পার্টিগত রাজনীতিবিদেরা যে সব বিষয়ের ওপর জোর দিয়ে থাকে তা পূরণ করতে হলে আমাদের সামনে দু’টি ভোলা পথ রয়েছে। (১) তাদের অবশ্যই জাতির একটা সম্প্রদায়ের প্রতি দৃষ্টিশীল হতে হবে (২) তার জন্য তারা যে যুক্তি গ্রহণ করবে তা অবশ্যই সরল হতে হবে। অবশ্য যুদ্ধের সময়ে এ নীতি অচল, কেননা বহিঃশত্রুর সঙ্গে সংগ্রাম করবার জন্যে পার্টিগত কোন্দলকে তখন বন্ধ রাখতে হয়। যে রাজনীতিবিদেরা শান্তির সময়ে সাধারণ ভোটারদের স্বীকৃতির ব্যাপারে সন্দিহান থাকে সে সকল রাজনীতিবিদেরাও যুদ্ধের সময়ে নিরপেক্ষতার মুখোস পরে আহ্বান করে, আমরা যেমন আশা করেছিলাম গত যুদ্ধে তার প্রমাণ পাওয়া গিয়াছে যে গণতন্ত্র নিরপেক্ষ জনতার কাছে আবেদন করার প্রশংসনীয় ট্রেনিং দান করেছে। এই একমাত্র কারণেই গণতন্ত্র গতযুদ্ধে জয়লাভ করতে পেরেছে। কিন্তু এটা সত্য যে এতে শান্তি বিঘ্নিত হয়েছে। কিন্তু তা আরেকটি ভিন্নতর প্রশ্ন।
কিভাবে সহজে আবেগকে জাগানো যায়, জাগালে তা তার এবং বন্ধুবান্ধবদের না ক্ষতি করতে পারে মতো কিভাবে দমন করা যায় তা জানা হলো রাজনীতিবিদদের সে বিশেষ কৌশল। মুদ্রায় যেমন গ্রেসাম আইন আছে তেমনি রাজনীতি একটি আইন মেনে চলে। যে লোকের একটি উন্নত আদর্শ আছে যা
অন্যান্য সবকিছু থেকে আলাদা, তার জন্যে ঐ দুর্লভ মুহূর্তগুলো (বিশেষতঃ বিপ্লবকালে) যখন আদর্শবাদের সঙ্গে মানুষের স্বার্থপর আবেগের সমন্বয় ঘটে তখন ছাড়া তাকে বারবার নাজেহাল হতে হবে। তাছাড়াও রাজনীতিবিদেরা বিভিন্ন বিরোধী দলে বিভক্ত, তারা রাষ্ট্রকেও বিভিন্নভাবে বিভাগ করতে চায়, তবে মাঝে মাঝে অন্যদেশের সঙ্গে যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে তারা আবার দেশকে একত্রিত করার সুযোগ লাভ করে। এ সকল লোক সব সময় হুংকার পরিপূর্ণ তাৎপর্যহীন জীবন যাপন করে। তারা জটিল কিছু ব্যাখ্যা করার দিকে মনোযোগ দিতে পারেনা। তারা যার মধ্যে ভাগাভাগি নেই, তেমন কিছু ব্যাখ্যা করতে পারে না (তারা হয়ত দেশ বিভক্ত করে অথবা জাতিতে বিভেদ ডেকে আনে। অবশ্য তারা এমন কিছু ব্যাখ্যা করে না যা শ্রেণী হিসেবে রাজনীতিবিদদের ক্ষমতাকে সীমিত করে ফেলে।
কিন্তু বিশেষজ্ঞরা কৌতূহলোদ্দিপকভাবে ভিন্ন ধরণের। আইন কানুন মত বিশেষজ্ঞরা এমন এক ধরণের মানুষ যাদের রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রতি কোন লোভ নেই। কোন একটা রাজনৈতিক সমস্যা তার ভেতরে যে প্রতিক্রিয়ার সঞ্চার করে তা হলো জনপ্রিয়তার চেয়ে কোনটা অধিকতর উপকারী। কোন কোন ব্যাপারে তার ব্যাপক খুঁটিনাটি জ্ঞান রয়েছে। তিনি যদি সরকারি চাকুরে অথবা কোন ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের বড় কর্তা হয়ে থাকেন, তাহলে ব্যক্তি বিশেষ সম্বন্ধে সুপ্রচুর অভিজ্ঞতার অধিকারী এবং তিনি কিভাবে কাজ করেন সে সম্বন্ধেও তিনি ধুরন্ধর বিচারক। এসব হলো তার নিজস্ব বিষয়ে নির্ভরযোগ্য মতামত গঠনের অনুকূল প্রেক্ষিত।
