যে পদ্ধতি যুদ্ধের ফলে ধীরে ধীরে জন্মলাভ করল, ১৯১৮ সালে তা সম্পূর্ণ প্রয়োজনীয় বৈশিষ্ট্যসহ আন্তর্জাতিক সমাজতন্ত্রবাদের রূপ পরিগ্রহ করে। মিত্র সরকার যৌথভাবে খাদ্য এবং কাঁচামালের একমাত্র ক্রেতা ছিল এবং তাদের দেশে নয় শুধু ইউরোপের নিরপেক্ষ দেশগুলোতেও কি কি আমদানি করা হবে, তা নির্ধারণ করার একমাত্র বিচারক ছিল তারাই। কাঁচামালের নিয়ন্ত্রন করে উৎপাদনব্যবস্থাকে নিরঙ্কুশভাবে তারাই নিয়ন্ত্রণ করেছিল এবং ফ্যাক্টরির ব্যাপারে পর্যন্ত রেশনিং ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিল। খাদ্য বস্তুর খুচরা বিক্রয়ও তারা নিয়ন্ত্রণ করেছিল। তারা খাদ্যবস্তু বিক্রয়ের পরিমাণ এবং দর বেঁধে দিয়েছিল। সমুদ্র তীরবর্তী পরিবহন সংস্থার মাধ্যমে তাদের আদেশ প্রতিপালিত হতো এবং যুদ্ধের শেষাশেষি তারা বিশ্বের সমস্ত জাহাজ চলাচল ব্যবস্থার দণ্ডমুণ্ডের কর্তা হয়ে বসল। সে কারণে আমদানি রপ্তানি বাণিজ্যের হুকুম দেয়ার অধিকার তারা লাভ করল। পদ্ধতিটি সমস্ত রকমের বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত একটি আন্তর্জাতিক সমাজতন্ত্রের মত ছিল, প্রাথমিকভাবে যা বৈদেশিক বাণিজ্যের ব্যাপারে প্রয়োগ করা হয়েছে। কিন্তু একই পদ্ধতি আবার রাজনৈতিক সমাজতন্ত্রবাদীদের বিরাট অসুবিধার সৃষ্টি করেছিল।
এই পদ্ধতির সবচেয়ে বিদঘুঁটে বৈশিষ্ট্য হলো এই পদ্ধতি ধনিক পুঁজিবাদী, শ্রেণীর কোন বিরুদ্ধাচরণ না করেই প্রবর্তন করা হয়েছিল। যুদ্ধকালীন রাজনীতির একটি উল্লেখ্য বৈশিষ্ট্য হলো কোন রকমেই জনসংখ্যার কোন শ্রেণীকে বিরুদ্ধাচরণ করতে দেয়া হয় না। দৃষ্টান্তস্বরূপ জাহাজ চলাচলের সঙ্কটময় পরিস্থিতিতে যুক্তি দেখানো হয়েছিল যে সাধারণ মানুষের হাতে অসন্তোষের ভয়ে অস্ত্রশস্ত্র দেয়ার বেলায় খাদ্যের চেয়েও অধিকতর কড়াকড়ি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। পুঁজিবাদীদের হাত থেকে কিছু হস্তান্তর করা খুব বেশি কষ্টকর এবং প্রকৃত প্রস্তাবে পরিবহণ ব্যবস্থা কোন গুরুতর সংঘর্ষ ব্যতিরেকে সার্থকভাবে শেষপর্যন্ত চালু রইল। বিশেষ বিশেষ শ্রেণীর মানুষ দুষ্ট তাদেরকে অবশ্যই শাস্তি দেয়া উচিত এর পেছনে তাদের এ উদ্দেশ্য ছিল না। তাদের উদ্দেশ্য ছিল শান্তিকালীন পদ্ধতি যুদ্ধের সময় সক্রিয় নয়, সুতরাং সবদিক দিয়ে কম পরিশ্রম করে একটি নতুন পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করা। যুদ্ধের সময়ে জাতির যখন দুর্দিন, সরকার যা করা প্রয়োজনীয় মনে করল তাতে জনসাধারণের সমর্থন আদায় শান্তির সময়ে যত কষ্টকর এখন অত কষ্টকর হবে না বিবেচনা করল। কিন্তু শান্তির সময়েও সমর্থন আদায় খুব কষ্টকর হতোনা। যদি শ্ৰেণীবৈরিতা না-দেখিয়ে শাসনতান্ত্রিক দৃষ্টিকোণ হতে উপযুক্তভাবে সবকিছু তুলে ধরা হতো।
