কারখানা এবং ক্ষুদে বাড়ির সারি থেকে আধুনিক জীবনের কৌতূহলোদ্দীপক অসামঞ্জস্য বোঝা যায়। বৃহৎ গোষ্ঠী সমূহের কাছে উৎপাদনই হয়ে দাঁড়িয়েছে একমাত্র ভাবনার ব্যাপার, যেখানে রাজনীতি এবং অর্থনীতির বাইরের সবকিছু সম্পর্কে আমাদের সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গি রূপ নিয়েছে অধিকতর ব্যক্তি-ইচ্ছা-নির্ভর। এটা কেবল শিল্প এবং সংস্কৃতির ব্যাপারেই সত্য নয়, যেখানে আত্মপ্রকাশের তাড়না ঐতিহ্য এবং প্রথার বিরুদ্ধে বিশৃঙ্খল বিদ্রোহ পরিচালিত করেছে, এবং-হয়তো জনতার ভিড়ের জন্য-সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের ক্ষেত্রেও সত্য, আরো সত্য সাধারণ নারীর ক্ষেত্রে। কারখানায় বাধ্য হয়েই সামাজিক জীবন যাপন করতে হয়, এজন্যই সৃষ্টি হয়েছে ট্রেড ইউনিয়ন। আমি নিজের মধ্যে গুটিয়ে থাকি, মহিলারা বলেন; এবং তাদের স্বামীরা ভাবেন তারা বাড়িতে গৃহকর্তার ফেরার অপেক্ষায় বসে থাকবে। এজন্য মহিলাদের সহ্য করতে হয়, এমনকি তারা পছন্দও করে, পৃথক ছোট বাড়ি, পৃথক ছোট রান্নাঘর, গৃহকর্মের জন্য পৃথকভাবে খাটুনি, এবং বাচ্চারা বিদ্যালয়ে না থাকলে তাদের পৃথকভাবে সেবাযত্ন করা। পরিশ্রম কঠোর, জীবন একঘেয়ে, আর মহিলারা নিজের বাড়িতেই কারাবন্দী; তবু, এসব তার স্নায়ুর উপর চাপ সৃষ্টি করলেও, গোষ্ঠীজীবনের চেয়ে এটাই তার পছন্দ। কারণ স্বতন্ত্র থাকলে আত্ম-সম্মানে ঘা লাগে না।
এই ধরনের স্থাপত্যকর্মের প্রতি পক্ষপাতের সঙ্গে মহিলাদের মর্যাদা যুক্ত। নারী আন্দোলন এবং ভোট সত্ত্বেও স্ত্রীদের অবস্থা, অন্তত শ্রমজীবী শ্রেণিতে, আগের থেকে মোটেই পরিবর্তিত হয়নি। স্ত্রী এখনও স্বামীর উপার্জনের উপর নির্ভর করে এবং সে কঠোর পরিশ্রম করলেও মজুরি পায় না। পেশাগতভাবে গৃহকত্রী বলে সে সংসার চায়, সংসারকর্ম পছন্দ করে। ব্যক্তিগত উদ্যোগে কাজ করার সুযোগের ইচ্ছা, যা অধিকাংশ মানুষের থাকে, তাকে বাড়িতেই তৃপ্ত করতে হয়। আর স্বামী এই অনুভূতি উপভোগ করে যে স্ত্রী তার জন্য কাজ করে এবং অর্থনৈতিকভাবে তার উপর নির্ভরশীল। উপরন্তু তার স্ত্রী, তার বাড়ি, তাকে সম্পত্তি থাকার সুখ দেয় যা ভিন্ন ধরনের স্থাপত্যকর্মে সম্ভব হতো না। বৈবাহিক অধিকারচেতনা থেকে স্বামী ও স্ত্রী উভয়ে, সামাজিক জীবনের বাসনা কখনো পোষণ করলেও, এই ভেবে খুশি থাকে যে যাক অপর কোনো সম্ভাব্য বিপজ্জনক বিপরীত লিঙ্গ ব্যক্তির সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ কমই। অতএব তাদের জীবন অচলায়তনে আবদ্ধ হলেও এবং স্ত্রীর খাটুনি অযথা বেশি হলেও কেউ সামাজিক জীবনের জন্য ভিন্ন কোনো সংস্থা বাসনা করে না।
