আছে।
কিন্তু তোমার চাকরি? ছুটি পাবে?
তা সত্যি। তপন দমে গেল। নতুন চাকরি। ছুটি কি আর দেবে?
দত্তদা উঠে এসে তপনের পিঠে হাত রেখে বললেন, দুঃখ কোরো না ভাই। যার অজানাকে জানবার ইচ্ছে আছে, বিপদে ঝাঁপ দেবার সাহস আছে, তার বরাতে অ্যাডভেঞ্চার ঠিক জুটে যায়। জীবনভোর সামনে দিয়ে কত রোমাঞ্চের সুযোগ পেরিয়ে যায়। কেউ তা দেখে এড়ায়। আর যে তাকে ধরতে চায়–ঠিক ধরে। তাই বলছি, হতাশ হয়ো না।
ধরুন যদি ছুটি পাই?
নিশ্চয়ই নেব তোমায়। খুশি হয়ে নেব। তোমার খরচাও কিছু লাগবে না। সে ভার আমার, বললেন দত্তদা।
.
দুপুরে গোবিন্দ সিংকে ব্যাপারটা বলল তপন।
একটুক্ষণ চুপ করে থেকে সিংজি বললেন, তুমি সত্যি যেতে চাও?
হ্যাঁ। অবশ্য যদি ছুটি পাই। সবে জয়েন করেছি—
গোবিন্দ সিং-এর দাড়ি-গোঁফ ভরা মুখে বিচিত্র হাসি ফুটল। তিনি বললেন, বেশ, ছুটি তুমি পাবে। যাও। তোমার উৎসাহ দেখে আমি খুশি হয়েছি। এই তো দেখার বয়স। তোমার চেয়েও কম বয়সে আমি ঘর ছেড়েছি। কত দেশ ঘরেছি। কত কী দেখলাম। এখনো ইচ্ছে করে বেরিয়ে পড়তে, কিন্তু আর তাগদ নেই। তবে হ্যাঁ, বৃদ্ধের পরামর্শ নাও তো বলি। রোজগার করাও দরকার। তাই চোখ-কান খোলা রাখবে। কোথায় কী রোজগারের ধান্দা জেনে নেবে।
একটা ঘটনা বলি শোনো। তখন আমার বয়স তিরিশ। ব্যাটাভিয়ায় এক রবার বাগানে কাজ করি। এক ফিলিপিনোর সঙ্গে ভাব হল। ফিলিপিনো জিপ একদিন বলল যে, সে টরেস্স্ট্রেটে একটা ডুবে-যাওয়া জাহাজের খোঁজ পেয়েছে, তাতে অনেক দামি মাল আছে। একজন পার্টনার পেলে সে জাহাজটা খুঁজে দেখে। টরে-স্ট্রেট কোথায় জানো? অস্ট্রেলিয়া আর নিউগিনির মাঝখানে। ওখানে অগুনতি দ্বীপ আর ডুবো পাহাড়। রাজি হয়ে গেলাম। চলে গেলাম ওর সঙ্গে। একটা মোটর-বোট ভাড়া করলাম। ডুবুরির পোশাক কেনা হল। জিপই শেখাল আমায় সমুদ্রে ডাইভিং। জাহাজটা খুঁজেও পেলাম। খুব অ্যাডভেঞ্চার হল। আবার দু-পয়সা রোজগারও হয়ে গেল।
কী পেয়েছিলেন জাহাজটায়? তপনের ভারি আগ্রহ।
খুব দামি কিছু নয়। তবে অনেক রুপোর জিনিস ছিল। তাই বলছি, অ্যাডভেঞ্চারের সঙ্গে পয়সার মতলবটাও ছেড়ো না। যদি কিছু মেলে মন্দ কী? জাহাজটা পেলাম ভালো, না পেতেও পারতাম।
আচ্ছা, তোমরা সিঙ্গাপুর হয়ে যাবে নিশ্চয়ই? ওখানকার এক পার্টি অনেকদিন ধরে আমায় মাল পাঠাচ্ছে না। চিঠি দিচ্ছি, উত্তর নেই। ঠিকানা দিয়ে দেব। ওদের সঙ্গে দেখা করে, কথা বলবে। আমি নিজেই একবার সিঙ্গাপুর যাব ভাবছিলাম। তুমিই ভারটা নাও। তাহলে ছুটির মাইনেটা পাবে।
তপন তক্ষুনি ফোন করল, দত্তদা, ছুটি মিলেছে। আমি যাচ্ছি।
.
