সঙ্গে সঙ্গে রসের পিস্তল সরব হয়ে উঠল। কিন্তু বেটাল হয়ে ফসকে গেল টিপ। পা হড়কে মাটিতে বসে পড়ল। পিস্তল ছিটকে গেল হাত থেকে। নিমেষে পকেট থেকে রিভলবার বের করে রসের মাথা তাক করে বললাম, এবার তোমাদের পালা। হাত তোলো। উঠে দাঁড়াও, নইলে–
ইতিমধ্যে সুনন্দ র্যাপসোকে লক্ষ্য করে রিভলবার বাগিয়েছে। মাথার ওপর হাত তুলে দাঁড়ানো দুই বন্দীর অবস্থা হল দেখবার মতো। রাগে লজ্জায় মুখ তাদের ভয়ঙ্কর হয়ে। উঠেছে।
মামাবাবুরা ফিরলেন একটু পরে। এই দৃশ্য দেখে তারা তো চমৎকৃত। মার্কো হেসে বলল, সাবাস ব্রাদার! নাঃ, তোমাদের যত নাবালক ঠাউরে ছিলাম তত নও। ঘুঘু দুটোকে আচ্ছা জব্দ করেছ।
মার্কো ওদের প্রশ্ন করল, “তোমরা নিশ্চয় জেনারেল ফ্র্যাঙ্কোর দলের পলাতক সৈন্য। বেড়ে ব্যবসা ধরেছ তো হে! টম, লোক দুটোকে বাঁধো।
মামাবাবুর আচরণে আমরা আশ্চর্য হলাম। তিনি র্যাপসের কাছে গিয়ে তার শার্ট পরীক্ষা করতে লাগলেন।
র্যাপসোর ছেঁড়া সস্তা খাকি প্যান্টের সঙ্গে অমন দামি নেভি-ব্লু শার্টখানা বেমানান বটে, কিন্তু তা নিয়ে অত মাথা ঘামাবার কী দরকার?
এ শার্ট কোথায় পেয়েছ? মামাবাবু কঠোর স্বরে প্রশ্ন করলেন।
কেন? র্যাপসো খেঁকিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করল।
দরকার আছে। ঠিক ঠিক জবাব দাও।
আমি কিনেছি।
বটে! বনের ভিতর দোকান আছে নাকি?
মামাবাবুর কণ্ঠে বিদ্রূপ–আবার পয়সা দিয়ে এত ছোট মাপের শার্ট কিনেছ! র্যাপসো নিরুত্তর।
মামাবাবু মার্কোকে বললেন, শার্টটা দেখেই আমার সন্দেহ হয়েছিল। ভীষণ চেনা-চেনা লাগছিল। বৈজ্ঞানিক সর্বজ্ঞ ফোটোতে ঠিক এমনি শার্ট পরে রয়েছেন। বুকের কাছে সাদা ফুল তোলা। তুমিও মিলিয়ে দেখ ফোটোর সঙ্গে।
মামাবাবু ব্যাগ থেকে ফোটো বের করলেন। আমরা দেখলাম–অবিকল সেই শার্ট।
মামাবাবু বললেন, আপাতত জানতে হবে এ শার্ট ও পেল কী করে এবং সর্বত্তকে ওরা কী করেছে? মনে হচ্ছে এরা সর্বজ্ঞর ওপর ডাকাতি করেছিল। দেখ চেষ্টা করে কথা বের করতে পারো কিনা।
মার্কো গম্ভীর বদনে ধীরেসুস্থে একটা সিগারেট ধরাল। তারপর মোলায়েম গলায়। বলল–মিস্টার র্যাপসো, বড়ই দুঃখের বিষয় তুমি এমন অসময়ে বোবা হয়ে গেলে। যাক এই রোগের দুটো দাওয়াই আমার মনে পড়েছে। দেখ কোনটি তোমাদের পছন্দ হয়।
প্রথম নম্বর, তোমাদের গ্রেফতার করে নিয়ে যাব এবং তারপর গভর্নমেন্টের হাতে সমর্পণ করব। বিদ্রোহী সৈন্য হিসেবে আশা করি তোমাদের ফাঁসিকাঠে ঝোলানো হবে। দ্বিতীয় নম্বর, তোমাদের দুটিকে নদীর ধারের ওই দুটো গাছে বেঁধে রাখব। গাছগুলো নিশ্চয় চেনা। বন্দী করে নিয়ে যাওয়া ঝামেলা। তাই দ্বিতীয় ওষুধটাই প্রথমে এক্সপেরিমেন্ট করা যাক।
দুই বন্দী ঘাড় ফিরিয়ে গাছ দুটো দেখল। স্পষ্ট দেখলাম তাদের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। কৌতূহল হল ওটা কী গাছ?
