আইন যত কঠিন মনে হয় প্রয়োগ করলে পরে ঐ কঠিনতা বা কড়াকড়ি থাকে না। লীগ অব ন্যাশনস এর উদ্যোগে ১৯২৩ সনের ১৭ ই সেপ্টেম্বরের দি টাইমস এর মতে আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্র, অশ্লীল প্রকাশনা বন্ধ করবার মানসে লীগ অব ন্যাশন এর অন্তর্ভুক্ত রাষ্ট্রগুলোসহ এক আন্তর্জাতিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৃটিশ প্রতিনিধি স্পষ্টতঃ ঐ ভালো কাজটির প্রতি ঈর্ষা পোষণ করেছেন।
অন্য একটি ব্যাপার, তাহলো সাদামানুষ এবং দাসদের জন্য আলাদা যানবাহন ব্যবস্থা, প্রণীত আইনের সুদূরপ্রসারী ভিত্তি হিসেবে ধরে নেয়া হয়েছে, তার ক্ষতির গুরুত্ব অপরিসীম এবং ফৌজদারি আইনের উপযুক্ত বিষয়। অরো ক্ষতির কারণ হয় তখন যখন অজ্ঞ তরুণীদের মিথ্যা আশ্বাসে ভুলিয়ে অর্থ দাসত্বের বাঁধনে জড়িয়ে ফেলা হয় যাতে তাদের স্বাস্থ্য সম্পূর্ণরূপে নিঃশেষিত হয়ে যায় এবং তারা চরমতম দুর্দিনের সম্মুখীন হয়। শ্রমিকদের জন্য এটা হলো একটা অপরিহার্য প্রশ্ন, ফ্যাক্টরি আইন এবং ট্রাক আইনের মতো তাদেরকে এরও সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। যেখানে দাস এবং সাদা মানুষদের জন্য আলাদা যানবাহনের ব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে অচল, সেখানে ব্যক্তিস্বাধীনতার নামে সর্ব সাধারণ খোঁড়া যুক্তি প্রয়োগ করার হস্ত ক্ষেপ থেকে বিরত থাকতে সম্পূর্ণরূপে বাধ্য হয়। কয়েক বছর আগে ইংরেজি সংবাদ পত্রে একটি খবর প্রকাশিত হয়। একজন মানুষ একটি গণিকার প্রেমে পড়ে তাকে বিয়ে করে। কয়েক বছর সুখী জীবন যাপন করার পর উক্ত মাহিলা তার পূর্বে পেশায় ফিরে যাবার জন্য মনস্থির করে ফেলে। স্বামী যে স্ত্রীকে তার পূর্বের ব্যবসায়ে ফিরে যেতে পরামর্শ দিয়েছে বা কোন উপায়ে তার কাজকে অনুমোদন করেছে তার কোন সঙ্গত কারণ নেই। কারণ সে হঠাৎ ঝগড়া করে স্ত্রীকে ঘর থেকে তাড়িয়ে দেয়নি। তার এ অপরাধের জন্যে তাকে বেত্রাদণ্ড দান করা হয় এবং কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়। এমন একটা আইনের বলে তাকে শাস্তি দেয়া হয়েছিল যা ছিল তখনকার দিনে প্রচলিত এবং যা এখন পর্যন্ত আইনের সংবিধানে পরিষ্কারভাবে লিখিত আছে।
আমেরিকাতে এই রকমভাবে যদিও গৃহকত্রী নিয়োগ করা বেআইনী নয় তবু তাকে নিয়ে এক স্টেট থেকে অন্য স্টেটে ভ্রমণ করা বেআইনী। নিউইয়র্কবাসী তার গৃহকত্রীকে নিয়ে বরুকলিনে যেতে পারে কিন্তু জার্সি শহরে যেতে পারে না। বিভিন্নতার মধ্যে নৈতিকতার এমন কি ইতর বিশেষ পার্থক্য রয়েছে তা স্পষ্টতঃ সরল মানুষের কাছে বোধগম্য নয়।
এ সমস্ত ব্যাপার লীগ অব ন্যাশনসও অধিকতর কঠোর বিচার-ব্যবস্থার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার চেষ্টা করেছে। কিছুদিন আগে লীগ অব ন্যাশনস-এর কমিশনে কানাডার প্রতিনিধি বলেছেন যে, যে বয়সেরই হোক না কোন স্বামী অথবা বাপ-মা দু’জনের একজন সঙ্গে না থাকলে কোন মহিলাকে স্টিমারে ভ্রমণ করতে দেয়া উচিত নয়। তার এ প্রস্তাব গৃহিত গয়নি, কিন্তু তার ফলে আমরা যে দিকে মোড় ঘুরছি যে দিকে উজ্জ্বল সংকেত দান করা হয়েছে। এটা স্পষ্টতঃ প্রতীয়মান সে এ ব্যবস্থার ফলে শ্বেতাঙ্গ রমণীদেরকে অর্ধদাসে পরিণত করা হবে। নারীরা যতদিন পর্যন্ত কেউ তাদেরকে নৈতিকতাবহির্ভূত উদ্দেশ্যে ব্যবহার করবে, তার জন্য ঝুঁকি গ্রহণ করতে পারবে না। এ সকল সংস্কারের একমাত্র যুক্তিযুক্ত লক্ষ্য হলো পর্দা।
