আন্তর্জাতিক সমাজতন্ত্রবাদের স্বপক্ষে দুটো গ্রন্থের সঙ্গে মিলিয়ে আমার বক্তব্যবিষয়টিকে স্পষ্ট করে তুলবো। একটা হলো কার্ল মার্কসের ক্যাপিটাল (পুঁজি) অন্যটা সালটারের (SALTER) ALLIED SHIPPING CONTROL (মিত্র শক্তির নৌযান নিয়ন্ত্রণ) স্যার আর্থার সালটার নিজেকে আন্তর্জাতিক সমাজতন্ত্রীবাদী বলে ঘোষণা করেননি; তাহলেও তার এ পরিচয় অসংগত নয়।) দুটো গ্রন্থকে আমরা যথাক্রমে রাজনীতিবিদ এবং সরকারি চাকুরেদের পদ্ধতির প্রতিনিধি হিসেবে ধরতে পারি-যারা অর্থনৈতিক পদ্ধতিতে পরিবর্তন কামনা করেন। মার্কসের লক্ষ্য একটা রাজনৈতিক দলের সৃষ্টি করা, যে দল কালে সবকিছুকে নিয়ন্ত্রণ করবে। সালটারের লক্ষ্য হলো প্রচারিত আইন কানুনের গণ্ডীর ভেতর থেকে শাসকদের প্রভাবিত করা এবং জনসাধারণের সুবিধার দিকে নজর রেখে জনমতের ওপর প্রভাব বিস্তার করা। মার্কস উপসংহারে প্রমাণ করেছেন যে পুজিবাদী পদ্ধতিতে মজুরেরা ভয়ঙ্কর ভাবে শোষিত এবং নির্যাতিত হয়েছে। কমিউনিজমে যে তারা কম ভুগবে একথা তিনি প্রমাণ করেননি নয় শুধু প্রমাণ করতে চেষ্টাও করেননি; তার বলার ভঙ্গি এবং অধ্যায় বিন্যাসের মধ্যে অন্তর্নিহিতভাবে এ বক্তব্যটুকু ব্যক্ত করা হয়েছে। সর্বহারাদের শ্রেণীসংগ্রামের প্রতি দরদ রেখে পড়ে বলে তার ধারণা পাঠককে প্রভাবিত করে পাঠকও নজর করে দেখেনা যে সে কথা প্রমাণ করা হয়নি। আবার মার্কস পরিষ্কারভাবে সামাজিক বিকাশের ধারা থেকে নৈতিকতার প্রশ্নকে একেবারে বর্জন করেছেন, রিকার্ডো এবং ম্যালথাসের এত তিনিও বলেছেন অর্থনীতির অপ্রতিরোধ্য নিয়মের ধারা অনুসারে সমাজের বিকাশ হয়েছে। কিন্তু রিকার্ডো এবং ম্যালথাস মনে করেছেন যে অপ্রতিরোধ্য অর্থনৈতিক আইন অপ্রতিরোধ্যভাবে ধনিক শ্রেণীর সুখ সম্পদের বৃদ্ধি এবং মজুরদের জন্য অফুরন্ত দুঃখের আমদানি করেছে। পক্ষান্তরে টালিয়ানের (Tertullian) মতো মার্কসের একটি গোপন বক্তব্যময় ভবিষ্যতের কল্পনা ছিল, যে ভবিষ্যতে তার শ্রেণীর লোকেরা সার্কাস দেখবে আর বুর্জোয়ারা চিৎকার করতে করতে মারা যাবে। যদিও মার্কস মানুষকে ভালো অথবা মন্দ হিসেবে না দেখে, শুধুমাত্র অর্থনৈতিক প্রতীক হিসেবে দেখতে ভবিষ্যদ্বাণী করে গেছেন তা সত্ত্বেও তিনি বুর্জোয়া সমাজকে নষ্টের মূল এবং তার শানানো আক্রোশ মজুরদের মধ্যে অনুপ্রবিষ্ট করবার জন্যে তিনি কাজ করতে বলেছেন। মার্কসের পুঁজি বা ক্যাপিটাল, ব্রাইস রিপোর্টের মত অনেকগুলো হিংসাত্মক গল্পের সংকলন যেগুলো এমন ভঙ্গিতে রচনা করা হয়েছে যা পড়লে পড়ে শত্রুর বিরুদ্ধে সামরিক চ্যালেঞ্জ করার স্পৃহা জাগরিত হয় এবং অত্যন্ত স্বাভাবিক যে শক্রর সামরিক মনোবৃত্তিতে তা ঘা দেয়। এভাবে তা শ্রেণীতে শ্রেণীতে সংগ্রাম ডেকে আনে, যা আগে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে। গভীরতর ঘৃণা এবং জিঘাংসা তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছিল বলে কার্ল মার্কস এমন একটা প্রচণ্ড শক্তিধর রাজনৈতিক শক্তির কথা প্রমাণ করতে পেরেছিলেন। বাস্তব উদাহরণ দিয়ে তিনি পুঁজিপতিদেরকে নৈতিকতাবিহীন ঘৃণ্য জীব বলে প্রমাণ করেছিলেন।
