অতীতের যে সকল খারাপ মানুষ দুর্ভাগ্যবশত প্রসিদ্ধি লাভ করেছেন, তাদের সহ্য করা ভয়ঙ্করভাবে বেদনাদায়ক। সুতরাং ভালো লোকদের ভালো ধ্যান-ধারণার দিকে নজর দেয়া যাক।
স্বভাবতই তৃতীয় জর্জ ছিলেন একজন ধার্মিক ব্যক্তি। পিট যখন তাকে দিয়ে ক্যাথেলিকদের মুক্তি ঘোষণা করাতে চেষ্টা করলেন। (তখন ক্যাথোলিকদের ভোটের অধিকার ছিলনা) তখন এ অজুহাতে তার সঙ্গে একমত হননি যে তা করলে তিনি রাজ্যাভিষেকের সময় যে শপথ করেছেন তা ভঙ্গ করবেন। ন্যায়ত তিনি তাদের মুক্তি ঘোষণার দ্বারা ভালো হবে, এ যুক্তি দ্বারা পরিচালিত হতে চাননি! তা ভালো হবে কিনা তার চাইতে তা ন্যায় কিনা এই বিমূর্ত প্রশ্নই তাকে আলোড়িত করেছিল বেশি। প্রধানতঃ রাজত্বের জন্যই তাকে রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছিল, যে কারণে আমেরিকা স্বাধীনতার দাবি করতে লাগলো। কিন্তু তার হস্তক্ষেপ সবসময় সর্বোচ্চ লক্ষ্যের দ্বারা পরিচালিত হয়েছিল। ভূতপূর্ব কাইজার সম্বন্ধেও একই কথা বলা যায়, তিনি ছিলেন খাঁটি ধার্মিক, পতনের পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত ভগবান তার পক্ষে ছিলেন। এবং (আমি যতটুকু জানি) ব্যক্তিগত কোন পাপ থেকে তিনি সম্পূর্ণ রূপে মুক্ত ছিলেন না। তা সত্ত্বেও আমাদের যুগে এমন একজন মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না, যিনি মানুষের এত বেশি দুর্ভাগ্যের কারণ হয়েছেন।
রাজনৈতিকদের মধ্যে ভালো লোকের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, যাতে করে নামের ধুম্রজালের আড়ালে অন্যেরা তাদের কাজ নিঃসন্দেহে চালিয়ে যেতে পারে। একজন ভালো লোক তার বন্ধুদেরকে নোংড়া কাজের জন্য কখনো সন্দেহ করে না এবং এটাই হচ্ছে তার ভালোত্বের একটা অংশ। জনসাধারণ কখনো ভালো লোকের কার্যকলাপের অন্তরালে যে খারাপ মানুষের খারাপ কাজ থাকতে পারে তা কখনো সন্দেহ করেনা, এটাই হলো ভালো মানুষের প্রয়োজনীয় যোগ্যতা। এটা সুস্পষ্ট যে এ সকল গুণের সমন্বয়ের ফলে জনসাধারণের কাছে প্রিয় বিবেচিত হন এবং ধনী হতে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের তুলনায় তাদের কাছে জনসাধারণের তহবিল গচ্ছিত রাখা উপযুক্ত মনে করেন। যদিও আমি কোনক্রমে মেনে নিতে পারছিনে, তবু আমাকে বলা হয়েছে, খুব বেশি দিনের ইতিহাস নয়, আমেরিকাতে একজন প্রেসিডেন্ট ছিলেন, যিনি এ উদ্দেশ্য সাধন করেছিলেন। ইংল্যাণ্ডের হুইটটেকার (Whittaker) যখন তার যশের মধ্যগগনে অবস্থান করছিলেন, তখন তিনি অকলঙ্ক ওমরাহগণ কর্তৃক পরিবেষ্টিত হয়েছিলেন, তার ধার্মিকতার কারণে তারা তার অঙ্কজ্ঞানের সঙ্গে পরিচিত লাভ করতে পারেনি অথবা পরিচয় থাকলেও তার অঙ্ক সম্পর্কে উচ্চবাচ্য কিছুই করেননি।
