একজন সাধারণ মানুষের সাথে আপনার দুই বা তিনজন বন্ধুকে একসাথে পরিচয় করিয়ে দিন, কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় যে মাত্র দুমিনিট পর জিজ্ঞেস করুন, তিনি কারো নাম বলতে পারবেন না। কেন? কারণ প্রথমে তিনি তাদের প্রতি যথেষ্ট মনোযোগ দেন নি, তিনি সঠিকভাবে তাদের পর্যবেক্ষণ করেন নি, দেখেন নি, তিনি হয়তো আপনাকে বলবেন তাঁর স্মরণ শক্তি অত্যন্ত দুর্বল। তাঁর পর্যবেক্ষণ শক্তি দুর্বল একথা ঠিক নয়। কুয়াশায় ছবি নিতে ব্যর্থ হলে তিনি একটি ক্যামেরাকে গালাগাল দেবেন না, তবে এধরণের অবস্থায় কোনো কিছু করা হতে তিনি তার মনকে বিরত রাখতেন। এটা করা উচিত নয়।
জোসেফ পুলিসটজার তাঁর সম্পাদকীয় দপ্তরের প্রতিটি কর্মকর্তার সামনে মাত্র তিনটি শব্দ রাখতেন :
সঠিক
সঠিক
সঠিক
আমার যা চাই তা হচ্ছে এই। এতে মানুষের সুনাম হয়। এর উপর জোর দিন। এটা পুনরাবৃত্তি করতে বলুন। এটা কীভাবে উচ্চারিত হয় তা অনুসন্ধান করুন। যার কাছে অনুসন্ধান করছেন তাঁকে তোষামোদ করা হচ্ছে বলে মনে করা হলেও আপনার গভীর মনোনিবেশের জন্য তার নাম আপনার স্মরণ থাকবে। ব্যক্তি বা বিষয় সম্পর্কে আপনি সুস্পষ্ট ধারণা লাভ করবেন।
লিংকন শব্দ করে পড়তেন কেন?
অল্প বয়সে লিংকন এমন একটি স্কুলে অধ্যয়ন করেছেন যে স্কুলের মেঝে কাগজ আঁটা। স্কুলে ছিল পাঠ্য বই এর মাত্র একটি কপি। শিক্ষকরা উচ্চস্বরে এটি পাঠ করতেন, ছাত্ররা চিৎকার করে তার পুনরাবৃত্তি করত। সকলে একসাথে কথা বলত! এর ফলে স্কুলে সবময় হই চই লেগে থাকত। প্রতিবেশীরা এটিকে বলত ”বক্ বক্ স্কুল।”
এই ”বক্ বক্ স্কুল।” লিংকনের এমন একটি অভ্যাস গড়ে ওঠে যা তিনি জীবনে ছাড়তে পারেন নি। যা কিছু তিনি স্মরণ করতে চাইতেন তিনি সব সময় তা শব্দ করে পড়তেন। প্রতিদিন সকালে তিনি স্পিং ফল্ডস্থ তার আইন অফিসে পৌঁছে একটি কৌচে ছড়িয়ে বসতেন, পাশের একটি চেয়ারে একটি পা তুলে দিতেন এবং শব্দ করে সংবাদপত্র পাঠ করতেন। তিনি আমার বিরক্তি উৎপাদন করতেন, “বলেছেন তার আইন অংশীদার,“ তাঁর ব্যবহার ছিল সহ্য-শক্তির বাইরে। ”একদিন আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তিনি কেন শব্দ করে পড়েন? তিনি বলেন, দুটি কারণে আমি শব্দ করে পড়ি। প্রথমত : আমি যা পড়ি তা দেখি, আমি তা শুনি, ফলে তা আমি সহজে স্মরণ রাখতে পারি।”
তার স্মরণ শক্তি ছিল বিস্ময়কর। ”আমার মন” তিনি বলেছেন, “ইস্পাত খণ্ডের মতো যাতে কিছু প্রবেশ করানো কঠিন, এমন কী অসম্ভব, কিন্তু একবার কিছু প্রবেশ করানো গেলে তা বের করাও অসম্ভব।”
মনে প্রবেশ করানোর জন্য যে সব পদ্ধতি তিনি অনুসরণ করতেন সে পদ্ধতিগুলি হচ্ছে নিম্নরূপ :
যে বিষয়টি স্মরণ রাখতে চান তা দেখা ও শোনা, স্পর্শকরা, ঘ্রাণ নেয়া এবং স্বাদ গ্রহণ করা।