যুদ্ধকালীন শাসনের অভিজ্ঞতা হতে দেখা গেছে যে সরকার কাঁচামাল, বৈদেশিক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করলে এবং ব্যাঙ্কসমূহে রাষ্ট্রীয়করণ করলে সমাজতান্ত্রিকীকরণের অনেকগুলো সুবিধা প্রত্যাশিত (Stabilization) স্থিরীকরণের ওপর লয়েড যে মূল্যবান বইখানা লিখেছেন তাতে এ মতবাদের সম্পূর্ণ বিকাশ ঘটেছে, তা সমস্যাকে বৈজ্ঞানিকভাবে বিশ্লেষণের একটি নির্দিষ্ট প্রচেষ্টা বলে আমরা ধরে নিতে পারি, যা পরীক্ষা করার ভার যুদ্ধ সরকারি কর্মচারীদের ওপর চাপিয়েছে।
বাস্তব দৃষ্টিকোণ থেকে স্যার আর্থার সাল্টার এর বইটির প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো তাতে তিনি আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পদ্ধতি সম্বন্ধে যে বিশ্লেষণ করেছেন তার বাস্ত ব প্রয়োগ খুবই ফলপ্রসূ প্রমাণিত হয়েছে যে কোন দেশের পক্ষে আলাদাভাবে কোন সমস্যা বিচার করবার রেওয়াজ তখন ছিল না এবং অন্যান্য শক্তির সঙ্গে দরকষাকষি করে কতো বেশি সুবিধা অর্জন করা যায় সে জন্যে দেশে দেশে কূটনৈতিক সম্বন্ধ স্থাপন করা হয়েছিল। গৃহীত পরিকল্পনার প্রত্যেকটি খুঁটিনাটি প্রশ্ন বিচার করার জন্যে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ কমিটি নিয়োগ করা হলো, যাতে করে জাতিতে জাতিতে সংঘাত না-বাধিয়ে পণ্যে পণ্যে সংঘাত বাধায়। হুইট কমিশন কয়লা কমিশনের সঙ্গে দরকষাকষি করত এবং অন্য সব ব্যাপারেও এরকম দরকষাকষি চলতো। প্রত্যেক কমিশনের সুপারিশ হলো মিত্র শক্তির দেশগুলোর বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধির আপোষ আলোচনার ফল। প্রকৃতপ্রস্তাবে সর্বোচ্চ যুদ্ধ পরিষদের অপরিহার্য ক্ষমতা ছাড়া সর্বত্র আন্তর্জাতিক শ্রমিকতন্ত্রবাদের মত রূপ পরিগ্রহণ করল। এর তাৎপর্য হলো কোন সার্থক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে প্রত্যেকটা কর্ম অবশ্যই আলাদা আলাদাভাবে সম্পন্ন করবে এবং শুধুমাত্র জাতিভিত্তিক সংগঠনের বিরোধ ফয়সালা করার জন্যে একমাত্র আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান থাকলেও চলবেনা।
যে কেউ সালটারের বই পড়ে জানতে পারবে যে মিত্রশক্তির মধ্যে যুদ্ধকালীন সময়ে যে আন্তর্জাতিক সরকারের প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল, শান্তির সময়েও যদি তা করা হতো সর্বত্র, তাহলে পৃথিবীর অধিবাসীদের বাস্তব মানসিক এবং নৈতিক প্রভূত উন্নতি সাধিত হবে। এ ব্যবস্থার প্রবর্তন করা হলে ব্যবসায়ীদের কোন ক্ষতি হবে না, বরঞ্চ তাদেরকে স্থায়ীভাবে প্রতিশ্রুতি দেয়া যাবে যে গত তিন বছরের মুনাফা পেনশনের মত করে নিশ্চিতভাবে তাদের দেয়া হবে। এর ফলে বেকার সমস্যা, যুদ্ধভীতি, অভাব-দুর্ভিক্ষ কমবে এবং বেশি উৎপাদন সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। মি. লয়েড-এর বইতে এর স্বপক্ষের যুক্তি এবং পদ্ধতি যথাযথভাবে সন্নিবেশিত হয়েছে। এ সকল স্পষ্ট সার্বিক সুযোগ সুবিধা থাকা সত্ত্বেও এ ধরণের প্রতিষ্ঠানের সম্ভাবনা আন্তর্জাতিক বিপ্লবী সমাজতন্ত্রবাদের চেয়েও অনেক কম। বিপ্লবী সমাজতন্ত্রবাদের বিপদ হলো তা প্রবল বিরোধীতার জন্ম দেয় এবং সরকারি চাকুরেদের সমাজতন্ত্রবাদের কোন সমর্থন পাওয়া