তিনি শ্রদ্ধার সঙ্গে বললেন ‘আমি কখনই তা বলছি না’, ‘অনেক ব্যাপারেই সম্রাট আমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ, শুধু নৌবাহিনী বা সামরিক ব্যাপারেই নয়। তারচেয়েও আপনার গভীর জ্ঞান আছে বিজ্ঞানে। আমি বহুবার অবাক হয়ে শুনেছি সম্রাট কি চমৎকার ভাবে ব্যারোমিটার, বেতার টেলিগ্রাফ বা রঞ্জন রশ্মি সম্পর্কে বুঝিয়ে দিচ্ছেন। রসায়ন বা পদার্থ বিদ্যায় আমার কোনই জ্ঞান নেই, স্বাভাবিক প্রাকৃতিক ঘটনার সম্বন্ধে ও আমার কোন ধারণাই নেই। ফন বুলো বলে চললেন, এর ক্ষতিপূরণ স্বরূপ যেহেতু আমার কিছু ঐতিহাসিক জ্ঞান আছে’ এটা বিশেষ করেই কাজে লাগে কূটনীতিতে।
কাইজার খুশি হয়ে উঠলেন। ফন বুলো তার প্রশংসা করেছে। ফন বুলো তাঁকে উঁচুতে তুলে নিজের সমালোচনা করেছে। এসবের পর কাইজার ওর সব অপরাধই ক্ষমা করলেন। তিনি তাই উৎসাহের সঙ্গে বলে উঠলেন, ‘তোমাকে বলিনি যে আমরা দুজনে দুজনের পরিপূরক? আমাদের দুজনে একসাথে থাকা উচিত আর তা থাকবোও।‘
তিনি ফন বুলোর সঙ্গে একবার নয় বেশ কয়েকবার করমর্দন করলেন। শুধু তাই নয় ওইদিনই একসময় তিনি বেশ উৎসাহের সঙ্গে ঘুসি পাকিয়ে বললেন, কেউ যদি প্রিন্স ফন বুলোর বিরুদ্ধে কিছু বলে তাহলে তার নাকে ঘুসি মারবো।’
ফন বুলো সময় মতই নিজেকে বাঁচাতে পেরেছিলেন–কিন্তু কৌশলী কূটনীতিক হয়েও তিনি একটা ভুল করেন। তার উচিত ছিল সম্রাটকে প্রশংসা করে নিজের সমালোচনা করে শুরু করা। তার মোটেই উচিত হয়নি। সম্রাটকে বুদ্ধিহীন বলা কিংবা তাঁর একজন অভিভাবক দরকার ইত্যাদি ইঙ্গিত করা।
যুদ্ধ কাইজারকে যদি কিছু আত্মসমালোচনার কথা শান্ত করতে পারে আর তাকে বন্ধু করে তুলতে সক্ষম হয়, তাহলে ভেবে দেখুন আমাদের দৈনন্দিন জীবনে এই রকম কাজ মানুষকে কি করতে পারে: মানবিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ঠিক ভাবে ব্যবহার করলে এতে ভোজবাজীর মতই কাজ হয়।
অতএব কারও মধ্যে ক্রোধ বা অসন্তোষ না জাগিয়ে তাকে পরিবর্তিত করতে তিন নম্বর নিয়ম হল : অপরের সমালোচনা করার আগে নিজেকে সমালোচনা করুন।
২৫. কেউই হুকুম পছন্দ করে না
পঞ্চবিংশ পরিচ্ছেদ
কেউই হুকুম পছন্দ করে না
সম্প্রতি আমি আমেরিকার মানুষের জীবনী লেখিকাঁদের ডীন মিস ইডা টারবেলের সঙ্গে ডিনারে অংশ নিয়েছিলাম। আমি তাঁকে যখন বললাম আমি এই বইটা লিখছি, তখন মানুষের সঙ্গে চলার বিষয়ের গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়ে আমাদের আলোচনা হয়। আমায় জানালেন তিনি যখন ওয়েন ডি. ইয়ংয়ের জীবনী রচনা করেছিলেন তখন ইয়ংয়ের সঙ্গে তিন বছর একই অফিসে বসেছেন, এমন