–উনি কি কোনো নাম বলেছেন?
-হ্যাঁ, মনে পড়েছে। উনি জুলিয়ান শব্দটা উচ্চারণ করেছিলেন। তবে আমার ঠিক মনে নেই উনি জুলিয়ান, নাকি জুলিয়া বলেছিলেন। কিন্তু আমি যতদূর পর্যন্ত জানি, আমাদের চিপিং লেক হর্নে জুলিয়া নামে কোনো মেয়ে বসবাস করে না। আমি তো মোটামুটি সকলের সাথেই পরিচিত। বুঝতেই তো পারছ, আমাদের ছোট্ট জনপদ, মুখ পরিচিতি সকলের সাথেই আছে আমার।
আবার কথাটা থেমে গেল। বোঝা গেল এখন দুজনেই চিন্তার জগতে ডুব দিয়েছেন। অনেক কিছু ভাববার চেষ্টা করতে থাকেন বাঞ্চ। জুলিয়ান, নাকি জুলিয়া ঠিক মতো মনে পড়ছে না তাঁর। চোখ বন্ধ করলেন তিনি। ওই তো, সিঁড়ির ধারে শোয়ানো আছে রক্তাক্ত শরীরটা, জানলা দিয়ে যেটুকু আলো এসে পড়েছে তাতে কী এক অদ্ভুত অপছায়ার সৃষ্টি হয়েছে। মনে হচ্ছে সেখানে যেন হীরক-দতি জ্বলে উঠেছে।
মিস মার্পল শান্তভাবে উচ্চারণ করলেন–কোনো হীরে মণিমুক্তো?
বাঞ্চ বললেন–হ্যাঁ, এবার বোধহয় আমরা আমাদের গল্পের সব থেকে উল্লেখযোগ্য অংশে পৌঁছে গিয়েছি। শুধু এই ব্যাপারটার জন্য আজ আমি বৃত্তান্ত হয়ে তোমার কাছে ছুটে এসেছি। একলেসরা। একটা ব্যাপার নিয়ে খুবই জোরাজুরি করছিলেন। সেটা হল ওই মৃত মানুষটির কোট। যখন ডাক্তার ওনাকে পর্যবেক্ষণ করতে আসেন, তখন আমরা কোটটা ওনার দেহ থেকে খুলে নিয়েছিলাম। কোটটা পুরোনো দিনের। দেখলেই বোঝা যায় অনেকবার পরিধান করা হয়েছে। একেবারে শেষ অবস্থায় পৌঁছে গেছে। আমি বুঝতে পারছি না, কেন ওনারা ওই কোটটির জন্য এত ঘোরাঘুরি করছিলেন। শেষ পর্যন্ত কোটটি ফিরে পাবার পর ওনাদের মুখে স্বস্তির অভিব্যক্তি ফুটে উঠেছিল। ওঁরা বলছিলেন এর সঙ্গে মৃত মানুষটির স্মৃতি জড়িয়ে আছে। কিন্তু আমার মনে হয়, এই ব্যাপারটা অত সহজ নয়। আমার মনে হয় ওই কোটটির মধ্যেই বোধহয় আসল রহস্য লুকিয়ে আছে।
………আমি ওপরে উঠে গিয়ে কোটটি খুঁজছিলাম। যখন অনেক কষ্টে সেটি খুঁজে পেয়েছিলাম, তখন সেটাকে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে আসি। আমার স্পষ্ট মনে আছে, এই কোটটি পাবার পর ওই ভদ্রলোকের সমস্ত চেহারাতে একটা স্বস্তির ছাপ ফুটে উঠেছিল। আমি কোটটি দেবার পর ওনার দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। আর একটা কথা তোমাকে না জানিয়ে পারছি না, এই কোটের লাইনিংএর ভেতর একটা অদ্ভুত ব্যাপার আমি লক্ষ্য করে ছিলাম। আমি দেখেছিলাম লাইনিংএর কিছুটা অংশে অন্য সুতো দিয়ে সেলাই করা হয়েছে। আর আমি সেখানে হাত দিয়ে দিয়ে দেখলাম, একটা করে কাগজ রয়ে গেছে। আমি সাবধানে কাগজটা বাইরে বার করেছিলাম, তারপর আবার সুন্দরভাবে ওটা সেলাই করে দিই, এমন সুতো ব্যবহার করেছিলাম