কথার মাঝখানেই আমি একসময় পকেটে হাত দিয়ে ছোট্ট কানের দুলটা বার করে আনলাম। হাতের তেলোতে নিয়ে মিসেস প্রথেরোর সামনে ধরে বললাম, দেখুন তো, এটা আপনার কিনা?
একপলক দুলটার দিকে তাকিয়ে মিসেস প্রথেরো মাথা নাড়লেন। পরে বললেন, ওটা কোথায় পেয়েছেন?
ওর সেকথার জবাব না দিয়ে আমি জিজ্ঞেস করলাম, ওটা এখন দিন কয়েক আমার কাছে থাকলে আপনার আপত্তি নেই তো?
–না, থাক না।
মিসেস প্রথেরোর সঙ্গে কথা শেষ করে আমি লেটিসের ঘরে গেলাম। ওকেও একই ভাবে দুলটা দেখালাম। বললাম, চিনতে পারছো? এটা আমার পড়ার ঘরে ফেলে রেখে এসেছিলে কেন?
প্রথমে ও অস্বীকার করল। পীড়াপীড়ি করলে স্বীকার করল যে সে ইচ্ছে করেই করেছে। অ্যানা প্রথেরো যাতে খুনের ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে এই উদ্দেশ্যেই করেছিল।
বলে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল লেটিস।
গ্রীসলডাকে একাই ভিকারেজে পাঠিয়ে দিলাম। আমি একবার ডাক্তারের সঙ্গে দেখা করলাম। সেখান থেকে বেরিয়ে আজ আবার জঙ্গলের ভেতরে ঢুকলাম।
সেদিনের পথ ধরে এগিয়ে চলতে চলতে বুঝতে পারলাম আমার আর লরেন্সের পরে আরো কেউ জঙ্গলে ঢুকেছিল। নতুন কিছু ঝোপঝাড় ভেঙ্গে দুমড়ে আছে দেখা গেল।
আরো খানিকটা পথ ধরে এগুলাম। হঠাৎ মাটির দিকে চোখ পড়তে উবু হয়ে বসলাম। দু হাত দিয়ে ঘাস-পাতা সরাতেই একটা চকচকে জিনিস চোখে পড়ল। জিনিসটা হাতে তুলে নিলাম। তারপর ভিকারেজে ফিরে এলাম।
.
ভিকারেজে এসে দেখি হস আমার অপেক্ষায় বসে আছে। ঘটনার তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে ওর খুব কৌতূহল দেখলাম। সেসব জানার জন্যই বসে আছে।
তার অহেতুক কৌতূহল আমাকে বিরক্ত করে তুলল। দু-চার কথার পরে তাকে বিদেয় করলাম।
হল ঘরের টেবিলে দেখলাম গোটা চারেক চিঠি পড়ে আছে। প্রথম তিনটে লিখেছেন, মিসেস প্রাইস রিডলে, মিসেস ওয়েদারবাই আর মিস হার্টনেল। তিনজনই অনুরোধ করে লিখেছে, আমি গেলে কিছু জরুরী কথা জানাবে।
চতুর্থ চিঠিটা গ্রীসলডার নামে। সেটা আমি ওকে দিয়ে দিলাম।
৪. তিন মহিলার চিঠি
১৬.
ঘড়ির দিকে একবার তাকালাম। তারপর তিন মহিলার চিঠি পকেটে পুরে বেরিয়ে পড়লাম। বুঝতে পারছিলাম না, এমন কি জরুরী ব্যাপার তিন মহিলাই একই সঙ্গে জানতে পারল?
