মিসেস ফান ডান আমাকে নির্বোধ ভাবেন এই কারণে যে–ওঁর মত আমার বুদ্ধিসুব্ধির অভাব নেই; উনি আমাকে ব্লাটা ভাবেন এই কারণে যে উনি এমন কি আমার চেয়েও বেশি তঁাটা। উনি ভাবেন আমার পোশাকগুলো খুব চেঁটি, তার কারণ ওঁর গুলো আরও টেটি। এবং সেই কারণেই উনি আমাকে ঝানু ভাবেন, কেননা যে বিষয়ে ওঁর বিন্দুমাত্র জ্ঞান নেই সে বিষয়েও ফোড়ন কাটার ব্যাপারে উনি আমার ঘাড়ে হাগেন। অবশ্য আমার একটা প্রিয় প্রবচন হল, ‘ধোয়া থাকলেই আগুন থাকবে’ এবং আমি সত্যিই কবুল করছি যে, আমি ঝানু।
আমার ক্ষেত্রে দুঃখের ব্যাপার হল এই যে, অন্য যে কারো চেয়ে আমি ঢের বেশি নিজের খুঁত কাড়ি এবং নিজেকে বকি। এবং এরপর মা-মণি যখন তার ওপর তার অনুশাসনটুকু চাপান তখন শিক্ষার বোঝা এমন পর্বতপ্রমাণ হয়ে ওঠে যে, মরীয়া হয়ে আমি তখন চ্যাটাং চ্যাটাং কথা বলি এবং উল্টোপাল্টা কথা বলতে শুরু করে দিই; তখন অবশ্যই আমার গলায় পুরনো সুপরিচিত ধুয়ো শোনা যায় আমাকে কেউ বুঝতে পারে না!’ এই পদবন্ধটি আমার মনে সেঁটে যায়; আমি জানি এটা খুবই বোকার মতো শুনতে, তবু এর মধ্যে কিছুটা সত্যি আছে। অনেক সময় নিজের ওপর আমি এত বেশি দোষারোপ করি যে, তখন আমি একান্ত ভাবে এমন কাউকে চাই–যে এসে আমাকে খানিকটা সান্ত্বনাবাক্য বলবে, আমাকে ঠিক উপদেশ দেবে এবং সেই সঙ্গে কিছুটা আমার সত্যিকার ব্যক্তিত্বকে বের করে আনবে; কিন্তু হায়, আমার খোজাই সার হল, আজ পর্যন্ত তেমন কাউকে আর পেলাম না।
এটা বলতেই পেটারের কথা অমনি তোমার মনে হবে, আমি জানি। হবে না, কিটি? ব্যাপারটা এই–পেটার আমাকে ভালবাসে প্রণয়িনীর মতো নয়, বন্ধুর মতো; দিনে দিনে, ওর বন্ধুভাব আরও বাড়ছে। কিন্তু কী সেই রহস্যময় জিনিস যা আমাদের দুজনকেই ঠেকিয়ে রাখছে? আমি নিজেই তা বুঝি না। মাঝে মাঝে ভাবি ওর সম্বন্ধে আমার তীব্র বাসনার মধ্যে আতিশয্য ছিল, কিন্তু, সেটাও ঠিক নয়। কেননা দুদিন যদি আমি ওপরে না যাই, আমার মধ্যে আকুলিবিকুলি ভাব অসম্ভব বেড়ে যায়। পেটার ভালো, পেটার আমার খুব আপন; কিন্তু তাও অস্বীকার করে লাভ নেই, ওর ব্যাপারে আমি নিরাশ হয়েছি। বিশেষ করে, ধর্মের বিষয়ে ওর বিরাগ এবং খাবারদাবার আর অন্য নানা প্রসঙ্গে ওর কথাবার্তা আমার পছন্দ হয় না। তবে এ ব্যাপারে আমি স্থির নিশ্চিত যে, আমাদের মধ্যে পরিষ্কার বোঝাঁপড়া হয়ে যাওয়ায়, আর এখন আমাদের ঝগড়া হবে না। পেটার শান্তিপ্রিয় মানুষ; ওর সহ্যগুণ আছে এবং বললেই কথা শোনে। যে কথা ওর মা বললে ও কিছুতেই মানবে না, তেমন অনেক জিনিস ওকে আমি বেকসুর বলতে পারি। ওর জিনিসপত্তর সমানে ও গোছগাছ করে রাখতে পারে। এ সত্ত্বেও ও কেন ওর নিগূঢ় কথা নিজের মনের মধ্যে রাখে? কেন সেখানে আমার প্রবেশ নিষেধ? মানছি, স্বভাবে ও আমার চেয়ে চাপা, কিন্তু আমি জানি আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে যে, কোনো-না-কোনো সময়ে সবচেয়ে মুখচোরা মানুষও এমন কাউকে ঠিক ততটাই পেতে চায় যাকে সে মন খুলে সব বলতে পারে।
পেটার আর আমি, আমরা দুজনেই আমাদের ধ্যানের বছরগুলো ‘গুপ্ত মহলে’ কাটিয়েছি। আমরা কত সময় ভবিষ্যৎ অতীত আর বর্তমান নিয়ে কথা বলি, কিন্তু, আগেই বলেছি, আদত জিনিসটা আমি যেন ধরতে ছুঁতে পারি না এবং ওটা যে রয়েছে, সেটা জেনেও।
তোমার আনা।
.
