আরেক উপায়ে ভালো লোকেরা কাজে আসতে পারে, তাহলে খুন হয়ে। দু’জন যাজক খুন হওয়ার সুবাদে জার্মানি চীনের কাছ থেকে সানতুং প্রদেশ কেড়ে নিয়েছিল। সারাজেভোতে যে আর্কডিউক নিহত হয়েছিলেন, আমার বিশ্বাস তিনিও ছিলেন ভালো মানুষ, তার প্রতি আমরা অসীম কৃতজ্ঞ। তিনি মারা না-গেলে যুদ্ধ লাগত না, যুদ্ধ না-লাগলে জঙ্গীবাদকে কখনো সরানো যেত না; তাহলে একদিকে গণতন্ত্রকে যেমনি নিরাপদ করা যেতনা তেমনি অন্য দিক দিয়ে ইটালি, স্পেন, বুলগেরিয়া, রাশিয়া এবং হাঙ্গেরিতে সামরিক কর্তৃত্বও প্রতিষ্ঠিত হতো না।
প্রকৃত প্রস্তাবে, সাধারণত জনমত যে ধরণের ভালোত্বের মান নির্ধারণ করেছে তা পৃথিবীকে অধিকতর সুখকর বাসস্থান হিসেবে গড়ে তোলার এত সুপরিকল্পিত মানবিক গুণাবলী নয়। এর সর্বপ্রধান কারণ হলো ঐতিহ্য এবং দ্বিতীয় প্রধান কারণ হলো পবিত্রতা এবং বিধি-নিষেধের নিরিখেই আদিম নৈতিকতার উৎকর্ষ ঘটেছে। বলতে গেলে আগে যা ছিল কুসংস্কার, তাতে কতক নিরাপদ কাজকেও নিষিদ্ধ ঘোষনা করা হয়েছে। যেমন সর্দারের থালা হতে খাওয়ার পেছনে তাদের কাল্পনিক বিশ্বাসের ভিত্তি ছিল, তা করলে যাদুর প্রভাবে প্রচণ্ড বিপদ ঘটতে পারে। এভাবে তাদের মধ্যে নিষেধগুলো শিকড় গেড়ে বসলো। তারা কাল্পনিক বিশ্বাসের কথা কালক্রমে ভুললো বটে কিন্তু ওগুলো তাদের চেতনায় অস্পষ্ট স্বাক্ষর রেখে গেলো। প্রচলিত নৈতিকতার অনেকগুলিই এ জাতীয়। বিশেষ বিশেষ আচরণ, কার্যকলাপ অথবা উক্ত কার্যকলাপের ফলশ্রুতি মানুষের মধ্যে উদ্দাম আবেগের সঞ্চার করে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই আরেগজনিত উদ্দাম ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এটা যদি না হয়ে থাকে, নৈতিক মানদণ্ডকে পুখানুপুঙ্খভাবে বিচার করা হলে তা জনসাধারণের স্বীকৃতি আদায় করতে সমর্থ হবে।
উদাহরণস্বরূপ বলতে গেলে সভ্য সমাজে কখনো খুনকে বরদাশত করা হয় না, তা সত্ত্বেও খুন নিষিদ্ধ ঘোষণার মর্মমূলে রয়েছে কুসংস্কার। এই বিশ্বাস তখন প্রবল ছিল যে খুনী ব্যক্তির রক্ত অথবা প্রেতাত্মা প্রতিশোধের নেশায় শুধু ঘাতককে নয়, তার প্রতি যারা করুণা প্রদর্শন করে তাদেরকেও শাস্তি দিতে পারে। খুন নিষিদ্ধ করার মূলেও যে ছিল কতক কুসংস্কারমূলক অন্ধ অনুপ্রেরণা কতক বাস্তব বিষয়ে নজর দিলে তা স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। যেমন কতকগুলো গোত্রগত উৎসবের মাধ্যমে ঘাতককে ছদ্মবেশ পরালে বা নিহত ব্যক্তির প্রেতাত্মা না চিনতে পারে মতো রক্ত ধুয়ে দেয়া হতো। স্যার জে, জি ফ্রেজার তার থিয়োরিতে অন্তত এটুকু বলেছেন। রক্তের দাগ মুছে ফেলার জন্য প্রাচীনকালে যে অনুষ্ঠান করা হতো তাকে আমরা রূপক হিসেবে অনুতাপ এবং পাপ ধৌত করার প্রতীক হিসেবে এখনও গ্রহণ করে থাকি। এবং অপরাধ বোধের অন্তরালে রয়েছে অতীতের পূঞ্জীভূত কুসংস্কার। এমনকি একটা খুনের ব্যাপারেও বিবেক বুদ্ধি সম্পন্ন নৈতিকতা ভিন্নতর মতামত দিয়ে থাকে যা অপরাধ, শাস্তি এবং প্রায়শ্চিত্তের চাইতে আরোগ্য এবং প্রতিকারের সঙ্গে অধিকতর সম্পর্কশীল।
