–আপনি কি সেরকমই ভাবছেন?
তা না হলে বলুন, কেনই বা একজন অমন সুসজ্জিত মহিলা এখানে থাকতে আসবেন আর কেনই বা তিনি মিস বা মিসেস প্রথেরোকে এড়িয়ে তার সঙ্গে দেখা করতে যাবেন?
একটু থেমে আবার বললেন ইনসপেক্টর, সবটাই একসূত্রে বাঁধা। ব্ল্যাকমেল ভাবতে অসুবিধা কি? আর সেই জন্যই মিসেস লেসট্রেঞ্জের পক্ষে স্বীকার করার এত অসুবিধা।
কথা শেষ করে নীরবেই কয়েক কদম চললেন। পরে বললেন, ওল্ডহলের চাকরটার সঙ্গে কথা বললে হয়তো কিছু জানা যাবে। ওদের দুজনের কথাবার্তা তার পক্ষে শোনা অসম্ভব নয়। যদিও সে জোর দিয়েই একবার বলেছে যে ওদের কোন কথাবার্তা শোনেনি।
তবে সে জানিয়েছে মিসেস লেসট্রেঞ্জকে বাড়ির ভেতরে ঢুকতে দিয়েছিল বলে নাকি মিঃ প্রথেরো তার ওপরে খুব রেগে গিয়েছিলেন। এব্যাপারে চাকরটাও খুব ক্ষুব্ধ হয়েছিল।
–তাহলে তো আপনি অনেকদূরই এগিয়ে গেছেন দেখছি।
ইনসপেক্টর বললেন, লোকটাকে দিয়েই কাজ উদ্ধার হবে বলে মনে হচ্ছে। কেন না তারও ব্যক্তিগত রাগ রয়ে গেছে মনিবের ওপর। যাইহোক, ওই বাড়ির গাড়ির চালকের সঙ্গেও একবার কথা বলতে হবে।
হাঁটতে হাঁটতে দুজনেই আমরা ওল্ডহলে এসে পৌঁছলাম।
গাড়ি চালকের ছোকরা বয়েস। ইনসপেক্টরকে দেখে ঘাবড়ে গেল। কথা জড়িয়ে যেতে লাগল মুখে।
ইনসপেক্টর স্লাক তাকে জিজ্ঞেস করলেন, গতকাল তুমি তোমার মালিককে গাড়ি চালিয়ে গ্রামে নিয়ে গিয়েছিলে?
–হ্যাঁ, স্যার।
–তখন কটা হবে?
সাড়ে পাঁচটা, মনে আছে।
–মিসেস প্রথেরেও সঙ্গে গিয়েছিলেন?
–হ্যাঁ, স্যার।
রাস্তার মাঝখানে কোথাও গাড়ি থামিয়েছিলে?
–না স্যার।
–গ্রামে পৌঁছবার পরে কি করলে?
-কর্নেল গাড়ি থেকে নেমে গেলেন। আমাকে জানালেন গাড়ির আর দরকার নেই। মিসেস প্রথেরো কিছু কেনা কাটা করলেন। সেসব গাড়িতে রেখে আমাকে চলে আসতে বললেন।
মিসেস প্রথেরোকে গ্রামেই ছেড়ে দিয়েছিলে?
–হ্যাঁ স্যার।
–তখন কটা হবে?
সময়টা-সওয়া ছটা মত হবে।
–তাকে কোথায় ছেড়েছিলে?
–চার্চে।
মিসেস প্রথেরো কোথায় যাবেন সে সম্পর্কে তোমাকে কিছু বলেছিলেন?
–না স্যার, সে সব কিছু বলেননি।
এমন সময় লেটিস এসে ড্রাইভারকে বলল গাড়ি বার করতে, সে একটু বেরুবে।
ইনসপেক্টর লেটিসের দিকে এগিয়ে গিয়ে বললেন, তোমার সঙ্গে দেখা হয়ে ভালই হল। কয়েকটা কথা তোমাকে জিজ্ঞেস করতে চাই।
লেটিস বিরক্ত হল তা স্পষ্টতই বোঝা গেল। বলল, আমি কোন কাজেরই সময়ের হিসেব রাখি না।
–তবুও আমার ধারণা গতকাল লাঞ্চের পরেই তুমি বেরিয়ে গিয়েছিলে?
লেটিস ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাল।
–কোথায় তুমি গিয়েছিলে জানাতে আপত্তি আছে?