এসবই পরিবর্তিত হতো, যদি ব্যতিক্রম না হয়ে নিয়ম হতো যে বিবাহিত মহিলা বাড়ির বাইরে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করবে। পেশাদার শ্রেণিতে ইতোমধ্যে অনেক স্ত্রী স্বাধীনভাবে কাজ করে অর্থ উপার্জন করছে। মহিলাদের দরকার হলো আনুষঙ্গিক সুবিধাসহ ফ্লাট-বাড়ি কিংবা গোষ্ঠীভিত্তিক রান্নাঘর, যাতে আহার্য সম্পর্কে তাকে ভাবতে না হয়, তাছাড়া দরকার নার্সারি স্কুল, যাতে অফিসের সময়ে সন্তানের দায়িত্ব নার্সারি স্কুল পালন করতে পারে। বিবাহিত মহিলা প্রয়োজনে বাড়ির বাইরে কাজ করছে এতে দুঃখিত হবার কথা এবং দিনের শেষে যদি তাকে এমন কাজ করতে হয় যা সাধারণ মহিলারা করে থাকে (চাকুরিজীবী নয়), তাহলে তার উপর কাজের বোঝাটা একটু বেশিই হবে। কিন্তু স্থাপত্যকর্ম সঠিক হলে মহিলারা গৃহস্থালি কর্ম, সন্তানের দেখাশোনার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পাবে। এতে তার স্বামীর, সন্তানাদির সুবিধা হবে এবং সেক্ষেত্রে স্ত্রী ও মাতাদের চিরাচরিত কাজের বিকল্প হিসেবে পেশাদারী কাজ দিলে সুস্পষ্ট লাভ পাওয়া যাবে। সেকেলে ফ্যাশনের স্ত্রীর স্বামীরা এটা মেনেও নেবে যদি তাদের বেশি নয়, কেবল এক সপ্তাহের জন্য স্ত্রীর কাজগুলো করতে হয়।
শ্রমজীবী ব্যক্তির স্ত্রীর কাজ আধুনিক করা হয় নি কারণ কাজের জন্য পারিশ্রমিক মেলে না। অথচ বাস্তবে অধিকাংশ কাজই অদরকারি, বাকি কাজের অধিকাংশ বিভিন্ন বিশেষজ্ঞের মধ্যে বণ্টন করে দেয়া যেতে পারে। এবং এটা যদি করতে হয় তাহলে প্রথম যে সংস্কার কর্মটি হাতে নিতে হবে তা হলো স্থাপত্যকর্ম সংস্কার। সমস্যাটা হলো, সেই একই গোষ্ঠীগত সুবিধা অর্জন যা মধ্যযুগের মঠ-আশ্রমে ছিল, কিন্তু ব্রহ্মচর্য পালন ছাড়াই। অর্থাৎ শিশুদের প্রয়োজন মেটানোর ব্যবস্থা থাকতে হবে।
আমরা প্রথমে বিবেচনা করে দেখবো কী কী অহেতুক অসুবিধা বর্তমান ব্যবস্থায় রয়েছে। যেখানে প্রত্যেক শ্রমজীবীর সংসার স্বয়ম্ভু, তা সে পৃথক বাড়িতে হোক বা বড় অট্টালিকার ফ্লাটে হোক।
গুরুতর অকল্যাণ হয় সন্তানদের। স্কুলে যাওয়ার বয়স হওয়ার আগে রোদ-বাতাস তারা কমই পায়; মা যে খাবার দেয় তাই তাদের খেতে হয়,-যে মা দরিদ্র, অজ্ঞ, অতিব্যস্ত এবং বয়স্কদের জন্য এক রকম, ছোটদের জন্য অন্যরকম আহার্য সংস্থানে অসমর্থ। মা রান্না বা গৃহের অন্যান্য কাজের সময় তারা নিয়তির উপদ্রব করে, এতে মায়ের মন বিগড়ে যায়, তার স্নায়ুতে চাপ পড়ে, ফলে তাদের শাস্তি পেতে হয়। শাস্তি পাবার পর তারা হয়তো আদরও পায়; এই ছেলেদের কখনো স্বাধীনতা থাকে না। মুক্ত জায়গা এবং উপযুক্ত পরিবেশ পায় না যেখানে তাদের স্বাভাবিক কার্যকলাপ নির্দোষ বলে গণ্য হবে। পরিস্থিতির দরুন তারা দুর্বল হয়ে পড়ে, স্নায়ুরোগে ভোগে এবং তাদের স্বভাব হয় নতজানু প্রকৃতির।