বৃহস্পতিবার, ১৫ জুন, ১৯৪৪
আদরের কিটি,
আমি ভাবি, প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক আছে এমন সব কিছু নিয়েই আমি যে এত মত্ত হয়ে পড়ি, তার কারণ নিশ্চয় এই যে, আজ দীর্ঘদিন ঘরের বাইরে নাক গলানো থেকে আমি বঞ্চিত। আমার স্পষ্ট মনে পড়ে, একটা সময় ছিল যখন গাঢ় সুনীল আকাশ, পাখিদের কূজন, চাদের আলো আর ফুল, এর কিছুই কখনও আমাকে মুগ্ধ করতে পারত না। এখানে আসার পর সেটা বদলে গেছে।
যেমন হুইনের (ইস্টারের ছয় সপ্তাহ পরে সপ্তম রবিবার থেকে সপ্তাহকালের পরব) সময়, যখন বেশ গরম, একা একা ভালো করে চাঁদ দেখব বলে আমি ইচ্ছে করে একদিন রাত সাড়ে এগারোটা পর্যন্ত জেগেছিলাম।
হায়, আমার জেগে থাকাই সার হল, কারণ চাদের আলো বড় বেশি জোরালো থাকায় ভয়ে আমি জানালাই খুলতে পারলাম না। আরেক বার, মাস কয়েক আগে, আমি ওপরে গিয়েছিলাম, ঘরের জানালাটা খোলা ছিল।
যতক্ষণ না জানালা বন্ধ করে দিতে হল ততক্ষণ আমি ঘর ছেড়ে নড়িনি। ঘুটঘুটে অন্ধকার, বর্ষণমুখর সন্ধ্যে, ঝড়ো হাওয়া, হুড়মাতুনে মেঘ, সব যেন চুম্বকের মতো আমাকে ধরে রাখল, দেড় বছরের মধ্যে এই প্রথম রাতকে আমি সামনাসামনি দেখলাম। সেদিন সন্ধের পর থেকে সিঁদেল চোর, ধেড়ে ইঁদুর আর বাড়িতে পুলিসের হানা দেওয়ার ভয়ের চেয়েও আমার কাছে বড় হয়ে উঠল আবার সেই রাত দেখার তীব্র বাসনা।
আমি একা একা নিচে চলে গিয়ে রসুইঘর আর অফিসের খাস কামরার জানালা দিয়ে বাইরেটা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতাম।
অনেকেই প্রকৃতি ভালবাসে, অনেকে মাঝে মধ্যে ঘরের বাইরে ঘুমোয় আর যারা জেলখানায় বা হাসপাতালে থাকে তারা দিন গোনে কবে আবার ছাড়া পেয়ে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবে।
কিন্তু এমন মানুষের সংখ্যা বেশি নয় যারা, নির্ধন সবাই যার অংশীদার, সেই প্রকৃতি থেকে বহিষ্কৃত আর বিচ্ছিন্ন। যখন আমি বলি যে, আকাশ মেঘ, চাঁদ আর তারার দিকে তাকালে নিজের মধ্যে আমি পাই প্রশান্তি আর সুস্থিরতা–সেটা আমার মনগড়া কল্পনা নয়। ঘৃতকুমারী বা ব্রোমাইডের চেয়েও সেটা ভালো ওষুধ; প্রকৃতি মাতা আমাকে বিনীত হতে শেখায় এবং সাহসের সাথে প্রত্যেকটি আঘাতের মোকাবিলা করতে শেখায়।