ভালো মানুষদের আরেকটা ব্যবহারযোগ্যতা হলো কাদা ঘাটাঘাটির কারণে অনভিপ্রেত ভদ্রলোকদেরকে রাজনীতির বাইরে রাখা যায়। শতকরা নিরানব্বই জন মানুষ নৈতিক আইন ভঙ্গ করে, কিন্তু সাধারণ্যে প্রকাশ পায়না। নিরানব্বই জনের বেলায় যখন তা প্রকাশ পায় কোন ব্যক্তির সম্বন্ধে, একশর মধ্যে যে একজন মানুষ নির্দোষ তিনি প্রচণ্ড রাগে ফেটে পড়েন এবং অন্যান্য আটানব্বই জন নিজ নিজ অপরাধ প্রকাশ পাবার ভয়ে তার অনুসরণ করে। যখন কোন জঘণ্য মতামতের মানুষ রাজনীতিতে অংশ গ্রহণ করেন, তখন যারা আমাদের প্রাচীন মতামতে মনে প্রাণে বিশ্বাসী তাদেরকে তার ব্যক্তিগত জীবনের কার্যাবলীর প্রতি এমনভাবে নজর রেখে অপেক্ষা করতে হবে যে পর্যন্ত না তারা এমন কিছু আবিষ্কার করতে পারে যা প্রকাশ পেলে তার রাজনৈতিক জীবন ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে। তারপরে তাদের জন্য তিনটি পথ খোলা রয়েছে। তার ব্যক্তিগত জীবনের জঘণ্য কার্যাবলী প্রকাশ করে দিয়ে তাকে বিস্মৃতির অতলে ডুবিয়ে দেয়া অথবা প্রকাশ করার ভয় দেখিয়ে তাকে অবসর গ্রহণ করতে বাধ্য করা অথবা তাকে ব্ল্যাকমেইল করে প্রচুর অর্থোপার্জন করা-এ তিনটির যে কোন একটি পথ সে অনুসরণ করতে পারে। এ তিনটির মধ্যে প্রথম দু’টি জনসাধারণকে রক্ষা করে এবং তৃতীয়টি যারা জনসাধারণকে রক্ষা করে তাদেরকে রক্ষা করে থাকে। সুতরাং এই তিনটি পথের কথা বলা যায় এবং ভালো মানুষদের দ্বারা ত্রয়ীপন্থানুসারে ইস্পিত ফল লাভ সম্ভব হয়।
আবার বিবেচনা করে দেখতে গেলে এ সকল ব্যাপার হলো যৌন-রোগের মতো, পূর্বাহ্নে উপযুক্ত নিরোধক ব্যবহার করলে সমূলে ধ্বংশ হয়ে যায়, কিন্তু ভালো লোকদের জন্য এই জ্ঞান খুব অল্পই বিতরণ করা যায় এবং তার সাফল্যের পথে সব রকমের বাধা-বিপত্তির সৃষ্টি করা হয়েছে। বাইবেলের ধারণা অনুসারে পাপ এখনো তার প্রকৃতিক দণ্ড ভোগ করে থাকে। পিতামাতার পাপের কারণে সন্তানকে কষ্ট দেয়া হয়। এরকম না হয়ে অন্যরকম হলে কি ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করত। যদি পাপীকে শাস্তি দেয়ার ব্যবস্থা না থাকতো তাহলে মানুষ পাপ বলে কিছু নেই মনে করত এবং যদি নির্দোষেরা শাস্তি ভোগ না করত তা হলে তা ভয়ঙ্কর হতো না। সুতরাং সে ভালো মানুষদের প্রতি যারা বৈজ্ঞানিকদের ধর্মবহির্ভূত জ্ঞানকে অস্বীকার করে এখনও তারা প্রাকৃতিক আইনের প্রতি আত্মসমর্পনের নামে অজ্ঞানতাকে চালু রাখতে চান, আমাদের কি রূপ কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। সৎ চিন্তাকারী ব্যক্তি মাত্রই জানে যে কষ্ট দেয়া অথবা না দেয়ার সঙ্গে খারাপ কাজের কোন সংযোগ নেই। যেহেতু সব মানুষকে বিশুদ্ধ নৈতিক আইনানুসারে পরিচালিত করা যায় না বলে এ সিদ্ধান্তে আসা যায় যে দুঃখের আগুনে পাপকে শুদ্ধ করে পূণ্য অর্জন করতে হয়। প্রাক বৈজ্ঞানিক যুগে যেভাবে পাপাত্মক কাজের শাস্তি বিধান করা হতো ঠিক সেভাবে এখনো করা হয় এবং মানুষ যাতে এড়িয়ে যেত না পারে সেজন্য তাদেরকে অজ্ঞানতার অন্ধকারে রাখার প্রয়োজন হয়ে পড়ে। আমাদের ভালো মানুষেরা মেহেরবানী করে যে বিপদজনক জ্ঞান আমাদের মধ্যে বিতরণ করেন, তা থেকে আত্মরক্ষা করে মানবিক এবং শারীরিক স্বাস্থ্য বজায় রাখার জন্য কি পরিমাণ জ্ঞান আবশ্যক তা ভাবতেও আমি কেঁপে উঠি।
