শয়তান। ধড়াম করে শব্দ হল ঘরে।
উঃ! কাতরে উঠলেন মিস্টার বাসু। বিকৃত তর্জন শোনা গেল তার কণ্ঠে, “কী। আমার গায়ে হাত। দাঁড়াও, চাবকে তোমার ছাল তুলে দিচ্ছি।
সপাং সপাং। বাতাস কেটে চাবুকের হিংস্র হোবলের শব্দ শোনা গেল দু-দুবার। যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে উঠল তপন।
ঘরের বাইরে চারজন রুদ্ধশ্বাসে শুনছিল। সুনন্দ আর স্থির থাকতে পারল না। দরজায় ধাক্কা মারতে মারতে চিৎকার করে উঠল-খবরদার। দরজা খুলুন মিস্টার বাসু। ভয় নেই তপন! আমি সুনন্দ।
মুহূর্তে ঘর নিস্তব্ধ হয়ে গেল। দপ করে নিবে গেল ঘরের আলো।
খুট করে শব্দ হল। যেন ছিটকিনি খুলল কেউ। তারপর কবাট খোলর মৃদু আওয়াজ। সুনন্দ যেটা ঠেলছে সেটা কিন্তু খুলল না। মামাবাবু চেঁচিয়ে উঠলেন, ও পালাচ্ছে। বারান্দার দরজা খুলে। নিশ্চয়ই বাইরে সিঁড়ি আছে নামার।
সুনন্দ অসিত দুড়দাড় করে ছুটল নিচে। তাদের মনে পড়েছে–একটা সরু ঘোরানো লোহার সিঁড়ি দেখেছিল বাড়ির পিছনে। বাইরে থেকে ওই সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় ওঠা-নামা করা যায়।
.
০৬.
অন্ধকার প্যাসেজ। সিঁড়ি হাতড়ে হাতড়ে এগোতে সময় নিল। নিচের সদর দরজা খুলে দুজনে ছুটল সিঁড়ির কাছে। কেউ কোথাও নেই। বিমূঢ় হয়ে এদিকে সেদিকে তাকাচ্ছে, কানে এল ভারী কিছু পড়ার শব্দ। তারপরই ধস্তাধস্তির আওয়াজ। ডান পাশে শব্দ লক্ষ্য করে দৌড়ে গেল তারা।
পাঁচিলের কাছে দুজন ঝটাপটি করছে। একজন মাটিতে। অন্যজন তার বুকের ওপর।
সুনন্দরা পৌঁছনোর আগেই ওপরের লোকটি হেঁচকা টানে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে ছুটল পাঁচিলের দিকে। চাঁদের আলোয় চেনা গেল তাকে–মিস্টার বাসু।
ওকে ধর। চেঁচিয়ে উঠল বাসুর বাধাদানকারী কুণাল।
মিস্টার বাসু পাঁচিলের গায়ে লাফ দিয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল সুনন্দ ও অসিত।
বাপরে, বাসুর গায়ে কী প্রচণ্ড শক্তি। প্রথম ঝটকায় দুজনকে প্রায় ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল। কিন্তু একটু পরে তারা বাসুকে মাটিতে পেড়ে ফেলল। রুমাল দিয়ে পিছমোড়া করে বাঁধল তার হাত।
একটা টর্চের আলো ছুটে আসছে। পিল্লাই এবং মামাবাবু। বাসুকে টেনে তুলে দাঁড় করানো হল। আলো পড়ল বাসুর মুখে। একি!
মিস্টার বাসুর নিখুঁত সাহেবি মূর্তি এখন বিপর্যস্ত। নেই তার চশমা। বোম ছিঁড়ে কোট আলগা। টুপিহীন মাথার চুল এলোমেলো। সেজন্য অবাক হয়নি কেউ। কিন্তু তার পরু গোঁফের এক অংশ খুলে ঝুলে পড়েছে কেন? এ যে নকল গোঁফ। আর মুখের শ্যামলকান্তির জায়গায় জায়গায় চটা উঠে নিচের চামড়ার ফরসা রং বেরিয়ে পড়ে অদ্ভুত দেখাচ্ছে! সবাই স্তম্ভিত নয়নে দেখল, মিস্টার বাসুর ছদ্মবেশ ভেদ করে যেন পরিচিত কারো আদল ফুটে উঠছে।
কুণাল এগিয়ে এল। তার কপাল কেটে রক্ত গড়াচ্ছে। কিন্তু বিন্দুমাত্র ভ্রূক্ষেপ নেই।
মেক-আপখানা খোলো তো চাঁদু–বলতে বলতে সে হাত বাড়িতে এক টানে ছিঁড়ে নিল বাসু সাহেবের বাকি গোঁফ। যন্ত্রণায় কুঁচকে উঠল বাসুর মুখ।
একি! এ যে বঙ্কিম হাজরা!!