যাতে ওপর থেকে দেখলে কিছুই বুঝতে পারা না যায়। আমি ব্যাপারটা সম্পর্কে খুবই ওয়াকিবহাল ছিলাম, আমার মনে হয়, একলেস হয়তো আমি কী করেছি সেটা ধরে ফেলতে পারে, অথবা তাদের নজর এড়িয়ে যেতে পারে এটা। আমি তারপর কোটটা নীচে এনে ওঁদের হাতে তুলে দিয়েছিলাম। আমি বলেছিলাম যে, আমার কাজের মেয়েটা কোটটা বৈঠকখানায় নিয়ে যাবার জন্য তৈরি হয়েছিল তাই আমার কিছুটা দেরি হয়ে গেছে।
এবার মিস মার্পলের চোখের তারায় ফুটে উঠল ঔৎসুক্যের চিহ্ন। তিনি বললেন দেখি কাগজের টুকরোটা।
বাঞ্চ তার হ্যান্ডব্যাগটি খুললেন–আমি এটা কিন্তু জুলিয়ানকে দেখাতে পারিনি, আসলে আমার এই কাণ্ডটা হয়তো সে খুব একটা সমর্থন করবে না। আমার উচিত ছিল এই কাগজের টুকরোটা একলেসের হাতে সমর্পণ করা। কিন্তু আমি এটা তোমার কাছে নিয়ে এসেছি।
মিস মার্পল তাকালেন ওই কাগজের টুকরোটার দিকে, এটা হল বুকের একটা টিকিট, বেডিংটন স্টেশন লেখা আছে।
-তার মানে উনি বেডিংটন স্টেশনের রিটার্ন টিকিট আর একটা পকেটে রেখে দিয়েছিলেন তাই তো?
বাঞ্চ মন্তব্য করলেন।
এবার চার চোখের মিলন ঘটে গেল।
মিস মার্পল সাবধানে বললেন–তাহলে? কোনো একটা কার্যকারণ পাওয়া গেল কি? বাঞ্চ, তুমি কি লন্ডনে আসার পথে তোমার কোনো অনুসরণকারীকে দেখেছিলে? আমার মনে হচ্ছে তোমাকে কেউ নিঃশব্দে অনুসরণ করছে।
এই কথা শুনে বাঞ্চ খুবই অবাক হয়ে গেলেন, তিনি বললেন–কী বলছ? আমি কী করেছি যে, আমার প্রতিটি পদক্ষেপের ওপর কড়া নজর দিতে হবে?
মিস মার্পল বললেন আমার মনে হচ্ছে, আমার অনুমান বলতে পারো, আমার স্থির সিদ্ধান্ত, এই পৃথিবীতে যখন তখন যে কোনো ঘটনা ঘটতে পারে, তাই আগে থেকে আমাদের সাবধান হওয়া উচিত।
উনি চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন তারপর বললেন-তুমি এখানে এসেছ এই খবরটা কি কেউ জানে? আমার মনে হয়, তোমার এখন একলেস-এর ওখানেই চলে যাওয়া উচিত। যেখানে গিয়ে তুমি কেনাকাটায় ব্যস্ত থাকো। আমিও তোমার সঙ্গে যেতে চাই। যেতে যেতে আমরা না হয় কথা বলব, না, আমার এখন যাওয়াটা কি ঠিক হবে?
মিস মার্পল বলে চললেন–হ্যাঁ, তোমার সাথে আমাকে যেতেই হবে, এই রহস্যটা আমার মনকেও ভাবিয়ে তুলেছে।
দুই ভদ্রমহিলা প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে এখানে সেখানে ঘুরে বেড়ালেন। তারা নানা ধরনের জিনিসপত্র কিনে ফেললেন। যেগুলো আমাদের দৈনন্দিন জীবনে কাজে লাগে, এবার হারল্ড বাগ নামে একটি অঞ্চলে পৌঁছে গেলেন। সেখানে গিয়ে মনের আনন্দে মেতে উঠলেন খাদ্য অন্বেষণে, আহা, এত সুন্দর খাবার কি না চেখে থাকা যায়? হরিণের সাথে অ্যাপেলটাও, এবং টোস্টার–দুজনেরই অত্যন্ত প্রিয় পদ।
