–আপনি তো একজন রোগজীবাণুবিদ, তাই না ডাঃ ব্যারন?
–হ্যাঁ, আমি একজন রোগজীবাণুবিদ। এই পাঠক্রম যে কত মনোগ্রাহী সে সম্পর্কে কোনো ধারণাই আপনাদের নেই।
ব্যক্তির সুখে কিছু যায় আসে না, পিটার্স গভীর আলোচনার সূত্রপাত করলো। সমষ্টির সুখই হচ্ছে আসল মুখ, সেখানেই ভ্রাতৃত্ববোধ। যখন মজুররা স্বাধীন এবং সংঘবদ্ধ, যখন উৎপাদন যন্ত্রের মালিক তারাই, যখন যুদ্ধবাজ লোভী শোষকদের মুঠো থেকে তারা ছিনিয়ে আনে মুক্তি–তখনই আসে আসল সুখ।
–সুতরাং! তারিফ করে সমর্থন জানালো এরিকসন। ঠিক বলেছেন আপনি, বিজ্ঞানীরাই হবে আসল মালিক। তারা শুধু হবে সর্বোচ্চ শক্তি।
হিলারী এই আলোচনার মাঝ থেকে উঠে কয়েক পা এগিয়ে এলো। একটু পরে দেখলো পিটার্সও চলে এসেছে। মজা করার জন্য পিটার্স বললো, আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে, খুব ভয় পেয়েছেন?
তা পেয়েছি, নিঃশব্দে হাসলো হিলারী। ডাক্তার ব্যারন যা বলেছে খুব সত্যি। আমি বিজ্ঞানী নই, আমি সামান্য একজন নারী। গবেষণা করি না কিংবা রোগজীবাণু নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করি না। আমার বোধহয় অতখানি মানসিকতা নেই। ডাঃ ব্যারন যেমন বলেছেন, আমি সেই সুখ খুঁজে বেড়াচ্ছি–ঠিক আর পাঁচটা বোকা মেয়ের মতো।
–তাতে অন্যায়টা কী হলো? পিটার্স জিজ্ঞেস করলো।
-কী জানি, আমি হয়তো এই দলের গুরুত্ব ঠিক উপলব্ধি করতে পারছি না! বুঝতেই পারছেন–একজন সাধারণ নারী আমি, স্বামীর সঙ্গে দেখা করার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছি।
-এটা কিছু অন্যায় আপনি করেননি।
–আপনি আমার মনের কথা বুঝেছেন বলে খুব ভালো লাগছে।
–বোঝার কিছু নেই, এটাই তো সত্যি। পিটার্স একটু গলা নামিয়ে বললো, স্বামীর জন্য আপনি খুব চিন্তিত, তাই না?
–না হলে কি আজ আমি এখানে থাকতাম?
–হয়তো থাকতেন না। আচ্ছা, আপনি আপনার স্বামীর রাজনৈতিক মতামত সমর্থন করেন? আমি ধরে নিচ্ছি তিনি নিশ্চয়ই কমিউনিস্ট।
সরাসরি উত্তরটা এড়িয়ে গেলো হিলারী। বললো, কমিউনিস্ট হওয়ার কথা যদি বলেন আমি জিজ্ঞেস করবো, আমাদের এই ছোট্ট দলটার কোনোকিছু কি আপনার কাছে অদ্ভুত বলে মনে হয়েছে।
তার মানে?
–মানে–আমি বলছি যদিও আমরা সবাই এক পথের যাত্রী কিন্তু সকলের দৃষ্টিভঙ্গি এক নয়।
পিটার্স কী যেন চিন্তা করে বললো, নয় কেন বলছেন? নিশ্চয়ই আপনি কোনো কারণ খুঁজে পেয়েছেন?