একে একে তিনজনের সঙ্গে বাড়িতে গিয়ে দেখা করলাম। কিন্তু কারুর কথাই গুরুত্বপূর্ণ কিছু বোধ হল না।
মিস হার্টনেল বলল, মিঃ প্রথেরো খুন হবার দিন মিসেস লেসট্রেঞ্জ বাড়িতে ছিল না। যদিও পুলিসকে তিনি উল্টো কথাই বলেছেন। আমি জানতে চেয়েছিলাম, সে এটা জানল কি করে? বলল, সেদিন বারবার বেল বাজিয়ে সাড়া না পেয়ে বাড়ির পেছন দিক দিয়ে ঘুরে গিয়ে পরপর দরজা উঁকি দিয়ে দেখেছে। কাউকেই দেখতে পায়নি।
মিস ওয়েদারবাই, পুরো নাম না বলে কেবল এল অক্ষর উল্লেখ করে জানিয়েছে ওই নামের মহিলাকে খুনের ঘটনার সময় ভিকারেজের আশপাশে দেখতে পেয়েছে।
মিসেস প্রাইস রিডলের কথা একেবারেই হাস্যকর। ওর ঝি নাকি গেটের কাছে দাঁড়িয়ে ভিকারেজের কোন একটা ঘর থেকে হাঁচির শব্দ শুনতে পেয়েছে।
বিরক্ত হলেও প্রকাশ করলাম না। প্রার্থনার সময় এগিয়ে আসছিল দেখে উঠে পড়লাম। পথে নামতেই ডঃ হেডকের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। ..
এগিয়ে গিয়ে বললাম, আপনার সঙ্গে দেখা হয়ে ভালই হল। হস-এর মানসিক অবস্থা যা দেখছি, আমার মনে হয়, কিছুদিন তার সম্পূর্ণ বিশ্রাম নেওয়া কিংবা হাওয়া বদলের জন্য বাইরে যাওয়া দরকার।
আমার কথা শুনে ডঃ হেডক চিন্তিতভাবে মাথা নাড়লেন। পরে বললেন, হ্যাঁ, আমারও তাই মনে হয়। অনেক সময়ই ওর ব্যবহার কথাবার্তা বড্ড বিরক্তিকর হয়ে ওঠে। তবু তার জন্য দুঃখবোধ না করে পারি না।
একটু চুপ করে পরে আবার বললেন, প্রথেরোর জন্যও দুঃখ হয়। অন্য অনেকের মতই তাকে আমিও পছন্দ করতাম না। বেচারা।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, তাকে আপনি আগে থেকে চিনতেন নাকি?
-হ্যাঁ। আমি যখন ওয়েসল্যাণ্ডে প্র্যাকটিস করতাম তখন সে ওখানেই থাকতো। সে প্রায় বছর কুড়ি আগের কথা। যাক সে কথা, এদিকের খবরাখবর কতদূর?
আমি ডাক্তারকে তিন মহিলার কথা সংক্ষেপে জানালাম। শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। পরে বললেন, সেদিন সন্ধ্যাবেলা মিসেস লেসট্রেঞ্জ আমার বাড়িতেই এসেছিল। ওকে বিদায় জানাবার পরই আপনার বাড়ি থেকে মেরী এসে আমাকে ডেকে নিয়ে যায়। কার সঙ্গে দেখা করবে বলে ও তড়িঘড়ি উঠে চলে গিয়েছিল।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, কোথায় দেখা করবার কথা বলেছিল, নিজের বাড়িতে কি?
-না, সেসব কিছু বলেনি।
হঠাৎ একটা কথা মনে পড়ে গেল। জঙ্গলের ভেতরে খুঁজে পাওয়া বাদামী রঙের ক্রিস্টালটা বের করলাম। ডাক্তারকে দেখিয়ে বললাম, এই জিনিসটা কি বলুন তো?
ডাক্তার দেখলেন জিনিসটাকে। মুখে হুম শব্দ করলেন। পরে বললেন, এটা পেলেন কোথায়? মনে হচ্ছে পিকরিক অ্যাসিড।
–জিনিসটা কি?
–একটা বিস্ফোরক।
–তা জানি। কিন্তু অন্য আর কি কাজে লাগে?
ডাক্তার মাথা নেড়ে বললেন, অনেক কাজেই লাগে। আগুনের সলিউশন হিসেবেও ব্যবহার করা হয়। কিন্তু পেলেন কোথায়?
আমি হেসে বললাম, ক্রমশ প্রকাশ্য। তবে একটা অদ্ভুত জায়গা থেকে তা বলতে পারি।
.
১৭.
আমাদের রাতের খাওয়া দাওয়ার পাট চুকলে মিস মারপল এলেন। একটা চেয়ার দখল করে–বললেন, খুনের রহস্যটার সমাধানের জন্য আমাদের সকলেরই সহযোগিতা করা উচিত। কয়েকটা ব্যাপার মাথায় এসেছে সেগুলো বলতেই চলে এলাম।
