প্রিয় গ্রীসলডা,
তুমি আর ভিকার যদি আজ মধ্যাহ্নভোজটা এখানে সারো তাহলে খুব খুশি হব। আমার এখানে অদ্ভুত একটা ব্যাপার ঘটেছে। সে কারণেই ভিকারের পরামর্শ দরকার। আমি কাউকেই এসব বলিনি। তোমরাও এখন এ ব্যাপারে কাউকে কিছু বলল না।
তোমার স্নেহের অ্যানা প্রথেরো
চিঠিটা পড়া শেষ করে আমি চিন্তিতভাবে তাকে বললাম, কি এমন ঘটতে পারে নতুন করে বুঝতে তো পারছি না।
গ্রীসলডা বলল, আমিও তো তাই ভাবছি। বেচারীর জন্য বড় কষ্ট হয়। খুনের ব্যাপারটা কিছু কি এগুলো?
-মনে হয় আমরা ঘটনার শেষ প্রান্তে এসে এখনো পৌঁছতে পারিনি। ক্রমশই জটিল হয়ে উঠছে সবকিছু।
–তুমি একথা বলছো কাউকে এখনো পর্যন্ত গ্রেপ্তার করা হয়নি বলে?
-না, তা নয়। এমন জটিল আবর্ত যে সেগুলো ভেদ করতে না পারলে এ কেসের সমাধান সম্ভব নয়। যাই হোক, চল ওল্ডহল থেকে তাহলে ঘুরে আসা যাক।
–হ্যাঁ যাব। তুমি আর কোথাও বেরিয়ো না।
.
খাওয়া দাওয়ার পর বৈঠকখানায় বসে কফি খেতে খেতে মিসেস প্রথেরো বলল, মিঃ ক্লেমেট, আপনাকে আমি গুটিকতক কথা বলতে চাই। ওপরে বসার ঘরে যাই চলুন।
বৈঠকখানা থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি বেয়ে আমরা ওপরে ছাদে চলে এলাম। সেখানে মই-এর মত একটা সিঁড়ি ওপরতলায় উঠে গেছে। আমরা সেটা বেয়ে উঠে গেলাম। একটা ময়লা চিলেকোঠার সামনে এসে দাঁড়ালাম।
মিসেস প্রথেরো ধাক্কা দিয়ে দরজাটা খুলে ভেতরে ঢুকল। আমিও তাকে অনুসরণ করলাম। ভেতরটা আবছা অন্ধকার। চারপাশে নানান বাতিল অদ্ভুত জিনিস জড়ো করা।
মিসেস প্রথেরো বললেন, এখানে নিয়ে এলাম বলে নিশ্চয়ই বিস্মিত হচ্ছেন। খুলে বলছি শুনুন। কাল শেষ রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে যেতেই মনে হল কেউ বাইরে চলাফেরা করছে। কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলাম।
এরপর শব্দটা কিসের দেখার জন্য বাইরে বেরিয়ে এলাম। বুঝতে পারলাম, ওপরের ওই ঘরটা থেকে শব্দটা আসছে। আমি নিঃশব্দে সিঁড়ির তলায় এসে দাঁড়ালাম।
শব্দটা আবার উঠতেই আমি জিজ্ঞেস করলাম, ওখানে কে?
সঙ্গে সঙ্গে শব্দ থেমে গেল। সাড়াও পেলাম না। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে মনে হল, হয়তো আমারই ভুল। মনের অবস্থা তো ঠিক নেই। কি শুনতে কি শুনেছি। আমি ফিরে গিয়ে আবার শুয়ে পড়লাম।
আমি বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম তারপর?
–আজ সকালে ঘুম থেকে উঠেই এই ঘরে চলে এলাম। আর এটা দেখতে পেলাম। কথাটা বলে মিসেস প্রথেরো উবু হয়ে দেয়ালে উল্টো করে ঠেস দেওয়া একটা ছবি ঘুরিয়ে ধরল।
দেখলাম একটা তৈলচিত্র। কিন্তু ছবির অবস্থা দেখে বিস্মিত না হয়ে পারলাম না। সূক্ষ্ম কিছু দিয়ে এমন ভাবে ছবির ওপরটা ফালা ফালা করে আঁচড়ে দেওয়া হয়েছে যে ছবিটা কার তা চেনা যাচ্ছে না।
–এই অদ্ভুত ব্যাপারটা আমার চোখে পড়ল। এটা আঁচড়ানোর শব্দই আমি পেয়েছিলাম। ব্যাপারটা কিছু ধরতে পারছেন?
