মিশৌরী ইতিহাস সমিতি প্রকাশিত ওয়াণ্টার ভি. স্ট্রিভেন্স, এর রিপোর্টারস লিংকন এ বলা হয়েছে যে, লিংকন নিম্নলিখিত ভাবে একটি পয়েন্টের ওপর জোর দিতেন :
তিনি দ্রুততালে বহু শব্দ বলে যেতেন, অতঃপর একটি শব্দ ও প্রবাদে এসে তার ওপর জোর দিতেন, বিশেষ জোর দিয়ে উচ্চস্বরে আওড়াতেন, পরিশেষে বিদ্যুৎ চমকের মতো দ্রুত গতিতে বাক্য সমাপ্ত করতেন।একটি বা দুটি শব্দের ওপর, যে গুলোর ওপর তিনি জোর দিতেন এত বেশি সময় ক্ষেপণ করতেন যে, পরবর্তী ডজন শব্দ বলতেও অতবেশি সময় প্রয়োজন হত না।
এই পদ্ধতি সহজে অন্যের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। বিশেষত আমি প্রায়ই সাধারণ ভাষণে কার্ডিন্যাল গিবনের একটি বিবৃতি উল্লেখ করতাম, অর্জিত সাহসের ধারণার ওপর সবিশেষ গুরুত্ব আরোপ করতে চাইতাম। সুতরাং আমি কতিপয় শব্দের ওপর এত বেশি জোর দিতাম যেন ঐ শব্দ দ্বারা আমি অভিভূত। আপনি কি নিম্নবিষয়টি শব্দ করে পাঠ করে, একই পদ্ধতি অনুসরণে ফলাফল নোট করেন? বিবৃতির বড় শব্দগুলোর ওপর জোর দিন।
মৃত্যুর স্বল্পকালে আগে কার্ডিন্যাল গিবন বলেছেন, “আমার বয়স ছিয়াশি বছর। আমি বহুলোককে সাফল্য অর্জন করতে দেখেছি, যাদের মধ্যে শতশত ব্যক্তি সফল হয়েছেন বিশ্বাস গুণে এবং এটি বিশেষ গুরুতুপূর্ণ। সাহস হীন কোনো ব্যক্তিই সাফল্য অর্জন করতে পারে না।
এভাবে চেষ্টা করে বলুন ”তিনকোটি ডলার।” এটা এমন ভাবে দ্রুত বলুন যাতে এটা অত্যন্ত নগণ্য অর্থ বলে মনে হয়। এবার অত্যন্ত ধীর গতিতে বলুন, ‘তিন কোটি ডলার।” এমন গতানুগতিকভাবে বলুন যেন এটি অতবেশি অর্থাৎ তেমন গুরুত্ব লাভ না করে। তিন কোটি ডলারের চাইতে ত্রিশ হাজার ধ্বনির শব্দ কি বড় নয়?
চতুর্থ : গুরুত্বপূর্ণ ধারণার আগে ও পরে বিরতি :
লিংকন বক্তৃতাকালে প্রায়ই হাসতেন। যখন কোনো বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি শ্রোতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তাদের মনে আস্থা সৃষ্টি করতে চাইতেন তখন তিনি সে পয়েন্টটি বলার আগে বক্তৃতা থামিয়ে শ্রোতাদের দিকে দৃষ্টি দিতেন, সরাসরি তাদের চোখে-চোখে তাকাতেন, কিন্তু কয়েক মুহূর্ত কিছু বলতেন না। হঠাৎ এই থেমে পড়ার ফলও হত হঠাৎ গণ্ডগোলের মতো। এটা সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করত। এটার পরে কী আসছে তার প্রতি সকলকে মনোযোগী, সতর্ক ও সজাগ করে তুলত। উদাহরণ স্বরূপ ডগলাসের সাথে তাঁর প্রখ্যাত বিতর্ক যখন শেষ হয়ে আসছিল, তখন তার পরাজয় প্রায় নিশ্চিত হয়ে পড়েছিল, তিনি নিজেও যখন হয়ে পড়েছিলেন হতাশ, তখন তিনি তাঁর সুদীর্ঘ কাল অনুসৃত পদ্ধতি অনুসরণে নিজেকে বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করার চেষ্টা করেন।
