আপনি কুলিন, ম্যাকিনলে বা একজন লিঙ্কন নন। আপনি জানতে চাইবেন প্রতিদিনের ব্যবসায়িক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই দর্শন চলবে কিনা। চলবে কি? দেখা যাক। এবার ফিলাডেলফিয়ার ওয়ার্ক কোম্পানীর ডব্লিউ. পি. গকের ব্যাপারটাই দেখা যাক। মি. গক আমার বা আপনার মতই একজন সাধারণ নাগরিক। তিনি ওখানে আমার ক্লাসের এক ছাত্র থাকার সময় এই ঘটনার কথা বলেছিলেন।
ওয়ার্ক কোম্পানীর ফিলাডেলফিয়ায় একটা বিরাট অফিস বাড়ি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তৈরি করার কথা ছিল। বাড়ির কাজ ঠিক মতই হয়ে চলেছিল আর প্রায় শেষও হয়ে এসেছিল। আচমকা একজন সরবরাহকারী জানালো যে সে কারুকাজ করা ব্রোঞ্জের জিনিসগুলো নির্দিষ্ট সময় মত সরবরাহ দিতে পারবেন না। কি! সারা বাড়িটা আটকে যাবে? প্রচুর জরিমানা হবে! প্রচুর ক্ষতিও হবে! আর সেটা মাত্র একজনের জন্য।
শুরু হলো দূরগামী টেলিফোন কথাবার্তা। তর্কাতর্কি। বেশ গরম কথাবার্তা। সবই বৃথা। এরপর মিঃ গককে ব্রোঞ্জের সিংহকে তার গুহাতেই রাখবার জন্যে পাঠানো হলো নিউইয়র্কে।
‘আপনি কি জানেন ব্রুকলীনে আপনার নামে একমাত্র আপনিই আছেন?’ প্রেসিডেন্টের অফিসে ঢুকতে ঢুকতে মিঃ গক বললেন। প্রেসিডেন্ট একটু আশ্চর্য হয়ে বললেন, ‘না, এটা তো জানতাম না।’
মিঃ গক এবার বললেন, ‘আজ সকালে যখন ট্রেন থেকে নামলাম, টেলিফোন বইয়ে আপনার ঠিকানা দেখছিলাম। দেখলাম ব্রুকলীনে আপনিই ওই নামের একমাত্র মানুষ।‘
টেলিফোন বইটা দেখে নিয়ে প্রেসিডেন্ট আগ্রহের সঙ্গে বললেন, কই আমার তো জানা ছিল না, হ্যাঁ, নামটা একটু অসাধারণ তা ঠিক। আমাদের পরিবার আসে হল্যাণ্ড থেকে আর নিউইয়র্কে বাস করতে থাকেন প্রায় দুশ বছর আগে। তিনি তাঁর পরিবারের নানা কাহিনী বেশ কিছুক্ষণ ধরে শোনাতে চাইলেন। তাঁর কথা শেষ হলে মিঃ গক তাকে প্রশংসা করে বললেন তাঁর কারখানাটি কত বড় আর যে সব কারখানা দেখেছেন তাদের মধ্যে সবচেয়ে ভালো। মিঃ গক বললেন, আমার দেখা ব্রোঞ্জ কারখানাগুলোর মধ্যে এ কারখানাই সবচেয়ে সুন্দর আর পরিষ্কার।
‘সারা জীবনের প্রচেষ্টায় এ কারখানা গড়ে তুলেছি প্রেসিডেন্ট বললেন, এ নিয়ে তাই আমার গর্ব আছে। একবার কারখানাটা ঘুরে দেখবেন?’
