আমেরিকাতে এ নতুন আন্দোলন পরিপুষ্টি লাভ করেছে। এর প্রধান কারণ মহাযুদ্ধে একমাত্র বিজয়ী শক্তি হলো আমেরিকা। পিউরিটান মতবাদের ইতিহাস খুবই কৌতূহলোদ্দীপক। সপ্তদশ শতাব্দীতে খুবই সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য তারা ইংল্যাণ্ডের ক্ষমতা দখল করেছিল, কিন্তু জনসাধারণ তাদের অত্যাচারে এত বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছিল যে পুনরায় তাদেরকে ক্ষমতায় আরোহন করার কোন সুযোগ দান করেনি। পিউরিটানেরা ইংল্যাণ্ডের অত্যচার নির্যাতন চালিয়েছে, নিউ ইংল্যাণ্ড এবং মধ্যপ্রাচ্যকে উপনিবেশে পরিণত করেছে। আমেরিকার গৃহযুদ্ধ ইংল্যাণ্ডের গৃহযুদ্ধের ফলে হয়েছিল, যেহেতু দক্ষিণাঞ্চলে অধিকাংশ স্টেট পিউরিটানদের প্রতিদ্বন্দ্বীদের দ্বারা উপনিবেশে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু ইংল্যাণ্ডের এত আমেরিকাতে পিউরিটান দল পরাজিত হয়নি, বরং চিরতরে জয়লাভ করেছিল। এর ফল দাঁড়াল এই যে শ্রেষ্ঠতম শক্তিকে যারা নিয়ন্ত্রণ করার অধিকার পেল তাই ক্রমওয়েলের চরিত্রের লৌহ কঠিন দিকটার উত্তরাধিকারী।
পিউরিটান মতবাদ যে মানুষের কল্যাণ করেছে সেটুকু ঢেকে রেখে শুধু দোষগুলো দেখালে অবিচার করা হবে এবং তা শোভনও নয়। ইংল্যাণ্ডের সপ্তদশ শতাব্দী থেকে আধুনিক যুগের পূর্বপর্যন্ত পিউরিটান মতবাদ রাজকীয় আমলাতন্ত্রে জুলুম নির্যাতনের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রের সমর্থনে সংগ্রাম করেছে। আমেরিকাতে দাস প্রথা রহিত করার স্বপক্ষে অংশ নিয়েছে এবং আমেরিকাকে সমগ্র বিশ্বের গণতন্ত্রের পীঠস্থান হিসেবে রূপ দিতে পিউরিটান মতবাদ অবিস্মরনীয় ভূমিকা গ্রহণ করেছে। এগুলো হচ্ছে এ মতবাদের লোকহিতৈষী কার্যাবলী, কিন্তু এসব ঘটেছিল অতীতে। বর্তমানে সংখ্যালঘুদের প্রতি শাসনমিশি, উদারতার মতো রাজনৈতিক গণতন্ত্রের সমস্যা তেমন প্রখর নয়। বর্তমানে যে সমস্যা তা বিচার করতে হলে পিউরিটানদের চাইতে ভিন্নতর দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজন। নৈতিকতার বন্ধনের চাইতে সহানুভূতির প্রসারতা এবং সহনশীলতাই এজন্য অত্যধিক প্রয়োজনীয়। কিন্তু পিউরিটানদের মধ্যে প্রসারিত সহানুভূতির বেগ খুব বেশি জোরালো নয়।
আমেরিকাতে প্রবেশের বিরুদ্ধে জারীকৃত নিষেধাজ্ঞার ফলে পিউরিটান মতবাদের যে সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ বিজয় সূচিত হয়েছে সে সম্পর্কে আমি কিছু বলব না। যদি কোন ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞায় প্রতিদ্বন্দ্বীদেরকে নীতিগতভাবে কাবু করতে না পারে। তাহলে তারা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ অবশকারী কোকেনকে নিষিদ্ধ ঘোষণার সমর্থন করবে, যেহেতু তাতেও একই নীতিগত প্রশ্ন বিজরিত।
