ভিকারেজের দেয়ালের পাশের ঝোঁপগুলো দেখলেই বোঝা যাবে খুনী দেয়াল টপকে ছিল কিনা।
বললাম, ওটা আমিও চিন্তা করেছি।
-ওদিকটা দেখার আগে মিস মারপলের কাছে যাচ্ছি। তাকে জিগ্যেস করে দেখি গতকাল সন্ধ্যার সময় পেছনের রাস্তা দিয়ে উনি কাউকে যেতে দেখেছেন কিনা। বিশেষ করে আমি আর মিসেস প্রথেরো যখন স্টুডিও ঘরে ছিলাম।
দুজনে মিলে মিস মারপলের বাড়ির দিকে রওনা হলাম।
বাগানেই তিনি কাজ করছিলেন। আমাদের দেখতে পেয়ে ডাকলেন। লরেন্স তাকে পাথরের টুকরোটা দিল। খুবই খুশি হলেন তিনি।
দু-চার কথার পর লরেন্স জানতে চাইল কাল মিস মারপল পেছনের রাস্তা দিয়ে কাউকে ঢুকতে দেখেছেন কিনা।
মিস মারপল বললেন, না তো, কাউকে চোখে পড়েনি।
–কিংবা ওই সময় বনের রাস্তায় কাউকে যেতে দেখেছেন?
-তা দেখেছি। অনেকেই তো যাতায়াত করেছে। ডঃ স্টোন যেখানে খননের কাজটা করছেন, বনের পথেই সেখানে যাওয়া সবচেয়ে সহজ রাস্তা। ডঃ স্টোন আর মিস ম্লাককে যেতে দেখেছি। পরে ডঃ যখন ফিরে আসছিলেন তখনই তো মিসেস প্রথেরো আর আপনার সঙ্গে দেখা হয়েছিল।
–আচ্ছা, মিস মারপল, আমি বললাম, যে গুলির শব্দটা আপনি শুনেছিলেন, তাহলে মিসেস প্রথেরো আর লরেন্সও নিশ্চয় সেটা শুনে থাকবে?
লরেন্স আমার দিকে তাকিয়ে ভ্রূ কোঁচকালো। পরে বলল, হ্যাঁ কয়েকটা শব্দ শুনেছি।
মিস মারপল বললেন, আমি মাত্র একটা শব্দই শুনেছি। ইনসপেক্টর স্নাকও এই কথা জানতে চেয়েছিল। আমার যতদূর মনে পড়ছে লরেন্স আর মিসেস প্রথেরো স্টুডিও ছেড়ে চলে যাবার পরেই শব্দটা শুনতে পেয়েছিলাম।
লরেন্স বলল, শব্দটা এমন কিছু কানে পড়বার মত ছিল না। আমার কিন্তু মনে হচ্ছে, আমরা যখন স্টুডিওতে তখনই শব্দটা হয়েছিল। তবে অ্যানাকে একবার জিজ্ঞেস করে দেখব।
কথাটা শুনে মিস মারপল আমার মুখের দিকে তাকালেন।
লরেন্স বলে চলেছে, একটা বিষয় কিন্তু আমার কাছে খুবই রহস্যজনক ঠেকছে। বুধবার রাতে মিঃ প্রথেরোর ডিনারের পর মিসেস লেসট্রেঞ্জ কেন তার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। মিঃ প্রথেরো কিন্তু এই ব্যাপারটা বাড়িতে তার স্ত্রী কিংবা অন্য কাউকে বলেননি।
মিস মারপল বললেন, এই কথাটা মিঃ ক্লেমেট জানলেও জানতে পারে।
কথা শুনে আমার সন্দেহ হল, সেদিন সন্ধ্যাবেলা যে মিসেস লেসট্রেঞ্জের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম, তা মিস মারপলের নজর এড়ায়নি।
মিস মারপল এরপর জিজ্ঞেস করলেন, এ ব্যাপারে ইনসপেক্টর স্লাক এখন কি ভাবছে?
আমি বললাম, ভদ্রলোক এখন ওল্ডহলের চাকরটাকে নিয়ে পড়েছেন। তবে মনে হচ্ছে লাভ কিছু হবে না।
মিস মারপল বললেন, আমার ধারণা ওদের দুজনের কথাবার্তা তৃতীয় কেউ শুনে থাকবে। অর্থাৎ ওরকমটা কেউ সর্বদাই করে থাকে। লরেন্স কিছু বলতে পারছেন না?