পিউরিটান মতবাদের বিপক্ষে আরো একটি সর্বজনীন যুক্তি রয়েছে। মানবজীবনের ধর্ম হলো-মানুষ জীবন থেকে কিছু অনন্দ আহরণ করতে চায়। সাধারণভাবে বাস্তব প্রয়োজনের জন্য মানুষ প্রবৃত্তি থেকে যে আনন্দ আহরণ করে তা আনন্দের প্রাথমিক স্তর এবং তা মনের থেকে আহরিত আনন্দের চাইতে ভিন্নতর। ঐতিহ্যবাহী নীতিবাগীশেরা প্রথম প্রকারের আনন্দের মূল্যে দ্বিতীয় প্রকারের আনন্দের প্রশংসা করে। বরঞ্চ দ্বিতীয় প্রকারের আনন্দকেও সে বাহ্য জ্ঞান করে, কারণ সে তা আনন্দ বলে স্বীকার করে না। ভাবে তার বিশ্লেষণ বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ভরযোগ্য নয় এবং অনেকগুলো ক্ষেত্রে সে নিজে নিজের উপর সন্দেহপরায়ন। তাহলে কি শিল্পের আনন্দ ইন্দ্রিয়গ্রাম থেকে উদ্ভূত? না মন থেকে? যদি সে অধিকতর কঠোর হয় তাহলে একবাক্যে এ্যরিস্টটল অথবা পাদরিদের এত শিল্পকে অবজ্ঞা করে উড়িয়ে দেবে। আর যদি সে কম বেশি ধর্মমত সম্বন্ধে উদার মনোভাব পোষণ করে, আর্টের মধ্যে কোন উদ্দেশ্য থাকলে তা সে সহ্য করে এবং স্বভাবতঃই শিল্প হিসেবে তা হবে নিকৃষ্ট ধরণের। এটা টলস্টয়ের মতবাদ। বিয়ে হলো আরেকটা জটিল সমস্যা। কড়া নীতিবাগীশেরা মনে করে থাকে যে বিয়েটা হলো বড়ো দুঃখজনক। অধিকতর কম কড়া নীতিবাগীশেরা বিয়ের প্রশংসা করে এ কারণে যে সাধারণতঃ তা নিরানন্দময় হয়ে থাকে এবং তা হয় যখন তারা বিচ্ছেদটা অসম্ভব হিসেবে ভাবতে থাকে।
সে যা হোক তা আমার বুলবার বিষয় নয়। আমার বলবার বিষয় হলো, যেগুলোকে আনন্দ বলে পিউরিটানেরা সর্বশক্তি প্রয়োগ করে প্রচার করে থাকে তার চাইতে তারা যেগুলোকে খারাপ বলে নিন্দা করে থাকে তা কম ক্ষতি করে। নিজেদের আনন্দ উপভোগ করার পরেই অন্যকে আনন্দ উপভোগে বাধাদানের মধ্যেই সর্বাপেক্ষা বেশি আনন্দ। অধিকতর খোলামেলাভাবে বলতে গেলে তা হলো ক্ষমতা অধিকার করার আনন্দ। মদ খাওয়া এবং অন্যান্য যে দোষগুলোর বিরুদ্ধে আপত্তি করে তার চেয়ে বর্তমানের পিউরিটানদের ক্ষমতা প্রীতি অনেক বেশি অনিষ্টকর। যারা পিউরিটান মতবাদের আওতাভূক্ত তারা অত্যধিকভাবে ক্ষমতা প্রেমিক হয়ে থাকে। কিন্তু মানুষের ক্ষমতাপ্রীতিকে ঘন্টা করে কল্যানেচ্ছা বলে চালিয়ে দেয়া হয়। এর প্রতিক্রিয়া সমাজে অত্যন্ত মৃদু। এ থেকে এটুকু প্রমাণিত হয় যে আমরা আমাদের বিরুদ্ধে শত্রুতা করার জন্য নয় শুধু খারাপ হওয়ার কারণেই বিজিতের শাস্তি দিয়ে থাকি। এর প্রত্যেকটার ফল স্বরূপ অত্যাচার এবং যুদ্ধের সৃষ্টি হতে পারে। নৈতিকভাবে ঘৃণা করা আধুনিক পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষতিকর শক্তির একটি, যার মন্দ প্রভাবে প্রোপাগাণ্ডা যারা নিয়ন্ত্রণ করে থাকে তাদের দিকে জনসাধারণের দৃষ্টি ঘোরানো হয়।
