ঘরের দরজা খোলা ছিল?–সুনন্দ প্রশ্ন করে।
–না।
–আর জানলা?
–হ্যাঁ। একটা জানলা খোলা ছিল বটে।
বুনোকে কেউ দেখেছে নাকি কাছে-পিঠে?–আমি জানতে চাইলাম।
–উহুঁ। তবে ঢেঙা বলছে, বুনো কাল রাত অবধি জেগে বসেছিল তার উঠোনে। গাঁয়ের লোক ওকেই সন্দেহ করছে।
বুধন বুকের মধ্যে মুখ গুঁজে বসে রইল। বেচারা ভাইয়ের বিপদের আশঙ্কায় বড় মুষড়ে পড়েছে।
সুনন্দ বুধনকে জিজ্ঞেস করল, ওই যে ঝাউবাংলো, ওর মালিককে চিনিস?
–হুঁ। চিনি। লম্বা পারা মানুষ। কুকুর নিয়ে ঘোরে।
–আচ্ছা, ওই বাবু কাল রাতে তোদের গ্রামে গিয়েছিল?
–কই না তো!
–উনি মহুয়াডাঙায় গিয়েছেন কখনো?
–হ্যাঁ। গেছে অনেকবার।
–কী করতে যায়?
–চোখে নল লাগিয়ে পাখি দেখে।
–রক্তচোষার ব্যাপারে কিছু জানেন নাকি?
–তা তো জানিনা বাব। তবে একদিন দূর থেকে দেখেছি, ঢেঙামাঝির সঙ্গে কী সব কথা বলছিল।
বুধন চলে যেতে সুনন্দ বলল, প্রতাপ রুদ্র কাল রাতে মহুয়াডাঙার দিকে গিয়েছিলেন। কিন্তু গ্রামে ঢোকেন নি। কোথায় গিয়েছিলেন তবে? আশ্চর্য!
আমি উত্তর দিলাম–হয়তো মাঠে মাঠে পায়চারি করেছেন। লোকটি বেশ রহস্যময়।
হুঁ।-সুনন্দ একটু মাথা নাড়ে।
তখনও রোদের তেজ বাড়েনি। দুজনে বেড়াতে বের হলাম। ঝাউবাংলোর সামনে দেখি, প্রতাপ রুদ্র প্রাতঃভ্রমণ সেরে ফিরছেন। হাতে চেনে বাঁধা সেই বিরাট কুকুর।
সুনন্দ সোজা এগিয়ে গেল ভদ্রলোকের দিকে। অমনি বাঘের মতো কুকুরটা গরগর করে উঠে চেনে টান দিল। থমকে দাঁড়াল সুনন্দ। প্রতাপ রুদ্রকে উদ্দেশ্য করে বলল, নমস্কার। আমরা এখানে বেড়াতে এসেছি। আপনাকে প্রায়ই দেখি। এটা কী জাতের কুকুর জিজ্ঞেস করব ভাবি।
রুদ্ৰ স্থির চোখে কয়েক মুহূর্ত সুনন্দের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। কী তীক্ষ্ণ দৃষ্টি! আবার একটু কৌতুকের আভাস রয়েছে যেন। সুনদর অবস্থা দেখে মজা পেয়েছেন। সুনন্দ কাঠের মতো দাঁড়িয়ে। বারবার আড় চোখে কুকুরটাকে দেখছে।
আপনি কুকুর ভালবাসেন?–ভরাট কণ্ঠস্বর।
–আজ্ঞে হ্যাঁ।
–এটা ম্যাস্টিফ।
ওঃ, দারুণ কুকুর! আচ্ছা আপনি তো অনেক জন্তু-জানোয়ার পুষেছেন, দেখাবেন আমাদের? সুনন্দ আলাপ জমাবার চেষ্টা করল।
প্রতাপ রুদ্রের মুখে কিন্তু কোনো আগ্রহ ফোটে না। আমাদের আর এক প্রস্থ আপাদমস্তক দেখলেন। তারপর বললেন, দেখাতে পারি এক শর্তে।
–কী?
