আমার মনে হয়, বিজ্ঞান এবং প্রগতির কাছ থেকে আমরা অনেক বেশি কিছু আশা করতে পারি। ধীরে ধীরে মানুষ হৃদয়ঙ্গম করতে সক্ষম হবে যে পৃথিবীর ভিত্তিভূমি যেখানে হিংসা, বিদ্বেষ এবং অত্যাচারের মধ্যে প্রোথিত সেখানে সুখের আশা করাই অযৌক্তিক। অতি অল্প সংখ্যক মানুষের মনে গত মহাযুদ্ধ এ শিক্ষা দিয়ে গেছে। যদি আরো বেশি মানুষকে তা প্রভাবিত করত তাহলে এতদিনে তার আবেদন ম্লান হয়ে যেত। আমাদের এখন এমন একটা নীতির প্রয়োজন যা জীবনের প্রতি প্রগাঢ় ভালোবাসা থেকে উদ্ভূত এবং যা প্রসারতা এবং প্রত্যক্ষ কীর্তির আনন্দবোধ বেড়ে ওঠে, নিষেধ এবং অত্যাচারের ভিত্তিভূমিতে নয়। অন্যেরা সুখে থাকলে যে মানুষের আনন্দ হয়, অর্থ ব্যয় করতে দ্বিধা করেনা, মনের দিক দিয়ে এমনিতর উদার মানুষকেই আমাদের ভালো মানুষ বলা উচিত। যদি তাই হয়ে থাকে পৃথিবীতে অল্পসংখ্যক সুখী ব্যক্তির কোন দাম নেই। যে মানুষ অপরকে প্রতারিত করে অথবা নির্দয়তার মাধ্যমে সৌভাগ্যের স্বর্ণ তোরণে আরোহণ করেছে বর্তমানে আমাদের নীতিজ্ঞানহীন লোক বলতে তাদেরই বলা উচিত। যদিও তারা রীতিএত গির্জায় যায় এবং অসদুপায়ে অর্থের কিছু অংশ জনসাধারণের তহবিলে দান করে, তবুও তারা নীতিজ্ঞানহীন মানুষ ছাড়া আর কিছু নয়।
এই দৃষ্টিভঙ্গীকে প্রসারিত করতে হলে আমাদের নৈতিকতাকে কুসংস্কার এবং নির্যাতন যা এখনো আমাদের সমাজের দিকপালদের কাছে ধর্মীয় অনুশাসনের এত তা থেকে মুক্ত করতেই হবে এবং শাণিয়ে তুলতে হবে আমাদের বিচারবুদ্ধিকে। আজকালকার যুগে বিচারবুদ্ধি খুবই সীমিত হলেও আমি সবসময় অননুতপ্তচিত্তে বিচারবুদ্ধিকেই সমর্থন করে যাবো। হতে পারে বিচারবুদ্ধির শক্তি অল্প কিন্তু তা স্থির এবং একমূখী। অন্যদিকে বিচারবুদ্ধি বহির্ভূত শক্তিগুলো একটা আরেকটাকে নির্মূল করে। সুতরাং প্রত্যেক রকমের বিচারবুদ্ধি বহির্ভূত গুপ্ত উপাসনা এবং সমধর্মী প্রবৃত্তিগুলোর সহায়ক হয় এবং উজ্জ্বলভাবে দেখিয়ে দেয় যে ওসবই বিচারবুদ্ধির পরম সুহৃদ।
১০. গোঁড়া মতবাদের পুনরাবির্ভাব
যুদ্ধের সময়ে সকলদেশের ক্ষমতাশালীরা জনতাকে অস্বাভাবিক রকমের সুযোগ সুবিধা ঘুষ হিসেবে দেয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতে লাগল। মজুরদের বেঁচে থাকার মতো মজুরি দিতে স্বীকার করা হলো, হিন্দুদের বলা হলো তারাও মানুষ, সুতরাং পরস্পর ভাই ভাই। মহিলাদের ভোটদানের অধিকার প্রদান করা হলো এবং যুবকদের সে সকল নির্দোষ আনন্দ উপভোগ করার অধিকার দেয়া হলো যা বুড়োরা নৈতিকতার নামে সব সময় লুণ্ঠন করতে তৎপর ছিল। যুদ্ধজয়ের শেষে বিজেতারা সাময়িকভাবে সাধারণ্যে যে সুযোগ সুবিধাদান করেছিল তাদেরকে যুদ্ধে পাঠিয়ে জয়লাভ করার জন্যে, তা থেকে বঞ্চিত করার মানসে আবার সক্রিয় সংকল্প গ্রহণ করতে শুরু করে দিলো। ১৯২১ এবং ১৯২৬ সনের কয়লাখনির ধর্মঘটের মাধ্যমে মজুরদের সম্পূর্ণরূপে বঞ্চিত করা হলো। বিভিন্ন সিদ্ধান্তের বলে আবার হিন্দুদের তাদের পূর্বের স্থানে ফিরে যেতে বাধ্য করা হলো। মেয়েদের ভোটাধিকার যদিও হরণ করা হয়নি, তবুও