লরেন্স বলল, মিসেস প্রথেরো কিছুই জানে না, আমি ভাল করেই জানি।
-না না, আমি ঝি-চাকরগুলোর কথাই বলছি। ওরা পুলিসের কাছে মুখ খুলতে চায় না। আমার মনে হয়, তুমি একবার চেষ্টা করে দেখতে পারো।
–বলছেন? তাহলে আজ সন্ধ্যাবেলাতেই একবার চেষ্টা করব।
এরপর মিস মারপলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে লরেন্স আর আমি ফের জঙ্গলে গিয়ে ঢুকলাম।
জঙ্গলের পথ ধরে কিছুদূর যাবার পর এক জায়গায় এলোমেলো ঝোপঝাড় দেখে মনে হল, তখন থেকেই কেউ রাস্তা ছেড়ে নেমেছে।
লরেন্স বলল, একটু আগে এই চিহ্নটা দেখেই আমি বনের ভেতরে ঢুকেছিলাম। কিন্তু ভেতরে ঢোকা হয়নি।
ঝোপঝাড় সরিয়ে সেদিক দিয়ে আমরা খানিকটা এগিয়ে গেলাম। হ্যাঁ, যা ভেবেছি তাই, কেউ যে এ পথে গেছে তার চিহ্ন স্পষ্ট।
ঝোপঝাড়ের দোমড়ানো-মোচড়ানো অবস্থাটা ভিকারেজের দেয়ালের কাছাকাছি গিয়ে শেষ হয়েছে।
দেয়ালটা বেশ উঁচু, মাথায় ভাঙা বোতলের টুকরো বসানো রয়েছে। চেষ্টা করলে দড়ির মই দিয়ে দেওয়াল টপকানো অসম্ভব হবে না।
আমরা দেয়ালটার কাছাকাছি হতেই একটা শব্দ কানে এল। সামনের দিকে তাকালাম। তখনই চোখ পড়ল ইনসপেক্টর স্লাকের ওপরে। কিছু দূরেই দাঁড়িয়ে আছেন।
আমাদের দেখে বিস্মিত হলেন। জিজ্ঞেস করলেন, আপনারা এদিকে কি করছেন? আমি তাকে আমাদের উদ্যমের কথাটা জানালাম শুনে তিনি বললেন, যেই খুন করে থাকুক না কেন, এই পথ দিয়ে সে আসেনি। আমিও দেখেছি, সে রকম কোন চিহ্ন দেয়ালের কোন পাশে নেই। খুনী এসেছে সদর দরজা দিয়েই।
আমি বললাম, সেটা অসম্ভব ইনসপেক্টর।
-অসম্ভব কেন? সদর গেট তো সবসময়ই ভোলা থাকে আপনার। যে কেউই ইচ্ছে করলে ভেতরে ঢুকতে পারে।
রান্না ঘর থেকে তাকে দেখতে পাওয়া সম্ভব নয়। তাছাড়া অনেকেই জানতো আপনারা কেউ বাড়িতে নেই।
ভিকারেজের গেটের উল্টোদিকের রাস্তাটা ধরে এই জঙ্গলের ভেতর দিয়ে ইচ্ছেমত বেরিয়ে ভিকারেজে ঢোকা যায়। খুনী সেই কাজটাই করেছে।
–দেয়াল টপকেও তো ঢোকা সম্ভব। একটা দড়ির মই হলেই যথেষ্ট। বলল লরেন্স।
-না, সেটা ঝুঁকির হয়ে যেত। দেওয়াল টপকালে মিসেস প্রাইস রিডলের বাড়ির ওপরতলা থেকে চোখে পড়ে যাওয়া সম্ভব।
.
১৪.
ইনসপেক্টর স্লাক এলেন পরদিন সকালেই। জানালেন, দুটো চোরা ফোনেরই খোঁজ পেয়ে গেছি মিঃ ক্লেমেট।
আমি বিস্মিত হয়ে জানতে চাইলাম, আমার পাওয়া ফোনটার কথা।
ইনসপেক্টর বললেন, আপনি যে ফোনটা পেয়েছিলেন সেটা করা হয়েছিল ওল্ডহলের নর্থলজ থেকে। এখন ওটা ফাঁকা। পুরনো বাসিন্দারা চলে গেছে। নতুন বাসিন্দা এখনো এসে পৌঁছয়নি। লজের একটা জানালা খোলা ছিল। তবে সেখানে কোন রকম আঙুলের ছাপ পাওয়া যায়নি।
