আমরা নিজেদের Lords of Creation বা আদি পুরুষ পদে ভাবতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি; গুহামানবের মতো সিংহ, বাঘ, বিরাটকায় হস্তীসদৃশ কোনো প্রাণী বা বন্য শূকরের ভয়ে ভীত হওয়ার আর দরকার করে না আমাদের। আমরা একে অপরকে যে ভয় পাই সেটা বাদ দিয়ে ধরলে নিজেদের নিরাপদই বোধ করি। কিন্তু বৃহৎ জন্তুরা আমাদের অস্তিত্বের জন্য আর হুমকি না হলেও, ক্ষুদ্র জন্তুদের সম্পর্কে সে কথা বলা চলে না। এই গ্রহের প্রাণের ইতিহাসে পূর্বে বৃহৎ জন্তুরা ক্ষুদ্র জন্তুদের একবার জায়গা ছেড়ে দিয়েছিল। বহুকাল ডাইনাসোর নিরুদ্বেগভাবে জলাশয় ও বনে-জঙ্গলে ঘুরে বেড়িয়েছে, একটা ডাইনাসোরের অপর একটা ডাইনাসোরকে ভয় করা ছাড়া তাদের আর কোনো ভয়ের ব্যাপার ছিল না। সংশয় ছিল না যে তাদের সাম্রাজ্য নিরঙ্কুশ। মূষিক, ক্ষুদ্র সজারু, ইঁদুরের চেয়ে বড় নয় এমন ক্ষুদ্র ঘোড়া, প্রভৃতি ক্ষুদ্র স্তন্যপায়ী প্রাণীদের জায়গা করে দিয়ে ডাইনাসোর এক সময় বিলুপ্ত হয়। ডাইনাসোরের বংশ কেন ধ্বংস হয় তা জানা যায় না, তবে মনে করা হয় যে ঐ অতিকায় প্রাণীর মাথার মগজ ছিল খুবই সূক্ষ্ম, এবং শিকারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের জন্য অসংখ্য শিং গজানোর কাজে নিজেকে নিয়োজিত করে। ঘটনা যাই হোক, ডাইনাসোরের ধারা অনুসরণ করে জীবনের বিকাশ ঘটেনি।
স্তন্যপায়ী প্রাণী নিরঙ্কুশ প্রাধান্য পাবার পর আকারে বাড়তে লাগল। কিন্তু হস্তীসদৃশ অতিকায় প্রাণীর বিলুপ্তি ঘটেছে। অন্যান্য বৃহৎ আকৃতির প্রাণীও বিরল হয়ে এসেছে। ব্যতিক্রম শুধু মানুষ এবং মনুষ্য-কর্তৃক বশীভূত প্রাণীরা। মানুষ ক্ষুদ্রাকৃতি হলেও বুদ্ধি দ্বারা সফলতার সঙ্গে বিরাট জনসংখ্যার পুষ্টির ব্যবস্থা করেছে। মানুষ নিরাপদ, তবে ক্ষুদ্রকায় প্রাণী, কীট-পতঙ্গ এবং অণুজীব থেকে নয়।
কীট-পতঙ্গাদির প্রাথমিক সুবিধা এই যে, এদের সংখ্যা অগণন। সারা পৃথিবীতে যত মানুষ রয়েছে সেই সংখ্যক পিপীলিকা একটি ক্ষুদ্র বনে সহজেই বাস করতে পারে। কীট-পতঙ্গ আরো একটা সুবিধা ভোগ করে, এরা আমাদের খাদ্য পরিপক্ক হওয়ার আগেই ভক্ষণে সক্ষম। অনেক অনিষ্টকর কীট-পতঙ্গ অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র ভূখণ্ডে বসবাসে অভ্যস্ত ছিল, মানুষ এদের বিনা অভিপ্রায়ে নতুন পরিবেশে স্থানান্তর করে, সেখানে এরা অশেষ ক্ষতিসাধন করেছে। কীট-পতঙ্গ এবং অণুজীবের জন্য ভ্রমণ ও বাণিজ্য অত্যন্ত জরুরি। হলুদ জ্বর আগে শুধু পশ্চিম আফ্রিকায় দেখা গেছে, ক্রীতদাস ব্যবসা এই জ্বর পশ্চিম গোলার্ধে বহন করে আনে। বর্তমানে আফ্রিকার দরজা উন্মুক্ত হওয়ার ফলে ঐ জ্বর ক্রমান্বয়ে উক্ত মহাদেশ পেরিয়ে প্রাচ্যের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। পূর্ব উপকূলে পৌঁছলে এই জ্বর ভারত ও চিনের বাইরে রাখা সম্ভব হবে না। এবং এই জ্বর দেশ দুটির জনসংখ্যার অর্ধেক কমিয়ে ফেলতে পারে বলে আশংকা করা যায়। নিদ্রারোগ সমধিক মারাত্মক আফ্রিকান ব্যাধি, এবং এই রোগ ক্রমান্বয়ে বিস্তারিত হচ্ছে।
