনগণ সম্বন্ধে উৎসাহী তাকে রাজনীতিতে সাফল্য লাভ করতে হলে অবশ্যই কপট হতে হবে। কিন্তু সময়ে তার কপটতা তার প্রতি জনগণের ভালোবাসাকে হত্যা করবে।
গণতন্ত্রের বর্তমানে দোষত্রুটিকে দূরীভূত করতে হলে এখন যে পদ্ধতিটি আমাদের প্রধানতঃ অবলম্বন করা উচিত, তাহলে প্রতিটি বিষয়ে প্রচারের জন্যে সরকারি কর্মচারীদের আরো উৎসাহী হতে হবে এবং এব্যাপারে তাদের আরো উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। সময় সময়ে তাদের নিজের নামে বিল পাশ করাবার অধিকার থাকা উচিত এবং জনসাধারণের সামনে তার সমর্থনে যুক্তি পেশ করা তাদের কর্তব্য হওয়া উচিত। অর্থ এবং শ্রমের ওপর আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে এবং তাদের উচিত একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা গঠন করে, তার মাধ্যমে এ পদ্ধতি বিভিন্ন দেশের মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রয়োগ করার চেষ্টা করা, যাতে করে পদ্ধতিটি দীর্ঘকালব্যাপী টেকসই হতে পারে। আলোচনার মাধ্যমে একটি সার্বজনীন পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে। এইভাবে সব সমস্যার সমাধান করতে হবে। এটা সম্ভব নয় এবং আশা করাও উচিত নয় যে গণতান্ত্রিক পার্লামেন্টে বিতর্ক করে সব সমস্যার সমাধান করতে হবে। কোন চেষ্টাকে ফলবতী করে তুলতে হলে পরিপূর্ণ আলোচনার সঙ্গে বিশেষজ্ঞদের মতামতের সমন্বয় বিধান করে সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে তা প্রচার করতে হবে। কিন্তু এখন অনেক ব্যাপারে বিশেষজ্ঞদের সুচিন্তিত মতামত কী তা জনসাধারণ জানতে পারে না, এর কারণ তাদের সমষ্টিগত অথবা অধিকাংশের সমর্থন আলাদা করার মতো কোন যন্ত্র এখন পর্যন্ত সম্পূর্ণভাবে চালু করা হয়নি। বিশেষ করে সরকারি কর্মচারীদেরকে তাদের মতামত বিশেষ বিশেষ অরাজনৈতিক ক্ষেত্র ছাড়া জনসাধারণকে জানতে দেয়া হয় না। আন্তর্জাতিক আলোচনার পর পার্টিগত বিভেদের বিরুদ্ধে তাকে প্রয়োগ করলে পরে যে সকল মতভেদ আমরা এখন স্বতঃসিদ্ধ বলে ধরে নিয়েছি তার কড়াকড়ি অনেকটা হ্রাস পাবে। আমি বিশ্বাস করি, আন্তর্জাতিক শ্রম এবং আন্তর্জাতিক অর্থ সম্মেলন যদি জাতিসমূহের পারস্পরিক অবিশ্বাস নিরসন করতে সক্ষম হয় তাহলে এমুহূর্তে এমন একটি সিদ্ধান্ত এরকম হতে পারে যা পার্লামেন্টে চালু করা যাবে। কয়েক বছর পর এবং জগতের প্রভূত উপকার করা যাবে এ সম্মিলিত প্রচেষ্টার বিরোধিতা করা খুবই কষ্টকর হয়ে দাঁড়াবে। •