নদীতীরে কয়েকটি গাছ দাঁড়িয়ে। ছোট ছোট গাছ, সোজা সুরু গুঁড়ি। গুঁড়ির নিচের অংশে ডালপালা নেই। একটি বৈশিষ্ট্য লক্ষ করলাম যে, প্রত্যেক গাছের গোড়ার চারপাশে মাটিতে এক কণাও ঘাসের চিহ্ন নেই।
মার্কো এবার আমাদের উদ্দেশ্য করে বলল, ওই গাছের নাম পালো-সান্টো। দেখতে নিরীহ, কিন্তু আসলে অতি মারাত্মক। এই গাছের প্রত্যেকটি কাঠ হল কাঠপিঁপড়ের ডিপো। যে কোনো প্রাণী ওই গাছ স্পর্শ করলেই অগুনতি পিঁপড়ে তাকে তৎক্ষণাৎ আক্রমণ করবে। কয়েক ঘণ্টা ওই গাছের গায়ে বেঁধে রাখলে বাছাধনদের মুখে আশাকরি বাক্য ফুটবে। ইন্ডিয়ানরা এইভাবে তাদের অপরাধীদের শাস্তি দেয়। শুনেছি প্রায় আসামী অসহ্য যন্ত্রণায় উন্মাদ হয়ে যায়। কেউ কেউ মারাও যায়।
র্যাপসো ও রস হাউমাউ করে উঠল। সেনর, দয়া করুন। সব বলছি।
বেশ, বলো। আমরা ওই শার্ট লুট করে পেয়েছি।
কতদিন আগে?
সাত-আট মাস হবে।
একে চেনো? মামাবাবু সর্বজ্ঞর ফোটো বের করলেন।
হ্যাঁ হ্যাঁ, এই লোকেরই জিনিস।
কী করেছ তাকে? খুন?
না না। দুজনে সরবে আপত্তি জানায়। আমরা তার গায়ে হাত দিইনি। ও তখন ছিল । ওর জিনিস নিয়ে একজন ইন্ডিয়ান মাঝি নৌকোয় বসেছিল। তাকে ভয় দেখিয়ে আমরা কিছু খাবার আর পোশাক কেড়ে নিই।
সত্যি কথা? কড়া ধমক দেয় মার্কো।
সত্যি, মা মেরির দিব্বি।
তারপর? মামাবাবু প্রশ্ন করেন। তারা নৌকো নিয়ে কোন্ দিকে গেল?
তা জানি না। তবে মাঝিটা বলছিল, তারা নাকি পাহাড়ি ইন্ডিয়ানদের গ্রামের দিকে যাবে।
সে কোন দিকে?
এই নদীপথে কিছু এগিয়ে ডান পাশের এক শাখানদী ধরে গেলে পাহাড়ে পৌঁছনো যায়। তিন-চার দিনের পথ।
ওই দুজন আবার ফিরে এসেছিল এ-পথে? মামাবাবু জানতে চান।
না। পাহাড়ি ইন্ডিয়ানদের হাতে হয়তো মারা পড়েছে। ওই ইন্ডিয়ানরা দারুণ হিংস্র।
তোমরা ঠিক জানো?
হ্যাঁ। এই নদীতে আমাদের চোখ এড়িয়ে কেউ যাওয়া-আসা করতে পারে না। ডাক্তার কেন্ট ফিরেছিল, কিন্তু ওরা ফেরেনি।
মামাবাবু তীক্ষ্ণ স্বরে বললেন-তোমরা চেনো ডাক্তারকে?
চিনি, তবে আলাপ নেই। ডাক্তারকে এ-অঞ্চলে সবাই চেনে। ওদের কণ্ঠে বেশ সমীহ ফুটে ওঠে।
ভক্তার এ-পথে গিয়েছিল? মামাবাবু জানতে চান।
হ্যাঁ।
কবে?
ওরা চলে যাবার দুদিন পরে।
ডাক্তার ফিরল কবে?
তিন-চার দিন পরে।
বন্দী দুজনকে ছেড়ে দেওয়া হল।
মামাবাবু গম্ভীরভাবে একটা পাথরের ওপর বসলেন।