বক্তৃতার উপসংহার টানতে গিয়ে হঠাৎ তিনি থেমে যান এবং কয়েক মুহূর্ত নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন, অর্ধ অমনোযোগী, অর্ধ বন্ধুরূপী মুখগুলোর প্রতি তাকান, দেখতে পান যে, তারা সকলেই যেন গভীর সমুদ্রে অবগাহন করার মতো তাঁর দিকে তাকিয়ে আছেন, কারো-কারো চোখ সজল, হস্তদ্বয় তিনি বন্ধ করেন, যেন এগুলোও ক্লান্ত, অতঃপর তিনি তার অদ্ভুত কণ্ঠস্বরে বলেন, “বন্ধুগণ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে জর্জ ডগলাস অথবা আমি যেই নির্বাচিত হই না কেন, তাতে কিছু আসে যায় না। কিন্তু যেগুলো আজ আমরা আপনাদের সামনে পেশ করলাম। সেগুলো অত্যধিক গুরুত্বপূর্ণ, সে কোনোরূপ ব্যক্তি স্বার্থের বহু উর্ধ্বে এবং এগুলো যে কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক ভাগ্যের চাইতে অনেক বড়। এবং বন্ধুগণ, (এখানেও তিনি থামেন এবং দর্শক শ্রোতাদের চোখের দিকে তাকান) তাই এই প্রশ্নটি চির জাগরুক থাকবে। ডগলাস অথবা আমার কণ্ঠখানি স্তব্ধ হয়ে যাবে চিরতরে, যখন আমরা ঢলে পড়ব মৃত্যুর কোলে যখন আমরা মিশে যাব মাটিতে তখনো প্রশ্নটি থেকে যাবে। সুতরাং এগুলোর গুরুত্ব অনুধাবন করুন।”
“এই সাধারণ শব্দগুলো,“ লিখেছেন একজন জীবনীকার, “তাদের মনপ্রাণ আকর্ষণ করে।”
যে সব শব্দ বা প্রবচনের উপর জোর দিতেন লিংকন সে-সব শব্দের শেষেও থামতেন। ও সব শব্দের উপর বিশেষ জোর দিতেন বলে সেগুলোর অর্থও প্রকাশের সাথে সাথে স্পষ্ট হয়ে যেতো, শ্রোতাদের হৃদয়ে পশতো।
স্যার অলিভার লজ বক্তৃতাকালে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা প্রকাশের আগে পরে থামতেন, একটি বাক্যে তিন বা চার বারও থামতেন, কিন্তু তিনি তা করতেন নিতান্ত স্বাভাবিক নিয়মে ও গতিতে। আলিভারের পদ্ধতি বিশ্লেষণ করলে সবার পক্ষে এটা বোঝা অত্যন্ত সহজ হবে।
“আপনার নীরবতা দ্বারা”, বলছেন কিপলিং ”আপনার বক্তব্য সুস্পষ্ট হয়।” বক্তৃতাকালে যথা সময়ে ন্যায়সঙ্গতভাবে নীরবতা পালন করা গেলে তার ফল হয় সবচাইতে উত্তম। এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি, এতৎসত্ত্বেও কিন্তু নবীন বক্তারা তা উপেক্ষা করে থাকেন।
হলম্যান এর বক্তৃতা হতে অংশটি উদ্ধৃত করছি এবং এতে আমি নীরবতার জন্য কতিপয় স্থান নির্দিষ্ট করেছি। আমি বলি না যে, আমি নির্দিষ্ট করেছি শুধু তাই-ই নীরবতার কেন্দ্র হবে এবং উত্তম কেন্দ্র হবে। আমি শুধু বলি যে, এভাবে স্থান নির্দিষ্ট করা চলে। কোথায় থামতে হবে তার কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম কানুন নেই। এটা নির্ভর করে অর্থ এবং অনুভূতির উপর। একই বিষয়ে প্রদত্ত বক্তৃতায় আজ আপনি যে সব স্থানে থামলেন কাল সেসব স্থানে না থেমে; নীরব না থেকে অন্যত্র থামতে পারেন, নীরব থাকতে পারেন। নিম্ন উদ্ধৃত অংশটি কোনোরূপ নীরবতা ছাড়া একবার পাঠ করুন। অতঃপর আবার পাঠ করুন; থামুন যে-সব স্থানে আমি কমার চিহ্ন দিয়েছি, এই থামার ফলাফল কী?