বঙ্কিমবাবু আপনি! ইউ স্কাউনড্রেল, মামাবাবু গর্জন করে ওঠেন। তিনি মিস্টার বাসু ওরফে বঙ্কিমবাবুর চুলে হাত দিয়ে পরীক্ষা করে বললেন, কালো রং মেখেছে। কিন্তু সামনের দাঁত দুটো উঁচু করল কী করে? দেখি। হু, ফল্স টুথ। প্লাস্টিকের দাঁত বসিয়েছে আসল দাঁতের ওপর।
অসিত হাঁ হয়ে থেকে বলল, হাঁটা-চলা পালটে ফেলেছিল কেমন! এমনকি গলার স্বর অবধি। বাস্রে!
আমায় নিয়ে কী করতে চান?বললেন বঙ্কিম হাজরা। সাংঘাতিক নার্ভ বটে লোকটার। এখনো দমেনি। তবে ভক্ত বঙ্কিমের গদগদ বিনয়ের মুখোশ খসে পড়েছে। মারমুখী তেরিয়া ভাব।
অ্যারেস্ট। এতক্ষণে কথা বললেন মিস্টার পিল্লাই। তিনি খানিক দূরে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে টর্চের আলো ফোকাস করে রেখেছিলেন বঙ্কিমবাবুর ওপর।
প্রশ্ন হল, কেন?
পিল্লাই উত্তর দিলেন, একনম্বর চার্জ তপনবাবুর ওপর অত্যাচার। দু-নম্বর–তার ভাইকে অপহরণ। তিন নম্বর–দেশের ক্ষতিকারক অন্তর্ঘাতমূলক কার্যকলাপ।
“ননসেন্স! আপনার তৃতীয় অভিযোগের কোনো প্রমাণ নেই।
আছে। তপনবাবু তার সাক্ষী। এবং দ্বিতীয় সাক্ষী আমি। কি, চিনতে পারেন?
পিল্লাই টর্চের আলো ঘুরিয়ে নিজের মুখে ফেললেন।
ভূত দেখার মতো আঁতকে উঠল বঙ্কিম হাজরা, অ্যাঁ, মিস্টার কার্পেন্টার।
সরি। আমি ভারত কেমিক্যালস-এর ডিরেক্টর কার্পেন্টার নই। আমি ইনটেলিজেন্স ব্রাঞ্চের স্পেশাল অফিসার নারায়ণ পিল্লাই। ডিউটির খাতিরে মিস্টার কার্পেন্টারের ভূমিকায় অভিনয় করতে হয়েছিল। আপনাকে দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি, প্রিন্স হোটেলের কুড়ি নম্বর ঘরে কার্পেন্টারের সঙ্গে আপনার সমস্ত গোপন কথাবার্তা, ষড়যন্ত্র, টেপ-রেকর্ডে ধরা আছে। রেকর্ডটা লুকনো ছিল সোফার নিচে।
বঙ্কিম হাজরার চোখে-মুখে এবার সত্যিকার ভয়ের ছাপ দেখা গেল।
সুনন্দ অসিত ছুটল তপনকে আনতে।
বঙ্কিমবাবুকে দেখে আহত শ্রান্ত তপন হতভম্ব–। একি, মিস্টার বাসু! না-না, এ যে বঙ্কিমবাবু!
মামাবাবু বললেন, তুমি চেনো একে?
চিনি। তবে আলাপ নেই। স্যার, মানে ডক্টর তালকদারের কাছে আসতেন মাঝে মাঝে, দেখেছি। কিন্তু উনি?
হ্যাঁ, মিস্টার বাসুই ছদ্মবেশী বঙ্কিম হাজরা। উত্তর দিলেন মামাবাবু।
সবার মনেই উদগ্র কৌতূহল, কী করে তপন এই লোকটির খপ্পরে পড়ল। কিন্তু তখন আর এ-প্রশ্নের জবাব পাবার সুযোগ ছিল না।