আমাদের বর্তমান নৈতিকতা কুসংস্কার এবং বিচার-বুদ্ধির সমাহারে সৃষ্ট। খুন করা হলো একটি প্রাচীন অপরাধ যা আমরা যুগান্তরের সঞ্চিত কুসংস্কারের ধুম্রজালের মধ্য দিয়ে অবলোকন করে থাকি। আমরা জুয়াচোরদেরকে শাস্তি দিয়ে থাকি বটে কিন্তু খুনীদের এত তাদের আলাদা করে রাখি না। থিয়োরিতে আমরা যাই বলি না কেন, এখনো আমাদের কাজকর্ম সামাজিক রীতিনীতির নিরিখেই করে থাকি। আমাদের ধর্ম আমরা যা করি তার চেয়ে আমরা যা করিনা তার মধ্যেই বহুলাংশে নিহিত। একজন মানুষ অন্য একজন মানুষের কোন উপকার না করেও পাপ বলে কথিত এক শ্রেণীর কাজ করা থেকে বিরত থেকেও ভালোমানুষ আখ্যা পেতে পারে; কিন্তু তা হলেও খ্রিস্টের প্রচলিত বাণী, প্রতিবেশীকেও নিজের এত ভালোবাসো এ ধারণাতে সে সত্যেরই সমর্থন মেলে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় সমগ্র খ্রিস্টান বিশ্বে যিনি এ ধারণা মেনে চলেন তার উপর চালানো হয় সবচেয়ে বেশি নির্যাতন। তাকেই দারিদ্রের আগুনে জ্বলতে হয় বেশি, সময়ে, অসময়ে কারাবরণ এমন কি মৃত্যুদণ্ড বরণ করতে হয়।
পৃথিবীটা অবিচার পরিপূর্ণ, যারা এ অবিচারের দ্বারা লাভবান হয় তাদের হাতেই পুরস্কার এবং শাস্তি দেয়ার ক্ষমতা সংরক্ষিত। যারা এ অসাম্য এবং অবিচারকে চালু রাখার উপায় উদ্ভাবন করে তাদের ভাগ্যে জোটে শিরোপা এবং যারা প্রতিকার করতে আসে তাদেরকে সইতে হয় কঠোরতম নির্যাতন। আমি এমন একটা দেশও জানিনে যে দেশের মানুষ কুটিলতা পরিহার করে দীর্ঘকালের জন্য প্রতিবেশীদের সঙ্গে সদ্ভাব রক্ষা করেছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার অব্যবহিত পূর্বে ফরাসি দেশের শ্রেষ্ঠ নাগরিক জ্যা জ্বরসকে হত্যা করা হয় এবং হত্যাকারী জনসাধারণের জন্য কি একটা কাজ করেছে এ সুবাদে তাকে হত্যার দায় হতে অব্যাহতি দেয়া হয়। এ জাতীয় ঘটনা পৃথিবীর সব জায়গায় অহরহ ঘটছে।
যারা ঐতিহ্যাশ্রয়ী নৈতিকতার স্বপক্ষে তারাও মাঝে মাঝে বলেন যে তা সম্পূর্ণ নিখুঁত নয়, কিন্তু তারাই আবার কোনোও সমালোচনা উঠলে নৈতিকতার ভিত্তিভূমি রসাতলে গেল বলে হায় হায় করেন। প্রত্যক্ষ এবং গঠনমূলক আলোচনা হলেও তাতে কিছু হবেনা যদি ক্ষণিকের আনন্দের উল্লম্ফনে হয়ে থাকে। আমরা এখন বেথামে ফিরে আসি, যিনি সর্বাধিক সংখ্যক মানুষের জন্য যে সুউচ্চ নৈতিকতার প্রয়োজন তার জীবন যে মানুষ প্রচলিত অর্থে জীবন ধারণ করে তার চেয়ে ঢের বেশি পরিশ্রমের। স্বভাবতঃই তিনি বঞ্চিত এবং হতাশার দলের সর্বাগ্রগণ্য হবেন এবং মহত বৃহৎদের কোপদৃষ্টিতে পতিত হবেন। শাসকেরা যেসব ঘটনা গোপন করতে চায় তিনি সে সব তারস্বরে জানিয়ে দেন। তার সহানুভূতি যাদের কাম্য তাদেরকে দূরে সরানো মিথ্যাচার থেকে তিনি স্বভাবতঃই বিরত থাকেন। এ জাতীয় জীবন ধারার আসল নৈতিকতা কখনো ধ্বংশপ্রাপ্ত হবে না। শাসক সম্প্রদায় নৈতিক দিক দিয়ে সব সময়ে অত্যাচারী এবং বিয়োগাত্মক হয়ে থাকে। তারা সবসময় বলে যে, যা কিছু নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে তার বিরুদ্ধে কষ্ট করে অনুসন্ধান করে তুমি কিছু বলবেনা। এই ধরণের নৈতিকতার বিরুদ্ধে অতীন্দ্রয়বাদীরা বৃথাই প্রতিবাদ করেছেন, তাদের শিষ্যেরা প্রচারিত বাণীর সার সত্যকেই উপেক্ষা করে গেছেন। তাদের প্রচলিত পদ্ধতি অনুসারে কোন স্থায়ী কল্যাণ আসতে পারে, একথা আশা করাও অন্যায় এবং অযৌক্তিক।