সে যাহোক, নিয়মানুসারে তার কতেক পরস্পর সম্বন্ধশীল দোষ রয়েছে। তার যে জ্ঞান তা হলো বিশেষজ্ঞের জ্ঞান, সে জন্যে নিজের বিভাগের প্রয়োজনীয়তাকে তিনি বাড়িয়ে দেখেন। যদি আপনি ক্রমাগতভাবে কোন দন্ত চিকিৎসক, অথবা বৈজ্ঞানিক, চক্ষু বিশেষজ্ঞ অথবা হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ অথবা ফুসফুস বিশেষজ্ঞের কাছে যান, তাদের প্রত্যেকেই আপনাকে তাদের আপন আপন বিষয়ে আরোগ্যের সুন্দর সুন্দর উপদেশ দেবেন। যদি আপনি তাদের সকলের উপদেশ মেনে নিয়ে থাকেন তাহলে চব্বিশ ঘন্টা সময় আপনার স্বাস্থ্য রক্ষার কাজে ব্যয়িত হয়ে যাবে এবং স্বাস্থ্যকে ব্যবহার করবার কোন ফুরসৎ আপনি পাবেন না। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের নিয়েও একই রকমের ব্যাপার হতে পারে। যদি তাদের সকলের কথা মেনে নেয়া হয় তাহলে জাতির সাধারণভাবে বেঁচে থাকবার কোন সুযোগ থাকবে না।
সরকারি চাকুরের আরেকটা বিরাট দোষ হলো পর্দার অন্তরাল অবস্থান করে তিনি প্রভাবিত করার পদ্ধতিকে চালু করেন। তিনি হয়ত অধিক পরিমাণে মানুষকে প্রভাবিত করাকে অধিকতর গুরুত্ব দিয়ে থাকেন অথবা চোরা গলির পথ অনুরণ করাকে অধিকতর পছন্দ করেন, যার ফলে রাজনীতিবিদেরা কি করছে না জেনে তাদের সিদ্ধান্ত অনুসারে মত দিতে বাধ্য হন। নিয়মানুসারে তিনি অল্পবয়সে প্রথম ভুল করেন এবং মধ্য বয়সে দ্বিতীয় ভুলটি করেন।
বিশেষজ্ঞদের তৃতীয় দোষ হলো যার হাতে শাসন ক্ষমতা তাকে তিনি জনপ্রিয় আবেগের বিচারক হতে পারেন না। তিনি সাধারণতঃ একটা কমিটি সম্পর্কে ভালো জ্ঞান রাখেন, কিন্তু উন্মত্ত জনতাকে তিনি বুঝতে পারেন না। কতেক সুবিবেচনা সম্পন্ন মানুষ এক সঙ্গে বসে যা ভালো বলে গ্রহন করলেন, তা সাধারন্যে প্রচারিত হলে কতকগুলো প্রভাবশালী লোকের জনতার ভাবাবেগের আগুনে নিহত হওয়ার এমন কি সম্ভাবনা রয়েছে সেকথা তিনি বুঝতে পারেন না। আমেরিকার কর্তাব্যক্তিরা যে সব লোককে না পছন্দ করে তাদের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা নিয়োগ করেন এবং যদি সে অত্যন্ত ধূর্ত হয় তা হলে কৌশলে তার সঙ্গে মিটমাট করে ফেলে। তখন থেকে হয়ত সে রাজনৈতিক মত পরিবর্তন করে নয়ত নীতিহীন লোক বলে পত্রিকায় তার নিন্দা করা হয়। ইংল্যান্ডে এ পদ্ধতি এখনো তেমন উল্লেখযোগ্যভাবে বিকাশ লাভ করেনি, কিন্তু তার আর বেশি দেরি নাই। যেখানে মন্দ বলতে কোন কিছুই নেই, সেখানে চেতনাহীন মানুষ জনপ্রিয় আবেগকে অনেক সময় আশ্চর্য বস্তু বলে গ্রহন করে। প্রত্যেকেই কামনা করে যে সরকার ব্যয়ভার লাঘব করুক কিন্তু বিশেষ অর্থনীতি সব সময়েই অপ্রিয় হয়ে থাকে। যেহেতু এর ফলে মানুষ বেকার হয়ে পড়ে এবং বেকারেরা মানুষের সহানুভূতি অর্জন করে।একাদশ শতাব্দতে চীনদেশে ওয়ং এন শি নামে একজন সরকারি চাকুরে ছিলেন যিনি সম্রাটকে রাজি করিয়ে সমাজতন্ত্রবাদ প্রয়োগ করার কাজে আত্ননিয়োগ করলেন। এক কর্মব্যস্ত মুহূর্তে তিনি দেশের পণ্ডিত সমাজকে অপমান করলেন এবং ক্ষমতা থেকে বিচ্যুত হলেন। তখন থেকে আজ পর্যন্ত বিস্মৃতির অন্তরাল থেকে কোন চীনা ঐতিহাসিক তাঁর নাম বের করে আনেননি।