সালটার সাহেবের ‘মিত্র শক্তির নৌযান নিয়ন্ত্রন’ গ্রন্থে আমরা সোজাসুজি এর বিপরীত ভাবাদর্শের সন্ধান পাই। সালটার আন্তর্জাতিক সমাজতন্ত্রবাদের একটা পদ্ধতিকে শাসন করার যে সুযোগ পেয়েছিলেন, মার্কসের তা ছিল না। এই পদ্ধতির উদ্ভব হয়েছিল জার্মানদের হত্যা করার জন্য পুঁজিবাদীদের হত্যা করার জন্য নয়। যেহেতু তারা অর্থনৈতিক সমস্যার প্রতি উদাসীন ছিল সে জন্য সালটারের বই তাদের ওপর ভিত্তি করে লেখা হয়েছে। তখন অর্থনৈতিক সমস্যাটি ছিল এ রকম যে সৈন্যেরা, যুদ্ধাস্ত্র নির্মাতারা, যুদ্ধাস্ত্র নির্মাণের কাঁচামাল সরবরাহকারীরা সকলেই অলসভাবে সময় কাটাচ্ছে এবং বাকি সকলকে সব কাজ করতে হচ্ছে অথবা যেনো হঠাৎ ঘোষণা করা হলো যে আগে যে পরিমাণ কাজ করা হতো, এখন থেকে তার অর্ধেক কাজ করা হবে। যুদ্ধের অভিজ্ঞতা আমাদের এ সমস্যার একটি কারিগরী সমাধান দিয়েছে কিন্তু কোন মনস্তাত্ত্বিক সমাধান এ পর্যন্ত দেয় নি। তার কারণ হলো জার্মানদের প্রতি ঘৃণা এবং জার্মানদের ভয়ের দরুন যুদ্ধের সময়কালীণ বছরগুলোতে যে সহানুভূতি এবং পরস্পর নির্ভরশীলতা দেখা গেছে, শান্তির সময় কী রকম ক্রিয়া করবে তা এখনো পরীক্ষিত হয়নি।
সালটার বলেন (পৃঃ ১৯)
“সম্ভবত পেশাদার অর্থনীতিবিদদের দৃষ্টি আকর্ষন করার মতো এ মুহূর্তে অন্য কোনো কাজ নেই, রাষ্ট্রায়ত্ব করার নীতি পক্ষ অথবা বিপক্ষের প্রতি কোন রকম মোহ না রেখে বর্তমান যুদ্ধের সময়ে প্রকৃত অবস্থা কী তা বৈজ্ঞানিক দৃষ্টি ভঙ্গীসহকারে বিচার করাই তাদের কর্তব্য হয়ে পড়েছে। প্রথমতঃ দৃশ্যমান যে বাস্তব কাজ তাদের করতে হবে, তা এতই মারাত্মক যে অন্ততপক্ষে তার ফলে স্বাভাবিক অর্থনৈতিক জীবনযাত্রার সঙ্গে একটা সংঘাত অনিবার্য। একটি মোহমুক্ত পেশাদার অনুসন্ধান এসব উপাদান এবং অন্যান্য কারণের প্রতি যথেষ্ট প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। যুদ্ধের সময়ে এ সব পদ্ধতির সাফল্য আসলেই যৌক্তিক মতভেদের বাইরে। ব্যক্তি উৎপাদনের ক্ষেত্রে খসড়া হিসাবে দেখা গেছে যে যুদ্ধের আগে যে সকল লোক বেকার ছিল তারা এবং দেশের তিন ভাগের দু ভাগ উৎপাদন শক্তিকে সৈন্য বিভাগে অথবা অন্যান্য যুদ্ধের কাজে নিয়োগ করা হয়েছে। তার পরেও গ্রেটবৃটেন তার সম্পূর্ণ সামরিক শক্তিকে পুষে বেসামরিক জনসাধারণের জন্য যে জীবনযাত্রার মান বজায় রেখেছিল অসহনীয়ভাবে তা নিম্নতর ছিল না এবং কিছুদিনের জন্য কিছু শ্রেণী শান্তির সময়ে যেমন জীবনযাপন করত তেমনি আরামের সঙ্গে জীবনযাপন করেছে। এর জন্য বৃটেন বাইরের কোন দেশ থেকে কোন সাহায্য আনয়ন করেনি, নিজের সংগ্রহ থেকেই চালিয়েছে। ধার করা টাকায় আমেরিকা থেকে যত আমদানি করেছে ঋণ দেয়া টাকায় সে তার চেয়ে বেশি মিত্র দেশ সমূহকে দিয়েছে। তার যুদ্ধসম্ভার এবং জনসাধারণের প্রয়োজন চলতি উৎপাদনের সামান্য অংশমাত্র নিয়োজিত ছিল।” শান্তিকালীন বাণিজ্যনীতি প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেছেন, শান্তির সময়ে অর্থনৈতিক পদ্ধতি কোন উপযুক্ত নিয়ন্ত্রণের অধীন ছিল না। যুদ্ধের সময়ের এ পদ্ধতি ঐ অবস্থাতেই যতই অপ্রচুর এবং দোষাবহ হোকনা কেন, যে ভাবে যুদ্ধের বিচিত্র প্রয়োজন মেটাতে পেরেছে তা স্মর্তব্য। কিন্তু নতুন মান অনুসারে তা অন্ধ এবং অপচয়শীল বলে প্রমাণিত হয়েছে। উৎপাদন করেছে খুবই স্বল্প খারাপ জিনিস এবং খারাপ মানুষের মধ্যে তা বিলি বন্টন করা হয়েছে।” (পৃঃ ১৭)