দেখার সময় মিঃ গক জিনিসপত্র তৈরির কৌশল দেখে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করলেন। তিনি জানালেন অন্যান্য সব কারখানার চেয়ে এটি কত ভালো। মিঃ গক মেশিনগুলি দেখে প্রশংসা করতেই প্রেসিডেন্ট জানালেন এসব তাঁরই আবিষ্কার। তিনি অনেকক্ষণ ধরে মিঃ গককে সব কাজের পদ্ধতিগুলো দেখিয়ে দিলেন। তিনি মিঃ গককে মধ্যাহ্ন ভোজে নিমন্ত্রণ করলেন। এতক্ষণ পর্যন্ত মনে রাখবেন, মিঃ গক তাঁর এখানে আসার কারণ সম্পর্কে একটিও কথা বলেননি।
মধ্যাহ্নে ভোজের পর প্রেসিডেন্ট বললেন, হ্যাঁ, এবার কাজের কথায় আসা যাক। স্বাভাবিক ভাবেই আমি জানি আপনি কেন এসেছেন। আমি ভাবিনি আমাদের সাক্ষাত্তার এত সুন্দর হবে। আপনি ফিলাডেলফিয়ায় আমার এই আশ্বাস নিয়ে ফিরে যেতে পারেন যে সমস্ত জিনিস তৈরি করে ঠিক মতই পাঠিয়ে দেওয়া হবে, আর সেটা অন্য কাজ চেপে দিয়ে।
চাইতেই মিঃ গক যা দরকার সবই পেয়ে গেলেন। সমস্ত জিনিস সময় মত পৌঁছে গেল আর বাড়ি তৈরীর কাজও চুক্তির ঠিক দিনেই শেষ হল।
এটা কি হতে পারতো মিঃ গক যদি এ রকম ব্যাপারে সাধারণ মানুষের মত তর্কাতর্কি করতেন?
অতএব মানুষের মনে আঘাত না দিয়ে বা দোষ না দিয়ে তাকে বদলাতে হলে এক নম্বর নিয়ম হল :
প্রশংসা আর আন্তরিকতা দিয়েই শুরু করুন।
২৩. ঘৃণার উদ্রেক না করে কীভাবে সমালোচনা করবেন
ত্রয়োবিংশ পরিচ্ছেদ
ঘৃণার উদ্রেক না করে কীভাবে সমালোচনা করবেন
চার্লস্ শোয়াব একবার তার ইস্পাতের মিল ঘুরে দেখার সময় লক্ষ্য করলেন কিছু কর্মী ধূমপান করছে। তাদের ঠিক মাথার উপরেই লেখা ছিলো ‘ধূমপান নিষেধ’। শোয়ব কি লেখাটা দেখিয়ে বললেন ‘তোমরা পড়তে জানো?’ ‘ওহ্ না, শোয়ব এরকম ছিলেন না।‘ তিনি কর্মচারিদের কাছে এগিয়ে গেলেন আর প্রত্যেকের হাতে একটা করে চুরুট দিলেন আর বললেন, ‘তোমরা এগুলো বাইরে গিয়ে খেলে ভালো হয়।‘ তারা জানতো শোয়ব বুঝেছেন কাজটা তারা অন্যায় করেছে-তা সত্ত্বেও তারা তাকে প্রশংসা করলো কারণ তিনি দোষটার জন্য কিছুই বলেন নি আর তাদের অহমিকায় আঘাত দেননি! এরকম লোককে আপনি ভালো না বেসে পারবেন না। নয় কি?
জন ওয়ানামেকারও একই পদ্ধতি নিয়েছিলেন। তিনি ফিলাডেলফিয়ায় তার বিরাট দোকানে প্রায় রোজই ঘুরে দেখতেন। একদিন দেখলেন একটি মেয়ে কোন কাউন্টারে দাঁড়িয়ে আছে। অথচ বিক্রেতারা কেউ কোথাও নেই। তারা একপাশে জটলা করে কথাবার্তা আর হাসিঠাট্টায় ব্যস্ত। ওয়ানামেকার একটাও কথা বললেন না। নিঃশব্দে কাউন্টারের পিছনে গিয়ে তিনি মেয়েটির যা দরকার এনে দিয়ে কর্মচারিদের প্যাকিং করতে দিয়ে গেলেন।
১৮৮৭ সালের ৮ই মার্চ সুন্দর বক্তা হেনরি ওয়ার্ড রীচার মারা যান, বা জাপানীদের কথায় নতুন জগতে যান। পরের রবিবার লিম্যান অ্যাবেটকে তাঁর সম্বন্ধে কিছু বলার জন্য আবেদন জানানো হয়। সব সেরা কথিকা বানাবার জন্য লিম্যান ফ্লবেয়ারের মতই ঘসামাজা করে দারুণ একটা বক্তৃতা লিখে তার স্ত্রীকে পড়ে শোনালেন। বক্তৃতাটা মোটেও ভালো হয়নি ঠিক যেমন বক্তৃতা লেখা হয়। তার স্ত্রীর যদি বুদ্ধি কম থাকতো তিনি বলতেন, ‘লিম্যান, একদম বাজে হয়েছে, এটা চলবে না। শ্রোতারা এটা শুনে ঘুমিয়ে পড়বে। এটা একেবারে বিশ্বকোষের মত হয়েছে। সাধারণ জিনিস লেখ, এসব পড়লে তোমার দর কমে যাবে।’