–মোটেই না। টেনিস খেলতে গিয়েছিলাম।
–সঙ্গে আর কে ছিল?
–হার্টলি লেপিয়ারস। বেলহামে ম্যাচ ছিল।
–কখন ফিরেছিলে?
–সময় জানি না। সময়-টময়ের হিসেব রাখা আমার পোষায় না।
–আমার মনে হয় তুমি প্রায় সাড়ে সাতটার সময় ফিরেছিলে।
–হ্যাঁ, তাই হবে।
লেটিসকে বিদায় দিয়ে ইনসপেক্টর জানালেন, এবারে ঝি-টার সঙ্গে কথা বলবেন।
আমি মিসেস প্রথেরোর সঙ্গে দেখা করব বলে চাকরকে দিয়ে ভেতরে খবর পাঠালাম। চাকর ফিরে এসে জানাল, তিনি আমাকে বৈঠকখানা ঘরে বসতে অনুরোধ জানিয়েছেন।
একটু পরেই নিচে নেমে এলেন মিসেস প্রথেরো। বসতে বসতে বললেন, আবার কিছু হয়েছে নাকি?
আমি মাথা নাড়লাম। বললেন, ডাক্তার খুবই চমৎকার মানুষ। আমার প্রতি অত্যন্ত সদয়। আচ্ছা মিঃ ক্লেমেট, একটা ব্যাপার আমি কিছুতেই বুঝতে পারছি না। গুলির শব্দটা আমার কানে এলো না কেন?
–শব্দটা হয়তো পরে হয়ে থাকবে।
–কিন্তু চিরকূটটায় যে সময় লেখা ছিল ছটা কুড়ি।
আমি বললাম, সম্ভবত ওটা খুনীর হাতের লেখা।
মিসেস প্রথেরোর মুখ কেমন বিবর্ণ দেখালো। বললেন, কি সাংঘাতিক।
আরো কিছুক্ষণ কথা বলে আমি বিদায় নিলাম। ওল্ডহল থেকে বেরিয়ে আমি একটা অব্যবহৃত পথ ধরে হাঁটতে লাগলাম।
এদিকে জঙ্গল বেশ ঘন। কিছুটা যেতেই হঠাৎ মনে হল, কেউ যেন আসছে। একটু পরেই লরেন্স রেডিংকে এগিয়ে আসতে দেখা গেল। হাতে একটা বড় পাথরের টুকরো।
আমাকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতে দেখে লরেন্স পাথরটা তুলে ধরে বলল, এটা একটা উপহার মিঃ ক্লেমেট; কোন ক্ল নয়।
জিজ্ঞেস করলাম কার জন্য উপহার?
–মিস মারপলের জন্য। কথা বলার আগে এটা দিয়ে তাকে খুশি করব। তার জাপানী বাগানের জন্য এটা খুব পছন্দ হবে, কি বলেন?
আমি হেসে বললাম, তা হবে।
–আমার ধারণা, গতকাল সন্ধ্যাবেলা কিছু যদি কেউ দেখে থাকে তবে সে মিস মারপল। অন্তত তার কাছ থেকে ক্লু উদ্ধার হতে পারে। সেসব হয়তো উনি পুলিসকে বলা প্রয়োজন মনে করেননি।
-হ্যাঁ, তা অসম্ভব নয়। আমি বললাম।
–মিঃ ক্লেমেট, এই ঘটনাটার শেষ অবধি আমি দেখতে চাই, অন্তত অ্যানার কথা ভেবে এই কাজটা আমি করব। ইনসপেক্টর স্লাকের ওপর আমার বিশেষ ভরসা নেই।
-তার মানে, তুমিও এখন গোয়েন্দাগিরি শুরু করবে?
একটু হাসল লরেন্স। তারপর বলল, আপনি এ সময়ে এই জঙ্গলে কেন?
একটু থেমে পরে বলল, আমি জানি আপনি কিসের সন্ধান করছেন, ওই একই উদ্দেশ্য আমারও। খুনীকে আমার পড়ার ঘরে ঢুকতে হলে প্রথম রাস্তা হল পেছনের রাস্তা দিয়ে গেট পেরিয়ে। দ্বিতীয় রাস্তাটা হল সদর দরজা। তৃতীয় কোন রাস্তা আছে কিনা সেই সন্ধানই আমি এখন করছি।