যাবে না। কোন রাজনৈতিক প্রচেষ্টার প্রতি মানুষ তখন বিরোধিতা করে যখন সে মনে করে তা তাকে ধ্বংস করবে এবং তখনই সমর্থন করবে। (এগুলো সাধারণতঃ মনের অবচেতনে থাকে) যখন সে আশা করে এর ফলে তার শত্রুরা ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে। সুতরাং কোন নীতি যদি কাউকে আঘাত না করে তাহলে কারো সমর্থন পাবেনা। যে নীতি অধিকাংশ মানুষের সমর্থন পাবে তাকে প্রবল অসুবিধারও সম্মুখীন হতে হবে। শিল্পতন্ত্রবাদ বিশ্বভিত্তিক সহযোগিতার নতুন প্রয়োজনের জন্ম দিয়েছে এবং সে সঙ্গে একে অন্যকে শত্রুতা করে ধ্বংস করার উন্নত কৌশলেরও জন্ম দিয়েছে। পার্টি রাজনীতিতে একমাত্র প্রতিহিংসার আবেদনই প্রবৃত্তিগত সাড়া জাগাতে সক্ষম; কিন্তু যে মানুষ পারস্পরিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার কথা বলে তার হাতে কোন শক্তি নেই। যদি শিক্ষাব্যবস্থাকে পুরুষানুক্রমে নতুন খাতে চালনা না করা হয়, পত্রিকাতে ঘৃণা বিদ্বেষের বাণী ছড়ানো বন্ধ না করা হয়, তাহলে আমাদের বর্তমান রাজনৈতিক পদ্ধতিতে ক্ষতিকর নীতি প্রয়োগের কখনো অবসান ঘটবে না। তাহলেও শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তন করার কোন উল্লেখযোগ্য পন্থা আমাদের জানা নেই, আমাদের রাজনৈতিক পদ্ধতিতে পরিবর্তন না আনা পর্যন্ত সংবাদপত্রে কোন পরিবর্তন আনা সম্ভবপর নয়। এই শখের-করাতের মত অবস্থা থেকে সাধারণভাবে কাজ করে রক্ষা পাওয়ার কোন উপায় নেই। আমার মতে, আমরা যত বেশি লোক পারি; সময়ে অসময়ে যে পার্টির আকর্ষণীয় কর্মসূচী আমাদের সামনে তুলে ধরা হয় তাতে বিশ্বাস স্থাপন না করে রাজনৈতিক সংশয়বাদী হয়ে পড়লেই সবচেয়ে বেশি লাভের সম্ভাবনা। অনেক স্নিগ্ধমস্তিষ্ক বিবেকবান মানুষ, এইচ, জি, ওয়েলসও বিশ্বাস করেছিলেন যে গত যুদ্ধই যুদ্ধের শেষ। তাদের এ বিশ্বাস যে অলীক মরীচিকা তা এখন তারা হৃদয়ঙ্গম করতে পেরেছেন। আবার অনেক বিবেকবান শান্ত মানুষ বিশ্বাস করেন যে মার্কসীয় শ্রেণী সংগ্রমই হবে শেষ সংগ্রাম। যদি সে দিন কখনো আসে তাঁরাও যে অলীক মরীচিকায় বিশ্বাস স্থাপন করেছেন সে সময়ে যদি বেঁচে থাকেন তাহলে বুঝতে পারবেন। কোন সুবিবেচক ব্যক্তি যদি জোড়াল কোন রাজনৈতিক আন্দোলনে বিশ্বাস করেন,তাহলে তিনি সে সুসংগঠিত অমঙ্গলকে দীর্ঘস্থায়ী হতে সাহায্য করছেন যা আমাদের সভ্যতাকে ধ্বংস করেছে। অবশ্য এটাকে আমি চূড়ান্ত আইন বা নিয়ম বলে স্থাপন করতে চাইনে, কারণ আমাদের সন্দেহবাদ সম্বন্ধেও সন্দেহ পরায়ন হতে হবে। কিন্তু যদি একটি রাজনৈতিক পার্টির একটি নীতি থাকে। যেমন অনেকরই আছে তা যখন একটি ভালো করতে গিয়ে অনেক গুলো ক্ষতি করে, তখন রাজনৈতিকদের সন্দেহাত্নক কর্ম সম্বন্ধে সংশয়বাদী হওয়ার গুরুত্ব অপরিসীম। মনঃসমীক্ষার দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা খুবই সহজে সন্দেহ করতে পারি যে নীতিকে আকর্ষণীয় করে তোলার জন্যে প্রচুর ক্ষতি করা হয়, প্রকৃত মঙ্গল প্রকৃতিকে বিচারবুদ্ধিসম্মত করে রচনার মধ্যেই নিহিত।