ব্যাংকক থেকে রওনা হয়ে বর-কয়েক প্লেন বদল করে তপনরা পৌঁছল নিউগিনির উত্তর ভাগে সোবরাং বন্দরে। সোবরাং থেকে লঞ্চে ডেম্পিয়ার প্রণালী পেরিয়ে ওয়াইজিওর দক্ষিণ তটে মুকা গ্রামে হাজির হল।
মুকা ছোট্ট গ্রাম। সামনে সমুদ্র পিছনে চাষের ক্ষেত। তারপর বনজঙ্গল। একটি পাতা-ছাওয়া মাটির কুটিরে ওরা আস্তানা করল। এর চেয়ে ভালো ব্যবস্থা ওখানে সম্ভব নয়। দত্তদা ডনকে বললেন, খবর নাও, জন ডিক্সনকে কেউ চেনে কিনা? দেখ এমন কাউকে পাও কিনা যে ডিক্সনের সঙ্গে মেমেন আইল্যান্ডস, এ গিয়েছিল।
আগস্ট মাস। রাতে একদিন বৃষ্টি হল। ঘরের চাল চুঁইয়ে জল পড়ে। মশার প্রচণ্ড উৎপাত। রাতে ভালো ঘুম হয় না। তপন টের পেতে শুরু করল অ্যাডভেঞ্চারের ধকল। এ তো কলির সন্ধে। এখনো আসল অভিযানটাই বাকি। দত্তদা ও ডন কিন্তু নির্বিকার। কোনো অসুবিধাতেই তাদের যেন ভ্রূক্ষেপ নেই।
মুকার অধিবাসীরা মালয় ও পাপুয়ান জাতের মিশ্রণ। বছরের অনেকখানি সময় এরা সমুদ্রে ঘুরে বেড়ায়। মাছ, কাঁকড়া, কচ্ছপ ইত্যাদি ধরে। জংলি দ্বীপ থেকে ফল-পাকুড় সংগ্রহ করে আনে।
চারদিন কেটে গেল। ডিক্সনকে দেখেছে এমন দু-চারজনের খোঁজ মিললেও ওর সঙ্গে সমুদ্রযাত্রা করেছে তেমন কারও সন্ধান পাওয়া গেল না। দত্তদা অধীর হয়ে উঠলেন। জানালেন–আর দু-তিন দিন দেখব। কাউকে না পেলে গাইড ছাড়াই রওনা দেব।
চ্যাং বা জিয়ানের কোনো খবর মেলেনি। তবে একজন জেলে জানাল যে দুজন বিদেশিসহ একটা নৌকোকে তারা আমাহেরার দিক থেকে মেস্মনের দিকে যেতে দেখেছে।
ডন একটি বছর কুড়ির যুবককে দত্তদার কাছে নিয়ে এল। বলল, এ নাকি জানে ডিক্সন কোন্ দ্বীপে গিয়েছিল। এর নাম আলী। ও মালয় জানে।
তুমি ডিক্সন সাহেবের সঙ্গে গিয়েছিলে? দত্তদা মালয় ভাষায় আলীকে জিজ্ঞেস করলেন।
না। আমার বাবা গিয়েছিল। আমি বাবার কাছে গল্প শুনেছি, উত্তর দিল আলী।
তোমার বাবা কোথায়?
বাবা সমদ্রে বেরিয়েছে। কবে ফিরবে ঠিক নেই। মাস দুইয়ের আগে নয়।
বাবা তোমায় বলেছে, ডিক্সন কোন দ্বীপে গিয়েছিল?
আলী বলল, ঠিক কোন দ্বীপটায় বলেনি বাবা। সাহেবের বারণ ছিল বলতে। বাবা শুধু বলেছিল, মোরগ দ্বীপ থেকে সোজা পুবে, খানিক খোলা সমুদ্র পেরিয়ে ফের অনেকগুলো দ্বীপ। সেখানে কাছাকাছি একজোড়া দ্বীপ। তারই একটায় গিয়েছিল তারা।
দত্তদা ডনকে বললেন, বুঝেছ, মেসমন আইল্যান্ডস-এর কথা বলছে। জোড়া দ্বীপ এইখানেই হবে। মেস্মনের পশ্চিমে কয়েকটা দ্বীপ আছে, তারই একটা নিশ্চয়ই মোরগ। দ্বীপ।
