শিল্পোৎপাদনের সাথে সাথে অপ্রতিরোধ্যভাবে রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের বৃদ্ধি সাধন ঘটেছে এবং শিল্পোৎপাদন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ রূপে ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত আরো বৃদ্ধি পেতে থাকবে। পৃথিবী আরো জনবহুল হয়ে উঠেছে; সে কারণে প্রতিবেশীদের উপর আমাদের নির্ভরশীলতা ঘনিষ্ট রূপ পরিগ্রহ করেছে। সমাজের সঙ্গে সম্পর্কিত যে সকল অস্পষ্ট এবং অপ্রত্যক্ষ সমস্যা বর্তমান তাও যদি পরস্পর পরস্পরকে খুব ভালোভাবে জ্ঞাত না করাই তাহলে জীবন অসহ্য বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। আমাদের অবশ্যই অন্যের ব্যক্তিগত ব্যাপারে শ্রদ্ধা পোষণ করতে জানতে হবে এবং একজনের নৈতিক বোধ অন্যের উপরে চাপানো মোটেই সমীচীন হবেনা। পিউরিটানেরা কল্পনা করে যে, তাদের নৈতিক মানদণ্ডই আসল মানদণ্ড। তারা অনুভব করে যে অন্যযুগে, দেশে এমনকি তাদের নিজের দেশের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নিজস্ব নৈতিক মানদণ্ড রয়েছে যা তারা পিউরিটানদের মতো খাঁটি এবং আসল মনে করে। দুর্ভাগ্যবশতঃ পিউরিটানদের আত্নবিরুদ্ধনীতির মধ্যে যে স্বাভাবিক ক্ষমতা প্রীতি রয়েছে তা তাদের অন্যান্যদের পক্ষে তাদেরকে বাধা দান করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। চলুন আমরা উদার শিক্ষাব্যবস্থা এবং মানুষের বিস্তৃত জ্ঞান কামনা করি যা আমাদের অতি ধার্মিক শিক্ষকদের কঠোর পরিশ্রমকে দুর্বল করতে পারে।
১১. রাজনৈতিক সংশয়বাদের প্রয়োজনীয়তা
ইংরেজি ভাষাভাষী জগতের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো তাদের রাজনৈতিক দলের প্রতি সুপ্রচুর আগ্রহ এবং বিশ্বাস বর্তমান। শতকরা বেশীরভাগ ইংরেজি ভাষাভাষী লোক বিশ্বাস করে, যে রাজনৈতিক দলের আদর্শে তারা বিশ্বাসী সে দলের হাতে ক্ষমতা এলে যে সমস্ত অসুবিধায় তারা ভুগছে, নিরসন ঘটবে। ঘড়ির পেন্ডুলামের মত দোদুল্যমানতা থেকে এ অবস্থার সৃষ্টি। একজন লোক বিশেষ পার্টিকে ভোট দেয়ার পরও যখন তার দুঃখের অবসান হয় না, তখন এ সিদ্ধান্তে এসে পৌঁছোয় যে বিপক্ষ দল হাজার হাজার বছর ধরে যে অন্যায়ের সৃষ্টি করছে তার নাগ পাস থেকে মুক্তি অসম্ভব। এরি মধ্যে সে সবগুলো রাজনৈতিক পার্টির প্রতি অনাগ্রহী হয়ে পড়েছে এবং এখন সে একজন বৃদ্ধ লোক। তার সন্তানেরা তার যৌবনের বিশ্বাসের ধ্বজা উঁচিয়ে ধরে, এভাবে আবর্তন বিবর্তনের মধ্যদিয়ে সময় বয়ে যেতে থাকে।
এস্থলে আমার বক্তব্য হলো, যদি আমরা রাজনীতির মারফত ভালো কিছু করতে চাই আমাদের অবশ্যই রাজনৈতিক প্রশ্নসমূহ আলাদা পদ্ধতিতে বিচার করতে হবে। গণতান্ত্রিক উপায়ে কোন পার্টিকে ক্ষমতায় আরোহণ করতে হলে তাকে জাতির অধিকাংশ নাগরিকের সমর্থন অবশ্যই আদায় করতে হবে। এজন্য প্রচলিত গণতন্ত্রের স্বার্থহানি না করে জনসাধারণের কাছে ব্যাপক অর্থে সফল যুক্তির অবতারণা করতে হবে যা তাদের মধ্যে বিশেষ আবেদন সৃষ্টি করতে সক্ষম হবে। সুতরাং কোন