অন্যান্য ধর্মোম্মত্ততার মতো পিউরিটন মতবাদের বাস্তব প্রতিবন্ধক হলো, সবগুলো দোষকে না দেখিয়ে দমন করার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করে। ধর্মোম্মাদেরা বোঝেনা যে প্রকৃত দোষীর উপর নির্দয় চাপ প্রয়োগ করলে ফলাফল যা হবে তা আরো ভয়াবহ। উদাহরণস্বরূপ আমরা অশ্লীলতা প্রচারের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনকে নিতে পারি। কেউ অস্বীকার করেনা যে অশ্লীলতা নিকৃষ্ট ধরণের আনন্দ বিতরণ করে এবং যারা অশ্লীলতার প্রচার করে তারাও নিঃসন্দেহে ক্ষতি করে। কিন্তু আইন যখন তা দমন করতে অগ্রসর হয় তখন অনেক প্রত্যাশিত গুণাবলীকেও দমন করে। কয়েক বছর আগে একজন প্রখ্যাত ওলন্দাজ শিল্পী ডাকযোগে কিছু ছবি ইংরেজ ক্রেতাদের কাছে পাঠিয়েছিলেন। পোস্ট অফিসের কর্মচারীরা ছবিগুলো আগাগোড়া ভালোভাবে দেখে রায় দিলো যে ওগুলো অশ্লীল। (শৈল্পিক উৎকর্ষের প্রশংসা রাষ্ট্রীয় কর্মচারীদের কাছে থেকে প্রত্যাশা করা যায় না। সুতরাং তারা সেগুলো বিনষ্ট করে ফেলল, ক্রেতা তার ক্ষতিপূরণ পাননি। ডাকযোগে কিছু এলে তা যদি কর্মচারীরা অশ্লীল মনে করে, নষ্ট করে ফেলার অধিকার আইন পোষ্টাফিসকে দিয়েছে এবং তাদের গৃহিত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আর কোথাও কোন নালিশ করা চলবেনা।
জন্মনিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে পিউরিটানদের বিচারের যা বক্তব্য তাহলে আর একটি দোষের জ্বলন্ত উদাহরণ। এটা স্পষ্ট যে অশ্লীলতাকে আইনের পরিভাষায় প্রকৃতভাবে সংজ্ঞাবদ্ধ করা সম্ভব নয়, তবে বাস্তবে আদালতে যা বিচারকের স্নায়ুতে আঘাত করে তাকেই অশ্লীল বলে গণ্য করা হয়। জন্মনিয়ন্ত্রণের সংবাদ শুনে গড়পড়তা বিচারকের যে স্নায়ুতে আঘাত লাগবে তেমন কোন কথা নেই; যদি জন্মনিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে একটা ব্যয় বহুল গ্রন্থ রচনা করে প্যাচালো বাক্য এবং লম্বাচওড়া বাগ্বিদির মাধ্যমে তা প্রকাশ করা হয়। কিন্তু তা কি অশিক্ষিত লোকে বুঝতে পারে এত সরল বাক্য বিন্যাসের মারফত প্রকাশ করা হলে বিচারকের স্নায়ুতে আঘাত লাগবে। ফলতঃ বর্তমান ইংল্যাণ্ডে শ্রমিকদের কাছে জন্মনিয়ন্ত্রণের সংবাদ দেয়া বেআইনি যদিও শিক্ষিত লোকের কাছে এ সংবাদ দেওয়াটা আইনতঃ অসিদ্ধ নয়। তা সত্ত্বেও খেটে খাওয়া মজুরদের জন্য এ খবরের দরকার অনেক বেশি। সমস্ত বিষয়কে এখন একটি মাত্র প্রশ্নের নিরিখে বিচার করে দেখতে হবে। যদি এর প্রচারপত্র কোন নোংরা মনোভাবসম্পন্ন বালকের হাতে পড়ে, তাহলে তা কি তাকে কোনরকমের আনন্দ দিতে পারবে? যদি তা পারে, যতই সামাজিক প্রয়োজনীয়তা থাকুক না কেননা অবশ্যই বিনষ্ট করতে হবে। জোর করে আরোপিত অজ্ঞতার কি ফলাফল হতে পারে তা বলা যায় না। অভাব, নারীদের পুরনো রোগ, রোগাক্রান্ত শিশু প্রসব, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং যুদ্ধ এসবকে পিউরিটান আইন স্রষ্টারা কতক বোকা বালকের কাল্পনিক আনন্দের চাইতে কম দোষাবহ বলে মনে করে।