সৌভাগ্য এই যে, বিজ্ঞান একটি উপায় উদ্ভাবন করেছে, যা দিয়ে ক্ষতিকর কীট পতঙ্গ দমন করা সম্ভব। অধিকাংশ কীট-পতঙ্গ পরান্নভোজীর হাতে প্রাণ হারায়, যারা বেঁচে যায় তারা গুরুতর কোনো সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে না। আর কীটতত্ত্ববিদগণ এই ধরনের পরান্নভোজী নিয়ে গবেষণা এবং এদের বংশবিস্তার করে চলেছেন। এদের কার্যকলাপের সরকারি প্রতিবেদন অত্যন্ত কৌতূহলোদ্দীপক; প্রতিবেদনে এ ধরনের বাক্যের সমাবেশ থাকে: ত্রিনিদাদের চাষিদের অনুরোধক্রমে তিনি ব্রাজিল যান ইক্ষুর Froghopper কীটের জৈবশত্রু খোঁজার জন্য। আপনি হয়তো বলবেন প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ইক্ষুর Froghopper-এর কোনো সুযোগই থাকবে না। দুর্ভাগ্যক্রমে যুদ্ধ যতদিন চলবে বৈজ্ঞানিক জ্ঞান দুদিকেই কাটবে বা দুমুখো হবে। উদাহরণত সদ্যপ্রয়াত প্রফেসর ফ্রিৎস হেবার নাইট্রোজেন গ্যাস নিয়ন্ত্রণ বা ব্যবহারের উপায় উদ্ভাবন করেন। তার সাধ ছিল এই গ্যাস ব্যবহার করে জমির উর্বরাশক্তি বৃদ্ধি করবেন। কিন্তু জার্মান সরকার উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরক তৈরির জন্য এটা ব্যবহার করেন এবং সম্প্রতি হেবার সাহেবকে নির্বাসনে পাঠিয়েছিলেন। কারণ তিনি বোমা নয় জমিতে প্রয়োগযোগ্য সার উৎপাদনে অধিক আগ্রহী ছিলেন। পরবর্তী মহাযুদ্ধে এক পক্ষ অপর পক্ষের শস্যক্ষেত্রে ক্ষতিকর কীট লেলিয়ে দেবে এবং যুদ্ধ শেষে এই কীট দমন কঠিন কাজ হয়ে দাঁড়াবে। আমরা যত বেশি জানব, আমরা একে অপরের ততবেশি ক্ষতি করতে পারব। মানুষ যদি একে অপরের প্রতি ক্রোধবশত কীট-পতঙ্গ এবং অণুজীবদের সাহায্য গ্রহণ করে, এবং আরো একটা মহাযুদ্ধ সূচিত হলে তারা তা করবে, তাহলে এটা কোনো মতেই অসম্ভব নয় যে শেষ পর্যন্ত প্রকৃত বিজয়ী পক্ষ হবে একমাত্র কীট-পতঙ্গেরা। হয়তো মহাজাগতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দুঃখিত হবার কিছু নেই; কিন্তু মানুষ হিসেবে আমি নিজ প্রজাতির জন্য দীর্ঘশ্বাস না ছেড়ে পারি না।
.
অধ্যায় ১২ — শিক্ষা ও শৃঙ্খলা
যে-কোনো গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাতত্ত্বের দুটি দিক থাকতে হবে; জীবনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে একটি ধারণা এবং মনস্তাত্ত্বিক গতিবিদ্যার বিজ্ঞান অর্থাৎ মনের অবস্থার পরিবর্তনের বিধি। যদি দুজন ব্যক্তি জীবনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে ভিন্নমত পোষণ করেন তবে তারা শিক্ষা সম্পর্কেও একমত হওয়ার প্রত্যাশা করতে পারেন না। গোটা পাশ্চাত্য সভ্যতায় শিক্ষাযন্ত্র দুটি নৈতিকতত্ত্ব দ্বারা শাসিত হচ্ছে: খ্রিস্টধর্ম এবং জাতীয়তাবাদ। গুরুত্ব দিয়ে বিচার করলে দেখা যাবে এই দুটি ব্যাপার সহাবস্থান করতে পারে না। এবং এটা জার্মানিতে ক্রমান্বয়ে পরিষ্কার হচ্ছে। নিজের সম্পর্কে বলতে পারি এই দুটি ব্যাপার। যেখানে বিভিন্ন সেখানে খ্রিস্টধর্মের প্রতিই আমি পক্ষপাতী হবো। যেখানে অভিন্ন সেখানে দুটিই প্রমাদযুক্ত বলে আমার ধারণা। শিক্ষার উদ্দেশ্য হিসেবে যে ধারণা আমি বিকল্প হিসেবে পেশ করতে চাই তাহলে সভ্যতা। এবং সভ্যতাকে আমি যে অর্থে বুঝে থাকি তার সংজ্ঞা অংশত ব্যক্তিকেন্দ্রিক, অংশত সামাজিক। ব্যক্তির ক্ষেত্রে এতে অন্তর্ভুক্ত হলো বুদ্ধিগত ও নৈতিক গুণাবলি: বুদ্ধিগত দিক থেকে সুনির্দিষ্ট ন্যূনতম সাধারণ জ্ঞান, নিজের পেশা সম্পর্কে বাস্তবিক দক্ষতা এবং সাক্ষ্যনির্ভর মতামত গঠনের অভ্যাস; নৈতিক দিক থেকে, পক্ষপাতহীনতা, সদয়ভাব, এবং কিছুটা আত্ম-নিয়ন্ত্রণ। এর সঙ্গে আমি আরো একটা গুণ যোগ করব, যা নৈতিকও নয়, বুদ্ধিগতও না। সম্ভবত তা শারীরতাত্ত্বিক: জীবনের প্রতি আগ্রহ ও আনন্দ। সম্প্রদায়সমূহের কাছে সভ্যতা আইনের প্রতি শ্রদ্ধা দাবি করে, মানুষের সঙ্গে মানুষের কারবারে ন্যায় প্রতিষ্ঠা চায়; এবং এমন লক্ষ্য নির্ধারণ যাতে মানবজাতির কোনো অংশত স্থায়ী ক্ষতি সাধিত না হয়। এবং উপায় ও উপেয়র মধ্যে খোঁজে বুদ্ধিমান অভিযোজন।
