সুনন্দ বলল, এগিয়ে যাক। বেশ দূর থেকে ফলো করব। নইলে দেখে ফেলতে পারে।
প্রতাপ রুদ্রের চলমান মূর্তি ক্রমে মাঠের মধ্য দিয়ে দূরে সরে যায়। তারপর ঢাল জটি নেমে চোখের বাইরে চলে গেল। তখন আমরা বেরিয়ে এলাম।
পা টিপে টিপে এগোচ্ছি। কখনও ঢিবি বা পাথরের আড়ালে দাঁড়িয়ে উঁকি মেরে দেখে নিচ্ছি। সূর্য অস্ত যাচ্ছে। সমস্ত পশ্চিম দিগন্তে সিঁদুর-বরন হয়ে উঠল। অপরূপ সেই দৃশ্য। প্রতাপবাবুকে শেষবারের মতো দেখলাম মাঠের মধ্যে সেই যে বিরাট বটগাছটা, তার নীচে। তারপর অদৃশ্য হলেন।
বেশ খানিকক্ষণ অপেক্ষা করলাম। বসে রইলাম পাথরের আড়ালে। আবার দেখলাম প্রতাপবাবু আবির্ভূত হয়েছেন।
গাছের কাছে একটা বড় চ্যাটালো পাথর পড়েছিল। বেদির মতো দেখতে। প্রতাপবাবু তার ওপর বসলেন। তার পিঠ আমাদের দিকে। গাছের দিকে মুখ। স্থিরভাবে বসে আছেন। আমরা খানিক কাছে এগিয়ে গেলাম।
অবাক হয়ে দেখলাম প্রতাপবাবু পাথরের ওপর সটান চিৎ হয়ে শুয়ে পড়লেন। চুপচাপ শুয়ে রয়েছেন নিথর হয়ে। আমরা আর একটু এগোলাম। প্রায় পঞ্চাশ হাত দূরে একটা পাথরের স্কুপের পিছনে ঘাপটি মেরে বসে খাঁজের ফাঁক দিয়ে লক্ষ রাখলাম প্রতাপ রুদ্রকে।
ক্রমে দিনের আলো একেবারে নিভে গেল। একটির পর একটি তারা জ্বলে উঠল আকাশপটে। ফিকে একটু চাঁদের আলো ফুটল। আবছা দেখা যাচ্ছে চারপাশ। সামনে বটগাছটাকে যেন ঘোর কালো পাথরে তৈরি একটা পাহাড়ের মতো দেখাচ্ছে। তার গায়ে অজস্র জোনাকি পোকার মিটিমিটে আলো ঘুরে ফিরে বেড়াচ্ছে। বাঁ পাশে দূরে মহুয়াডাঙা গ্রামখানির গাছপালার সীমারেখা আকাশের গায়ে ফুটে উঠেছে। গ্রামে কোনো আলো নেই। ভেসে আসছে না মাদলের আওয়াজ। মানুষের কণ্ঠধ্বনি বা কুকুরের ডাক। রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে এক অজানা বিভীষিকায় গোটা গ্রাম যেন বোবা হয়ে গেছে। পাথরের ওপর শায়িত প্রতাপ রুদ্রকে শুধু অস্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছি। ঠিক একই ভাবে তিনি শুয়ে আছেন। কদের মতলব কী? বোধহয় রাত আরও গম্ভীর হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন।
ঝিঁঝির একঘেয়ে রব ছাড়া অন্য কোনো শব্দ নেই। আমরা দুজনে কাঠের মতো বসে থাকি। প্রবল উত্তেজনায় বুকের ভিতর যেন হাতুড়ির ঘা পড়ছে, এবার কী ঘটবে? কী হবে এবার?
