উল্লিখিত অর্থে একজন ভালো লোক একজন মন্দ লোকের তুলনায় অধিকতর ভালো করতে পারে কিনা, সে ব্যাপারে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। আমি মন্দ বলতে যা বুঝি তা এতক্ষণ যা বলে আসছি তার বিপরীত। একজন মন্দ লোক মদ খায়, ধুমপান করে, তার কাজে ব্যাঘাত ঘটালে মন্দ কথাও উচ্চারণ করে এবং তার কথোপকথন সবসময় ছাপার অক্ষরে প্রকাশিত হবার উপযুক্ত নয়। রোববারে গির্জায় যাওয়ার পরিবর্তে অন্য কোথাও গিয়ে সে বেশ মজা করে কাটায়। তার কতকগুলো মতামত খুবই মারাত্মক। যেমন, ধরুন, সে মনে করে, আপনি যদি শান্তি কামনা করেন তাহলে আপনাকে শান্তির প্রস্তুতি নিতে হবে, যুদ্ধের নয়। মন্দকাজ করার ব্যাপারে সে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে যেমন সে করে, থাকে তার মোটর গাড়ির কলকজা বিগড়ে গেল তার যুক্তি হলো খোতবা এবং কারাগার ফাটা টায়ার মেরামত করার চেয়ে পাপের বিশেষ কিছু করতে পারে না। মন্দ চিন্তা করার ব্যাপারেও সে অধিকতর বিকৃত রুচির পরিচয় দিয়ে থাকে। তার মতে মানুষ স্বাভাবিকভাবে যে সব চিন্তা করে তাকে বলা হয় মন্দ চিন্তা। আর যেগুলোকে সৎ চিন্তা বলা হয়ে থাকে, তা তোতা পাখির মতো এক বুলিকে বারবার আওড়ানো ছাড়া আর কিছু নয়। এরই ফলে কতকগুলো অনভিপ্রেত বদ্ধমূল ধারণার প্রতি সহানুভূতি আকর্ষিত হয়। তার কাজের সময়ের বাইরের কার্যাবলী তার কাছে খুবই উপভোগ্য হতে পারে অথবা ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর গায়ে আঁচড় লাগেনা এমন কতকগুলো প্রতিকারসাপেক্ষ অপরাধের আধিক্যবশতঃ চরম অসন্তেষের মধ্যে জীবন কাটায়। আবার এটাও খুব সম্ভব যে, একজন ধার্মিক যেমন করতে পারে তেমনিভাবে সে নৈতিক বিচ্যুতিগুলো গোপন করে উঠতে পারে না। বরঞ্চ বিকৃত মানসিকতার উপর নির্ভর করে কিছু দৃষ্টান্ত স্থাপন করার চাইতে সৎ হওয়াটাকে অনেক বেশি ভালো মনে করেন। একজন লোক যখন এক বিশেষ কোন অথবা কতকগুলো দিকে কৃতকার্যতা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়, তখন সম্মানীয় নাগরিকেরা তাকে জজ ম্যাজিষ্ট্রেট, ইত্যাদি পদ এমনকি মাস্টারের চাকুরি পর্যন্ত অধিকার করতে দেয় না। এসকল পদ শুধুমাত্র ভালো মানুষের জন্যই অবারিত।
এ সকল ব্যাপার কমবেশি আধুনিক। অনুরূপ ব্যবস্থা ক্রমওয়েলের সময়ে পিউরিটানদের অল্পসময় কালীন রাজত্বকালে ইংল্যাণ্ডে স্বল্পকালের জন্য বিদ্যমান ছিল এবং পরে তাদের দ্বারা ঐগুলো আমেরিকাতে প্রবর্তিত হয়। ফরাসি বিপ্লবের পরে যখন জেকোবিনবাদের বিরোধিতা (Jacobinism) করা আজকের যুগের বলশেভিকদের বিরোধিতা করার মতো ভালো কাজ বিবেচিত হতো, তখন সারা ইংল্যাণ্ডে এর পুনরাবির্ভাব হয়নি। ওয়ার্ডসওয়ার্থের জীবনে এ পরিবর্তনকে সুস্পষ্টভাবে প্রত্যক্ষ করা যায়। যৌবনে তিনি ফরাসি বিপ্লবকে সমর্থন করে ফরাসিদের চলে গেলেন, কন্যা সন্তাটিকে পরিত্যাগ করলেন, সুনীতি অনুসরণ করে জীবন অতিবাহিত করতে থাকেন এবং খারাপ কবিতা লিখতে থাকেন। কোলরিজের জীবনেও অনুরূপ পরিবর্তন ঘটে, যখন তিনি খারাপ ছিলেন তখন ‘কুবলা খান কবিতা লিখেন, পরে ভালো হয়ে লিখলেন ধর্মতত্ত্ব।