প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের এমন কোন ভালো কর্মসূচী আছে বলে আমার মনে হয় না যা পার্টি সরকার ছাড়া আর কাউকে দিয়ে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। অন্যান্য যে সকল লোকহিতের যন্ত্র রয়েছে তার সঙ্গে গণতন্ত্রের কিভাবে সমন্বয় ঘটান যেতে পারে তা আমাদের যুগের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য, সবচেয়ে প্রয়োজনীয় একটি প্রশ্ন।
বর্তমানে রাজনৈতিক প্রশ্নে দু’জাতীয় আলাদা ধরণের রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ রয়েছে। তার একটি হলো প্রত্যেক রাজনৈতিক দলে সক্রিয় রাজনৈতিক রয়েছে। এবং অন্যটিতে বিশেষজ্ঞ যাদের অধিকাংশই সরকারি চাকুরে অর্থনীতিবিদ, বৈজ্ঞানিক, ডাক্তার ইত্যাদি। এ দু’শ্রেণীর প্রত্যেকের আবার নিজস্ব কলা-কৌশল রয়েছে। রাজনীতিবিদদের কৌশল হলো কীভাবে সুবিধাজনকভাবে জনসাধারণকে নিজেদের দিকে আকর্ষণ করা যায় তা অনুমান করা। বিশেষজ্ঞদের পদ্ধতি হলো জনতার বুদ্ধিবৃত্তিতে সাড়া জাগাতে পারার মত সত্যিকারের সুবিধাজনক কি হবে তা নির্ধারণ করা। (এ শর্তগুলো বিশেষজ্ঞদের অপরিহার্যভাবে চিন্তা করতে হয়, তা না হলে যতই কল্যাণকর হোক না কেননা এর বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিবাদের ঝড় উঠতে পারে।) গণতন্ত্রে রাজনীতিবিদদের শক্তি হলো গড়পড়তা জনসাধারণ যে নীতিতে বিশ্বাস করে সে নীতি নির্ধারণ করা। অলোকসম্পন্ন ব্যক্তিরা যা ভালো মনে করে তার স্বপক্ষে সমর্থন করার মত রাজনীতিবিদেরা যে উচ্চ মনোবৃত্তি সম্পন্ন হতে পারে তা প্রত্যাশা করা বৃথা কেননা তা করলে তাদেরকে অন্যদের জন্য ক্ষমতার আসন ছেড়ে দিতে হবে। সুতরাং তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বক্তব্য প্রকাশ করার ব্যাপারে যে কৌশল অবলম্বন করে (নিজস্ব পার্টির দৃষ্টিকোণ থেকে) অনেক সমর্থ রাজনীতিবিদদের বেলায় অধিকাংশ মানুষ যা ভালো বলে গ্রহণ করেছে তারই সৎ প্রকাশ; যদিও বিশেষজ্ঞদের মতে তা ঘোরতর ক্ষতি ডেকে আনবে। নোংড়াভাবে ঘুষ নেয়া ছাড়া যে কোন রকমের নৈতিক অধঃপতন এবং বিচ্যুতির প্রতি রাজনীতিবিদদের অনাসক্ত হলে চলবে না।
যেখানে পার্টিগত রাজনীতি বর্তমান সেখানে একজন রাজনীতিবিদের আবেদন মাত্র একটি শ্রেণীর কাছে। পক্ষান্তরে তার বিপক্ষ রাজনীতিবিদের আবেদন অন্য আরেকটি শ্রেণীর কাছে। নিজস্ব দলকে সংখ্যাগরিষ্ঠ রূপে পরিণত করতে পারলেই তার সাফল্য প্রমাণিত হয়। যে প্রচেষ্টা পূর্ব নির্ধারিত ভাবে সাধারণ ক্ষেত্রে সকল শ্রেণীর কাছে আবেদন সৃষ্টি করে রাজনীতিবিদদের কাছে তার কোন দাম নেই। অধিকন্তু রাজনীতিবিদেরা যে সকল প্রশ্নের ওপর দৃষ্টি সন্নিবেশ করে তা একটা শ্রেণীর বিপক্ষে এবং এ শ্রেণীর বৈরিতা থেকেই তার বিপক্ষ রাজনৈতিক দলের সমর্থকদের মধ্যে বিরুদ্ধ রাজনীতির প্রাণ সঞ্চার হয়। এ ছাড়াও কোন প্রচেষ্টা তা যতই প্রশংসনীয় হোক না কেননা যদি মঞ্চের বক্তৃতার মাধ্যমে জনসাধারণকে তা বুঝিয়ে তুষ্ট করতে পারা যায়, রাজনীতিবিদদের কাছে তার কানাকড়িও দাম নেই।