একজন মানুষের তিন ঘন্টা ধরে সাক্ষাৎকারও নিয়েছিলেন। লোকটি জানিয়েছিল সারা জীবনে তিনি কখনও দেখেননি ইয়ং কাউকে সরাসরি কোন হুকুম করেন। তিনি সব সময়ই উপদেশ দান করতেন। উদাহরণ হিসেবে ওয়েন ডি ইয়ং কখনই বলেন নি, ‘এটা কর, ওটা কর’ বা ‘এটা কোরো না, ওটা কোরো না। বরং প্রায়ই তিনি বলতেন, এটা ভেবে দেখতে পারেন বা আপনার কি মনে হয় এতে কাজ হবে? কোন চিঠি লিখতে দিয়ে শেষ হলে তিনি বলতেন, ‘এটা তোমার কি রকম মনে হয়?’ বা চিঠির ভাষার একটু বদলে দিলে কেমন হয়? তিনি প্রায় সব সময়েই লোককে কাজ করার সুযোগ দিতেন। তিনি তাদের কাজের মধ্য দিয়েই ভুল সংশোধন করতে দিতেন।
এরকম কৌশলের ফলে ভুল সংশোধনের সুবিধাই করে দিতেন তিনি। এইরকম কৌশলে মানুষের অহঙ্কারবোধ বজায় থাকে আর নিজের গুরুত্ববোধও থাকে। তাকে বিদ্রোহ না করে সহযোগিতা করতে উদ্বুদ্ধ করে।
অতএব অপরকে ক্রুদ্ধ বা অসন্তুষ্ট না করে বদলাতে হলে ৪ নম্বর নিয়ম হল :
‘সরাসরি হুকুম না করে প্রশ্ন রাখুন।‘
২৬. অপরকে মুখ রক্ষা করতে দিন
বেশ কবছর আগে চার্লস্ স্টাইনমেজকে কোন ডিপার্টমেন্টের প্রধানের পদ থেকে সরানোর ব্যাপারে জেনারেল ইলেকট্রিক কোম্পানী মহা সমস্যায় পড়ে। হিসাবরক্ষা দপ্তরের প্রধান হিসেবে তিনি অচল হলেও বিদ্যুতের ব্যাপারে তাঁর প্রতিভা ছিল অনন্যসাধারণ। তাই কোম্পানি তাকে কোন ভাবেই আঘাত দিতে, চাননি। তিনি ছিলেন অপরিহার্য-আর অত্যন্ত স্পর্শকাতর। তাই তাঁরা তাঁকে একটা পদবী দিলেন। তারা তাঁকে করে দিলেন জেনারেল ইলেকট্রিক কোম্পানীর কনসালটিং ইঞ্জিনিয়ার–এই নতুন পদবী নিয়েই তিনি কাজ করছিলেন। এর ফলে অন্য একজন ডিপার্টমেন্টের ভার নিলেন।
স্টাইনমেজ খুশি হলেন।
জেনারেল ইলেকট্রিকের অফিসাররাও খুশি হলেন কারণ তাঁদের সব সেরা তারকাকে নিয়ে কোনরকম ঝড় না তুলেই কাজটা তারা সমাধা করলেন–এটা করা হল তাঁকে মুখ রক্ষা করতে দিয়েই।
তাঁকে মুখ রক্ষা করতে দিয়ে! কতখানি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারটা! অথচ আমরা ব্যাপারটা নিয়ে প্রায় চিন্তাই করি না! আমরা অপরের অনুভূতিকে চিন্তা না করেই আঘাত করি, অন্যের দোষ খুঁজি, ভয় দেখাই, কোন শিশুকে অন্যের সামনে বকাবকি করি। এটা করতে গিয়ে অপরের মনকে আমল দিতে চাই না। অথচ সামান্য একটু চিন্তা, দুটো সহৃদয়তা মাখা কথা, অপরের মনকে বোঝার চেষ্টা করলে কি চমৎকার ভাবে সব সমস্যা মিটে যেতে পারে। তাতে আঘাত দূর হয়ে যায়।
আমাদের মনে রাখা দরকার যখন ভবিষ্যতে কোন চাকর বা কর্মচারিকে বরখাস্ত করার প্রয়োজন হবে তখন আমাদের এটা চিন্তা করে দেখা উচিত।