–মাত্র একবার দেখাব এবং আর কাউকে জুটিয়ে আনা চলবে না। কাউকে এ খবর বলাও চলবে না। লোকজন এলে আমার কাজের ক্ষতি হয়।
বেশ তাই হবে।–সুনন্দ তৎক্ষণাৎ রাজি।
আসুন।–প্রতাপ বাবু আহ্বান জানালেন।
নেপালি দরোয়ান গেট খুলে দিল। আমরা ভিতরে ঢুকলাম। একজন পরিচারক এসে। নীরবে প্রতাপবাবুর কাছ থেকে কুকুরটা নিয়ে বাড়ির দিকে চলে গেল। পরিচারকটি এ দেশীয় নয়। দারুণ যণ্ডামার্কা জোয়ান। কাকর-বিছানো পথ ধরে চলতে চলতে রুদ্র জেনে নিলেন আমাদের পরিচয়।
প্রতাপবার একটু ঠাট্টার সুরে বললেন, আমাদের কালেকশনে কিন্তু বাঘ-সিংহ নেই। সবই ছোট জীবজন্তু। সাধারণত যে সব পশু-পাখি কেউ পোযে না, আমি তাদের পোষ মানাবার চেষ্টা করি। ওদের চরিত্রের খুঁটিনাটি স্টাডি করি।
আমরা বাগানের ভিতরে চললাম। বাগানের এক জায়গায় পর পর পনেরো-ষোলটা বড় বড় খাঁচা। খাঁচাগুলো তারের জালে ঘেরা। মাথায় খড়ের চাল। কোনোটাতে রয়েছে। জন্তু, কোনোটায় পাখি। ঠিক কলকাতা চিড়িয়াখানায় যেমন দেখেছি, তেমনি করে রাখা। হয়েছে জীবজন্তু।
প্রতাপ রুদ্র একটার পর একটা খাঁচার সামনে দাঁড়িয়ে চিনিয়ে দিতে লাগলেন। লোকটির চেহারা ও কথাবলার ভঙ্গিতে জোরালো ব্যক্তিত্বের ছাপ।
এক ফাঁকে তিনি বললেন, আমি বয়সে অনেক বড়। আশা করি তুমি বললে আপত্তি নেই।
আমরা সরবে জানালাম–না না আপত্তির কী আছে?
প্রতাপ রুদ্র দেখাতে থাকেন, এই এক জোড়া ডিঙ্গো। অস্ট্রেলিয়ার বুনো কুকুর। কিছুতেই পোষ মানে না। তবে আমি কিছুটা বাগ মানাতে পেরেছি।
তিনি পকেট থেকে বিস্কুট বের করে খাঁচার ভিতর ছুঁড়ে দিলেন। অনেকটা আমাদের দেশি কুকুরের মতো চেহারা। মেটে লাল রঙের ডিঙ্গো দুটো বিস্কুট খেয়ে লেজ নাড়তে লাগল। তারপর রুদ্র দেখালেন, এই হচ্ছে অস্ট্রেলিয়ার কোয়ালা।
প্রাণীটি ঠিক যেন ক্ষুদে ভালুক। রুদ্র বললেন, এ ভাল্লুক নয়। ভাল্লুক স্তন্যপায়ী। এরা মারসিউপিয়ান। অর্থাৎ পেটের তলায় থলিতে বাচ্চা বয়ে বেড়ায়। যেমন ক্যাঙ্গারু।
একটা খাঁচার সামনে দাঁড়াতেই কালো-সাদা নোমওলা বেঁজি জাতীয় দুটো জন্তু দাঁত খিঁচিয়ে উঠল। রুদ্র বললেন, উদ্ভারিন। উত্তর আমেরিকার বেঁজি। খুব হিংস্র।
এরপর দেখলাম, মাদাগাস্কারের লেমুর ও শ্লথ। আফ্রিকার বনবিড়াল। দক্ষিণ আমেরিকার ধেড়ে ইঁদুর এগুটি ইত্যাদি নানা অদ্ভুত জন্তু।
তারপর পাখি। কতরকম রঙবেরঙের পাখি। বেশির ভাগেরই নাম শুনিনি। কোনোটা ভারি সুন্দর শিস দিচ্ছে। গাছের ছায়ায় দাঁড়ের ওপর সরু চেন পা বাঁধা এক কাকাতুয়া বসে ছিল। তার গায়ের পালক ধবধবে সাদা মাথায় হলদে ঝুঁটি। কালো বাঁকা ঠোঁট। আমরা কাছে যেতে চোখ পাকিয়ে তড়বড় করে পরিষ্কার গলায় বলতে লাগল গুড মর্নিং, গুড মর্নিং। নমস্কার, নমস্কার।
রুদ্র বললেন, ও তাক বুঝে মানুষের ভাষা ব্যবহার করতে শিখেছে।
