বিশেষজ্ঞের চার নম্বরের দোষ হলো তিনি যাদের শাসন করবেন তাদের মতামতকে বিশেষ দাম দেন না এবং জনসাধারণের অপ্রিয় এমন একটি আইনকে চালু করতে হলে তাকে যে বিপদের সন্মুখীন হতে হবে সে সম্বন্ধে তিনি মোটেই ওয়াকেবহাল নন। ডাক্তারদের হাতে যদি ক্ষমতা দেয়া হয় এবং তাদের কথা প্রতিপালিত হলে সংক্রামক রোগের মার্কা মেরে দেয়ার পদ্ধতি তারা আবিষ্কার করতে পারেন। কিন্তু তাদের প্রবর্তিত আইন যদি জনমতের ওপরের স্তরে চলে যায় তাহলে কৌশলে তা ফাঁকি দেয়া হবে। যুদ্ধের সময়ে শাসনের সুবিধা ছিল কারণ জনতা বেশি পরিমাণে যুদ্ধ জয়ের ব্যাপারে আত্মনিয়োগ করেছিল। পক্ষান্তরে তেমন জোরাল আবেদনের মত কোন লক্ষ্য শান্তির আদালত প্রতিষ্ঠা করতে পারেনা।
কোনো বিশেষজ্ঞ কদাচিত অলসতা এবং উদাসীনতাকে বরদাশত করে। যে সকল বিপদ স্পষ্টতর সম্ভাব্য বলে আমাদের চোখে প্রতীয়মান তা এড়িয়ে যাবার জন্যে কিছু কষ্ট স্বীকার করি, কিন্তু বিশেষজ্ঞের চোখে যে সকল বিপদ সম্ভাব্য সেগুলো পরিহার করার জন্যে মোটেই কষ্ট স্বীকার করি না বললেই চলে। আমরা মনে করি টাকাকে আমরা পছন্দ করি এবং হিসেবের বেলায় দিনের আলোর মত পরিস্কার দেখতে পাই বছরে বছরে লাখ টাকা সঞ্চিত হচ্ছে। তা সত্ত্বেও যদি না সমরাস্ত্র হিসেবে টাকাকে না ভাবতাম আমরা এ নীতিকে গ্রহণ করতে পারতাম না। আমরা আমাদের স্বভাবকে আমাদের আয় এবং অনেক সময় আমাদের জীবনের চেয়ে অত্যাধিক ভালোবাসি। যখন কোন ব্যক্তি আমাদের চরিত্রের কোন কোন দোষত্রুটি দেখিয়ে দেয় তখন আমরা তাকে বিষনজরে দেখে থাকি।
সম্ভবতঃ বিশেষজ্ঞেরা বুঝেন না যে যাদের হাতে শাসন কর্তৃত্ব থাকে অত্যাচার করার দিকে তাদের স্পৃহা দ্রুত বর্ধিত হবে, তারা বর্তমানে যেমন অমায়িক আছেন তেমন উচ্চ মানসিকতা সম্পন্ন থাকতে পারবেন না। খুব অল্পসংখ্যক লোকই তাদের চার দিকের যে প্রভাব তাদের চরিত্রের ওপর পড়ে তা অস্বীকার করতে পারেন।
এ সব কারণে, আমরা শুধু সরকারি চাকুরেদের হাতে ক্ষমতা তুলে দিয়ে বর্তমান রাজনীতিবিদদের কৃত দোষ থেকে বাঁচতে পারিনা। সে যাহোক আমাদের ক্রমবর্ধমান জটিল সমাজে বিশেষজ্ঞদের যে প্রভাব রয়েছে, তার চাইতে বেশি প্রভাব থাকা উচিত। বর্তমানে প্রবৃত্তিগত আবেগ এবং শিল্প ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার মধ্যে এক ঘোরতর সংঘাতের সৃষ্টি হয়েছে। আমাদের মানসিক এবং বস্তুগত পরিবেশ হঠাৎ শিল্পায়নের ফলে রাতারাতি পরিবর্তিত হয়ে গেছে। কিন্তু তার সঙ্গে তাল রেখে আমাদের প্রবৃত্তির পরিবর্তন হয়নি। পরিবর্তিত অবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়ার জন্যে আমাদের স্বভাবের কিছুই করা হয়নি। কিছুসংখ্যক অজ্ঞলোক এখনো