ভালো থাকার সময় ভালো কবিতা লিখছেন, এমন দৃষ্টান্ত কোন কবির জীবনে খুঁজে পাওয়া একরূপ অসম্ভব। রাষ্ট্রবিরোধী প্রচারণার দায়ে দান্তেকে নির্বাসনে যেতে হয়েছিল। শেক্সপিয়রকে তার সনেট দ্বারা বিচার করা হলে আমেরিকার স্বরাষ্ট্রবিভাগের কর্মচারীরা সেগুলোকে নিউইয়র্ক শহরে ঢুকবার অনুমতি দিতো না। ভালোমানুষের আসল পরিচয় হলো তিনি সরকারকে সমর্থন করেন। সুতরাং ক্রমওয়েলের সময়ে মিলটন ভালো মানুষ ছিলেন, তার আগে কিংবা পরে নয়, কিন্তু এই পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী সময়েই তিনি অধিকাংশ কবিতা রচনা করেছেন। প্রকৃত প্রস্তাবে তার তখনই অধিকাংশ কবিতা লিখিত হয়েছে যখন তিনি রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধে ফাসী থেকে অল্পের জন্য রেহাই পান। কবি ডান সেন্টপলের ডিন হওয়ার পরে ধার্মিক হয়ে যান, কিন্তু তার অধিকাংশ লেখা হয় তার আগে। সে সকল কবিতা লিখেছেন বলে তার নিয়োগকে কেন্দ্র করে প্রচুর কেলেংকারীর সৃষ্ট হয়েছিল। যৌবনে সুইনবার্নও ছিলেন মন্দ লোক, তখনই তিনি স্বাধীনতার জন্য যারা সংগ্রাম করে, তাদের উদ্দেশ্যে’ দ্য সংস বিফোর সানরাইজ (The songs before) সূর্য উঠার আগের গান লিখেছিলেন। বুড়ো বয়সে তিনি ধার্মিক হয়ে গিয়েছিলেন এবং তখনই তিনি বোয়ারদের উপর বর্বরোচিত আক্রমনের প্রতিবাদের কলম ধরেছিলেন এবং তাদের স্বাধীনতার উপর হস্তক্ষেপের নিন্দা করেছিলেন। আর দৃষ্টান্ত বাড়িয়ে কোন লাভ নেই। ভালো সম্বন্ধে যে ধারণার মানের কথা সমাজে প্রচলিত রয়েছে তা যে ভালো কবিতা জন্ম দিতে পারেনা, সে সম্বন্ধে অনেক কিছুই বলা হয়েছে।
অন্যদিক দিয়ে দেখতে গেলেও ব্যাপারটা সত্যি। আমরা সকলে জানি যে ডারউইন এবং গ্যালিলিও উভয়ে মন্দ লোক ছিলেন। মৃত্যুর পর একশ বছর অতীত না হওয়া পর্যন্ত স্পিনোজাকেও মন্দ লোক ভাবা হতো। নির্যাতনের ভয়ে দেকার্তে বিদেশ চলে যান। রেনেসাঁ যুগের সকল শিল্পী ছিলেন খারাপ লোক। সাধারণভাবে বলতে গেলে, যারা দমন করা যায় এমন সব দোষের বিরোধিতা করতেন তাদেরকেই মন্দ লোক ভাবা হতো। আমি লণ্ডনের এমন এক অংশে বাস করি যার অংশবিশেষ ধনী এবং অংশবিশেষ দরিদ্র। শিশু মৃত্যুর হার অস্বাভাবিক ভাবে বেশি এবং ধনীরা দুর্নীতি এবং জোরের মাধ্যমে স্থানীয় সরকারকে (Local Government) নিয়ন্ত্রণ করে। তারা শিশুকল্যাণ এবং জনস্বাস্থ্যের খাতে ব্যয় কমিয়ে দেবার জন্যে ক্ষমতা ব্যবহার করে। একজন চিকিৎসককে কম দামেই এ শর্তে নিয়োগ করা হয়েছে যে তিনি শুধু অর্ধেক সময়ের জন্য রোগীদের দেখবেন। গরীবের ছেলের জীবনের চাইতে ধনীদের জন্য ভালো ডিনারকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ মনে না করলে কেউ স্থানীয় প্রভাবশালী লোকদের শ্রদ্ধাভাজন হতে পারে না। একই ব্যাপার আমার পরিচিত পৃথিবীর সর্বত্রই সত্য। এ থেকে আমরা ভালো লোকের গুণাগুণ কি তা অতি সহজে বুঝতে পারি, ভালো লোক হলেন তিনি যার মতামত এবং কার্যাবলী সরকারের কাছে প্রিয়।