বেশিক্ষণ কাটেনি। হঠাৎ এক চিৎকার শুনলাম। মানুষের গলা। কিন্তু অদ্ভুত আওয়াজ। বুঝি রূদ্ধ আক্রোশ এবং আর্তনাদ মিশে আছে সেই স্বরে। তারপরই চ্যাঁ চ্যাঁ করে এক অপার্থিব টানা তীক্ষ্ণ শব্দে রাতের নিস্তব্ধতা খান খান হয়ে গেল। মনে হল, আমাদের উলটো দিকে প্রতাপবাবুর কাছ থেকে প্রায় পঁচিশ-ত্রিশ হাত দূরে সেই শব্দের উৎপিত্তস্থ
সঙ্গে সঙ্গে প্রতাপবাবু তড়াক করে লাফিয়ে উঠে শব্দ লক্ষ্য করে বেগে ছুটে গেলেন। সুনন্দ আমার হাত ধরে টানল–আয় কুইক।
প্রতাপ রুদ্রের হাতের জোরালো টর্চ জ্বলে উঠল। সেই আলোতে দেখলাম, একটা বড় পাথরের চাইয়ের পাশে দাঁড়িয়ে দানবের মতো একটা মূর্তি। কেশরের মতো ফাঁপানো চুলের রাশি তার মুখের অনেকটা ঢেকে ফেলেছে। ধড়াস করে উঠল হৃৎপিণ্ড। থমকে দাঁড়িয়ে পড়লাম। তারপর চিনতে পারলাম–বুনো। তার হাতে একটা বল্লম। বুনো মাত্র। দিকে তাকিয়ে আছে।
প্রতাপবাবুও মুহূর্তের জন্য থেমেছিলেন। তারপরই দৌড়ে গিয়ে বুনোর সামনে বসে পড়লেন। আমরাও হোঁচটা খেতে খেতে এগোলাম।
ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেখি প্রতাপবাবু মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে রয়েছেন আর তার ডান হাতের মুঠোয় ছটফট করছে কী একটা জীব। প্রতাপবাবুর বাঁ হাতের টর্চ আর ডান হাতের ওপর আলো ফেলল। আমি ভীষণ আশ্চর্য হয়ে চেঁচিয়ে উঠলাম, আরে, এ যে একটা বাদুড়!
বাদুড়টা ছোট্ট। শিয়ালের মুখের মতো দেখতে তার মুখ। দুটো চকচকে ড্যাবড্যাবে চোখ। খাড়া খাড়া কান। ছুঁচোলো কয়েকটা দাঁত হিংস্রভাবে বেরিয়ে আছে।
প্রতাপবাবু তার ডানা দুটো চেপে ধরেছেন। সে ক্রমাগত মুণ্ডু ঘুরিয়ে কামড়াবার চেষ্টা। করছে। আমাদের দেখে বুনো কর্কশ গলায় বলে উঠল, বাদুড়টো আমার গায়ে বসেছিল।
প্রতাপবাবু চমকে ফিরলেন। তাঁর টর্চের আলো পড়ল আমাদের মুখে–এ কী, তোমরা এখানে!
সুনন্দ উত্তর দিল, হ্যাঁ, আমরা। আশা করি চিনতে পারছেন। একটু অসময়ে দেখা হয়ে গেল।
তারপর প্রতাপবাবুর স্তম্ভিত দৃষ্টিকে অগ্রাহ্য করে সুনন্দ বলল, অসিত, এটা কিন্তু সাধারণ বাদুড় নয়, ভ্যাম্পায়ার ব্যাট। মিস্টার রুদ্র এবার আপনি
সুনন্দ আরও কী যেন বলতে যাচ্ছিল। রুদ্রের চাবুকের মতো প্রশ্ন তাকে থামিয়ে দিল।
–এটা ভ্যাম্পায়ার ব্যাটু তুমি জানলে কী করে? কে বলেছে?
–অনুমান, মিঃ রুদ্র, অনুমান। কাল অসিত আমায় ড্রাকুলার গল্প শোনাল। বলল। ড্রাকুলার মতো কোনো ভ্যাম্পায়ার নিশ্চয়ই মহুয়াডাঙার লোকের রক্ত শুষে খাচ্ছে। অমনি একটা সম্ভাবনার উদয় হল আমার মনে। ওসব ভুতুড়ে গল্প আমি বিশ্বাস করি না। কিন্তু একটা নতুন ক্ল মাথায় এল। ভূতপ্রেতপিশাচ নয়-বাদুড়। রক্তপায়ী বাদুড়। ভ্যামপায়ার ব্যাট। ভ্যামপায়ার ব্যাটের রক্ত পানের বর্ণনা আমি একটা বইয়ে পড়েছিলাম। মহুয়াডাঙার ঘটনাগুলোর সঙ্গে তা অদ্ভুতভাবে মিলে গেল। স্রেফ দুইয়ে-দুইয়ে চার।
আমি বললাম যাঃ, এখানে ভ্যাম্পায়ার ব্যাটু আসবে কোথা থেকে? ইমপসিবল।