আর্দ্র আবহাওয়ার দিনে লাইব্রেরিতে বীবরের লোম রাখে এবং বীবরের লোমে তাদের লাইব্রেরি ঘর ভরে উঠে। এর কারণ একসময় তারা নদীর তীরে বসবাস করত। আমরাও আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এখনো আমাদেরকে হোমারের যুগের জীব বিজ্ঞানের সঙ্গে খাপ খায় মত যে সকল গুণপনা সেগুলোকে প্রশংসা করতে শিক্ষা দিয়ে থাকে; যদিও সেগুলো হাস্যকর এবং চরম ক্ষতিজনক। প্রত্যেকটা সার্থক রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রবৃত্তিগত যে আহ্বান তার মধ্যে হিংসা, ঘৃণা, বিরুদ্ধতার রসায়ন বর্তমান; কখনো পারস্পরিক সহানুভূতির প্রয়োজন নেই। আমাদের প্রাকশিল্পযুগের যে স্বভাব আমরা উত্তরাধিকারসূত্রে লাভ করেছি তার সঙ্গে আমাদের বর্তমান রাজনৈতিক পদ্ধতির মধ্যেও পুরানো সবগুলো স্বভাব আমরা উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি। এ ব্যাপারে স্বতঃপ্রণোদিত চেষ্টার দ্বারাই আমাদের স্বভাবের মধ্যে পরিবর্তন আসতে পারে।
নিজের দুর্ভাগ্যের জন্য কাউকে ঘৃণা করা আমাদের স্বভাবগত প্রবণতা। যখন দাম বাড়ে তখন আমরা মুনাফালোভীদের দোষ দেই, যখন কমে তখন আমরা পুঁজিপতিদের দোষ দেই। কিন্তু পুঁজিপতিরা যখন দাম বাড়ে তখন কিছু করতে পারেনা কেন এবং দাম কমলে মুনাফলোভীরা কিছু করেন না কেনো, সে খবর পথের মানুষ রাখেনা। সে এটাও নজর করেনা যে মজুরি এবং দাম একসঙ্গে বাড়ে এবং একসঙ্গে পড়ে। যদি সে একজন পুঁজিপতি হয় তাহলে সে চায় মজুরি কমুক এবং দাম বাড়ক। আর যদি সে একজন মজুর হয় তাহলে বিপরীতটাই হবে তার কাঙ্খিত। যখন একজন মুদ্রা বিশেষজ্ঞ বোঝাতে চেষ্টা করেন যে মুনাফাখোর, ট্রেড ইউনিয়ন এবং সাধারণ শ্রমিকদের নাম বড় করার ব্যাপারে খুব বেশি হাত নেই? তখন তিনি জার্মান বর্বরতার প্রতি সন্দেহপরায়ন ব্যক্তির মত সকলেরই নিন্দাভাজন হয়ে পড়েন। আমাদের একজন শত্রুকে কেউ লুণ্ঠন করুক তা আমরা চাইনে। কিন্তু আমরা যখন কষ্ট পাই তখন আমরা কাউকে ঘৃণা করতে চাই। আমরা বোকা বলে কষ্ট পাই, এটা ভাবা খুবই কষ্টকর, কিন্তু সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে তাই-ই আমরা সত্য বলে মেনে নিয়ে থাকি। সেজন্য ঘৃণা ব্যতিত কোন রাজনৈতিক পার্টির চালিকা শক্তি অর্জন করতে পারেনা; তা কাউকে ঘৃণা করবার জন্য অবশ্যই বের করে আনবে। যদি অমুক অমুক আমাদের দুঃখের কারণ হয়ে থাকে তাহলে চলুন অমুক অমুককে শাস্তি দিয়ে আমরা সুখী হই। ভার্সাই চুক্তি হলো এরকমের রাজনৈতিক ধারণার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। তা সত্ত্বেও কেউ কেউ জার্মানদেরকে তাদের পূর্বের স্থানে প্রতিষ্ঠিত করা যায় কিনা সে জন্যে পন্থা অনুসন্ধান করেছে।