আমি বললাম, দেখে মনে হচ্ছে কেউ মনের ঝাল মিটিয়েছে। এভাবে ফালাফালা করার মধ্যে একটা আক্রোশ ফুটে উঠছে।
–এটা আমিও ভেবেছি।
–প্রতিকৃতিটা কিসের তা বুঝতে পারছেন? জিজ্ঞেস করলাম।
–এটাকে কখনো দেখেছি বলে মনে হচ্ছে না। বিয়ে হয়ে আমার এখানে আসার আগে থেকেই এ ঘরে জিনিসপত্রগুলো ছিল। কিন্তু কোনদিন ঘরে ঢুকে এসব দেখার ইচ্ছে হয়নি।
.
আমি চিত্রটা খুঁটিয়ে দেখে বুঝবার চেষ্টা করলাম। কিন্তু কিছুই বোঝা গেল না। বললাম, এমনভাবে আঁচড় কাটা হয়েছে যে কিছুই উদ্ধার করা যাচ্ছে না।
–এই ব্যাপারটাতে আমি খুবই ভীত হয়ে পড়েছি। কি করব বুঝতে পারছি না।
ছবিটা আর দেখার কিছু ছিল না। আমরা দুজনে নিচে বসার ঘরে চলে এলাম।
সোফায় বসতে বসতে মিসেস প্রথেরো বললেন, কি বলেন, পুলিসে খবর দেব?
আমি চিন্তিত ভাবে বললাম, ব্যাপারটার সঙ্গে খুনের ঘটনার কোন যোগসূত্র আছে কিনা বোঝা যাচ্ছে না। না ভেবে কিছু করাটা কি ঠিক হবে?
–তা অবশ্য ঠিক।
–আপনি কি ভাবছেন?
-দেখুন, আর মাস ছয়েক আমি এখানে থাকব। দুর্ঘটনাটা না ঘটলে অবশ্য আরও আগেই চলে যেতাম। এখন গেলে লোকে অন্যরকম কথা রটনা করবে। ছমাস কাটার পরে আমি লরেন্সকে বিয়ে করছি।
কথাটা শুনে আমি অবাক হয়ে ওর মুখের দিকে তাকালাম। ও বলে চলল, আপনি তো বুঝতে পারছেন, আসল খুনী যতক্ষণ ধরা না পড়ছে ততক্ষণ লোকে ভাববে লরেন্সই খুনটা করেছে। বিশেষ করে আমাকে যখন ও বিয়ে করবে।
–কিন্তু পুলিস তো জানিয়েছে, লরেন্স সন্দেহমুক্ত। এতে এটা পরিষ্কার যে লরেন্স খুন করেনি।
মিসেস প্রথেরো বললেন, কিন্তু লোকে এসব বুঝবে না। আমি সে জন্যেই এখানে থেকে গেলাম। শেষ পর্যন্ত দেখে যেতে চাই। মিস ক্র্যামকে আমার এখানে ছুটি কাটিয়ে যেতে এজন্যই নিয়ে এলাম।
আমি বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কি ওই মহিলাকে ওর সঙ্গে জড়িত মনে করছেন?
-না সেরকম ভাবছি না। তবে মনে হচ্ছে এ ব্যাপারে কিছু জানে। কাছে থেকে একটু বুঝতে চাইছি।
আমি বললাম, একটা ব্যাপার খুবই লক্ষণীয় মনে হচ্ছে, মিস ক্র্যাম যেদিন আপনার এখানে এলো, সেদিন রাতেই ওই ছবিটার ওপর আক্রমণ হল। তাই না?
-না, ওই এটা করেছে বলে আমার মনে হচ্ছে না। কেন করবে? না, একেবারেই অসম্ভব বলে মনে হচ্ছে।
–অসম্ভব তো অনেককিছুই মিসেস। আপনার এটাও কি অসম্ভব নয়?
–আমি তা জানি, ভিকার। আপনার মানসিক অবস্থা আমি বুঝতে পারি। সবসময় সবকথা বলে উঠতে পারি না।