সর্বোপরি বিষয়টি পরিষ্কারভাবে দেখা। আমরা কল্পনাপ্রবণ। সবকিছু আমার চোখে পড়ে, ফলে আমরা অনেকের নাম মনে রাখতে না পারলে তাদের চেহারা স্মরণ রাখতে পারি। আমাদের চোখ হতে মস্তিষ্কে যে সব শিরা-উপশিরা গিয়েছে তা কান হতে মস্তিষ্কে প্রবিষ্ট শিরা-উপশিরার চাইতে পঁচিশগুণ বেশি শক্তিশালী। চীনে একটি প্রবাদ আছে, তা হচ্ছে”একবার দেখা হাজার বার শোনার চাইতে উত্তম।”
যা আপনি স্মরণ রাখতে চান তার নাম টেলিফোন নম্বর এর বক্তব্যের রূপরেখা লিখে রাখুন, তা পাঠ করুন তার উপর দৃষ্টি রাখুন, তা দৃষ্টিলব্দ রাখার চেষ্টা করুন।
মার্ক টোয়েন নোট ছাড়া কীভাবে বক্তৃতা প্রস্তুত করতেন :
কোনোরূপ নোটের সাহায্য ছাড়া মার্ক টোয়েন যে বক্তৃতা করতেন তা ছিল অত্যন্ত মূল্যবান। এসম্পর্কে হারপার ম্যাগাজিনের সাথে সাক্ষাৎকারে তিনি যে বিবৃতি দিয়েছেন তা নিম্নরূপ :
তারিখগুলো স্মরণ রাখা সম্ভব না কারণ ওগুলো অংক বিশিষ্ট, অংক শুষ্ক এবং স্মরণ রাখা সহজ সাধ্য নয়। এতে কোনো ছবি নেই, ফলে এর প্রতি কারো দৃষ্টিও আকৃষ্ট হয় না। ছবি থাকলে তা স্মরণ থাকে। এটা আমি আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা হতে জানি। ত্রিশ বছর আগের ঘটনা, আমি প্রতি রাতে একটি বক্তৃতা মুখস্থ করতাম এবং প্রতি রাতেই আমাকে নোট হতে সাহায্য নিতে হত, নোটে ছিল প্রথম বাক্যসহ এগারোটি বাক্য এবং তা ছিল নিম্নরূপ :
ঐ অসডলের আবহাওয়া ছিল—
এ সময় নিয়ম ছিল—
কিন্তু কালিফোর্নিয়ায় কখনো কেহ শোনে নি যে–
এরূপ এগারোটি। এই বাক্যগুলো আমাকে বক্তৃতা শুরু করার অনুপ্রেরণা যোগাতো এবং পথিমধ্যে অসাড় হয়ে পড়ে থাকা থেকে রক্ষা করত। কিন্তু সবগুলো বাক্য ছিল একাকার, এটা হতে কোনো ছবি ভেসে উঠতো না মনের পর্দায়, আমি শুধু স্মরণ রাখতাম, কিন্তু আমি কখনো এগুলো কোন্টার পর কী আছে তা নিশ্চিতভাবে মনে রাখতে পারতাম না, তাই আমাকে সবসময় চিট সাথে রাখতে হত এবং সুযোগ মতো সেগুলো দেখে নিতাম। একবার আমি এই চিট হারিয়ে ফেলেছিলাম, ফলে সেদিন আমি কীরূপ বিপদে পড়েছিলাম তা কেহ কল্পনা করতে পারবেন না। এর ফলে আমি বুঝতে পারি, আমাকে অন্য পথ অনুসরণ করতে হবে। সুতরাং আমি এসব বাক্যাংশের প্রাথমিক শব্দ এ. বি. হিসাবে আমি মুখস্থ করি। পরদিন আমি আমার হাতের আঙুলের দশটি নখে দশটি চিহ্ন দিয়ে বক্তৃতা মঞ্চে গমন করি। কিন্তু এদিনও আমার বক্তব্য পেশকালে আমি বিমূঢ় হয়ে পড়ি। আমি কিছুক্ষণ আঙুলের দিকে তাকাই। কিন্তু কোনো আঙুলের চিহ্ন আগে এবং কোনোটি পরে ব্যবহার করতে হবে তা নির্ধরণ করতে আমি ব্যর্থ হই। আমি বার-বার আঙুলের দিকে তাকাই, তবু আমি আমার বক্তব্য সম্পর্কে নিশ্চিত হতে ব্যর্থ হই। আঙুলের প্রতি আমাকে বার-বার দৃষ্টি দিতে দেখে শ্রোতাদের দৃষ্টি আমার প্রতি আবদ্ধ হয়। তারা আমার বিষয় বস্তু হতে আমার আঙুলে কী আছে তা জানতে অধিকতর আগ্রহী হয়ে ওঠেন। পরে দুএকজন আমাকে জিজ্ঞেস করেন, আমার হাতে কী আছে।