বিয়ের পরে তাদের চাকুরি থেকে বরখাস্ত করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো, যদিও পার্লিয়ামেন্টে তা করা হবে না বলে একটা আইন পাশ করা হয়েছিল। খোলাসা করে বলতে গেলে এগুলো হচ্ছে রাজনৈতিক বিষয়ের আওতাভূক্ত। ইংল্যাণ্ডে শ্রেণী সমূহের স্বার্থরক্ষার জন্যে যেমন সুশৃঙ্খল ভোটদাতাদের সংঘবদ্ধ প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তেমনি ভারতে রয়েছে ইংরেজ শ্রেণীসমূহের স্বার্থের পরিপন্থী অনুরূপ সংঘবদ্ধ প্রতিষ্ঠান। কিন্তু কোন সংঘবদ্ধ প্রতিষ্ঠান একজন নারী এবং একজন পুরুষ কারো কোন ক্ষতি না করে সুখী জীবনযাপন করার স্বাধীনতায় বিশ্বাসের দৃষ্টিকোণ থেকে এ প্রশ্নের বিচার করেনি বলে পিউরিটানেরা এ পর্যন্ত তেমন কোন প্রবল প্রতিবন্ধকের সম্মুখীন হয়নি এবং তাদের অত্যাচারের ক্রমবিকাশমান একটি রাজনৈতিক প্রশ্ন বলে বিবেচিত হয়নি।
এক গোঁড়া অথবা পিউরিটানকে এভাবে আমরা চিহ্নিত করতে পারি, তার ধারণা কিছু কাজ, যদিও কর্তা ছাড়া অন্যকারো উপর তা দৃশ্যমান কোন খারাপ প্রভাব বিস্ত রি করতে পারে না, তবুও সেগুলো অন্তর্নিহিতভাবে পাপময় সুতরাং যে কোন সক্রিয় উপায়ে ফৌজদারি আইনের বলে অথবা অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে জনমতের সাহায্যে তা দমন করা কর্তব্য বলে মনে করে। কিন্তু মুলতঃ এ হচ্ছে উপযোগবাদী বিচারব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কশীল, তাহলে কোন সম্প্রদায় বিশেষ বিশেষ অপরাধকে সহ্য করে নিলে সম্প্রদায়ের দেবতাদের কোপ দৃষ্টিতে পড়তে হয়, সুতরাং সে জন্যে সে কাজগুলো সামাজিকভাবে অনিষ্টকর সোডম (Sodom) এবং গোমোরাহর কাহিনীর মধ্যে এ দৃষ্টিভঙ্গীর পূর্ণ সমর্থন পাওয়া যাবে। যারা এ সকল কাহিনা সত্যি বলে বিশ্বাস করে তারা উপযোগবাদের দৃষ্টিভঙ্গীতে যথাযথ ভাবে অপরাধের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠিত আইনকে বিচার করতে পারবে-যার ফলে ঐ সকল নগরী ধংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। আজকের দিনে পিউরিটানেরা কদাচিৎ ঐ দৃষ্টিভঙ্গিকে সত্য বলে গ্রহন করে থাকে। এমনকি লণ্ডনের প্রধান যাজকও বলেন না যে টোকিওর ভূমিকম্প এর অধিবাসীদের বিশেষ কোন অপরাধের কারণে হয়েছে। সুতরাং যে আইনগুলো সমাজে চালু আছে এবং যে সব আইনের সম্বন্ধে কথা উঠেছে সেগুলোকে একমাত্র প্রতিহিংসামূলক শাস্তিদানের যুক্তিতে ছাড়া আর কিছুতেই সমর্থন করা যায়না, যে অনুসারে কিছু পাপ একমাত্র কর্তাকে ছাড়া আর কারো কোন ক্ষতি করে না, সেগুলো এত জঘণ্য যে পাপীকে শাস্তি প্রদান করা আমাদের পবিত্র কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায়। উনবিংশ শতাব্দীতে বেনথামের মতবাদের প্রভাবের ফলে এ মনোভাবের অপসৃতি ঘঠে। কিন্তু সাম্প্রতিককালে উদারনৈতিক মনোভাবের অবক্ষয়ের ফলে পিউরিটান মতবাদ আবার হারানো ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং মধ্যযুগের যে কোন নৃশংসতার এত নতুন অত্যাচারের হুমকী দর্শন করেছে।