হিলারী বললো, ডাঃ ব্যারনকে আমি ঠিক রাজনৈতিক মতাবলম্বী বলে আদৌ মনে করিনি। উনি ওঁর পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য অর্থ চান শুধু।
হেলগা নীডহেইমের কথাবার্তা ঠিক স্বৈরাচারীর মতো, মোটেই কমিউনিস্টের মতো নয়। আর এরিকসন?-ওঁকে আমার কেন ভীতিকর মনে হচ্ছিলো–মানে ভয়ঙ্কর রকমের স্বাতন্ত্রে বিশ্বাসী উনি।
-আমি কিন্তু মানবজাতির ভ্রাতৃত্ববোধে বিশ্বাসী। আর আপনি একজন পতিপ্রাণা স্ত্রী। আর মিসেস কেলভিন বেকার?–অন্যদের তুলনায় ওকে বিচার করা খুব কঠিন।
হিলারী বললো, বেকার কিন্তু আমাকে খুব ভয় পাইয়ে দিয়েছেন। উনি এত সাধারণ বলেই ওঁকে আমার ভয়, অথচ এইসব কিছুর সঙ্গে উনি জড়িত।
পিটার্সের গলার স্বর এবার কঠিন হলো। বললো, আপনি হয়তো জানেন, পার্টি সম্পূর্ণ বাস্তববাদী। পার্টির কাজের জন্য সবসময় বাছাবাছা লোকই কেবল নিয়োগ করা হয়।
হঠাৎ শীত করছে বলে কেঁপে উঠলো হিলারী। চলুন একটু পায়চারি করে আসি। দুজনে অনেকক্ষণ পায়চারি করলো। ঘুরতে ঘুরতে পিটার্স উবু হয়ে বসে কী যেন কুড়িয়ে নিলো, হিলারীকে দেখিয়ে বললো, দেখুন তো আপনার কিছু বোধহয় পড়ে গেছে।
হিলারী হাতে নিয়ে বললো, আমারই মুক্তোর হারটা সেদিন ছিঁড়ে গিয়েছিল, সেগুলোর মধ্যে একটা।
–আসল মুক্তো নয় আশাকরি।
হাসলো হিলারী, বললো সব ঝুটো পোশাকী গয়না। টুকটাক অনেক কথা বলার পর হিলারী জিজ্ঞেস করলো, ঠিক কোথায় যাচ্ছি আমরা বলুন তো? কেউ কিছু বলেনি আমাকে। আমরা কি
পিটার্স তাকে থামিয়ে দিয়ে বললো, আন্দাজে কিছু ধরে না নেওয়াই ভালো, যেখানে আপনাকে যেতে বলা হবে যান, যা করতে বলা হবে করে যান–ব্যস।
হিলারী হঠাৎ আবেগপ্রবণ হয়ে উঠে বললো, আপনাকে কেউ কঠিন বর্মের আড়ালে লুকিয়ে রাখুক বা কেউ হুকুম তামিল করতে বাধ্য করুক, নিজের সম্পর্কে কিছু বলতে নিষেধ করুক এটা কি আপনার ভালো লাগবে?
-বিশ্বশান্তি, বিশ্বশৃঙ্খলা এবং বিশ্বের পুনর্বিন্যাসের জন্য সবকিছু করতে আমি প্রস্তুত।
–তা কি সম্ভব? তা কি পাওয়া যায়? এই পঙ্কিল জীবনের চেয়ে যে-কোনো জিনিষই ভালো। একথা মানেন তো?
এক মুহূর্তের জন্য যেন পারিপার্শ্বিক নির্জনতা আর ভোগের নরম আলোয় মানসিক জড়তা কাটিয়ে উঠলো হিলারী। না-না-না বলে চিৎকার করে ফেটে পড়তে চাইলো। বলতে চাইলো, যে পৃথিবী আমাদের আশ্রয় দিয়েছে, তাকে কেন নিন্দে করছো তুমি? আমার এই বিশ্ব থাক, যেখানে স্নেহ মমতা আর ভুলভ্রান্তিতে ভরা মানুষ আছে। দয়াহীন মায়াহীন যন্ত্রমানবে ভরা সুন্দর বিশ্ব আমার চাই না–চাই না।
নিজেকে সংযত করে নিয়ে বললো, আপনার কথাগুলো বর্ণে বর্ণে সত্যি। আমিও হাঁপিয়ে উঠেছি। হ্যাঁ, ওদের কথা শুনে এগিয়েই যেতে হবে আমাদের।
পিটার্স হেসে বললো, হ্যাঁ সেটাই ভালো।
.
১০.
এ যেন স্বপ্নিল পথে যাত্রা, মাঝে মাঝে হিলারীর মনে হচ্ছিল, সে যেন সারাজীবন ধরে বাছা বাছা পাঁচজন সহযাত্রীর সঙ্গে চলেছে। রাস্তা ছেড়ে গাড়ি এখন চলেছে প্রায় শূন্য প্রান্তরের মধ্যে দিয়ে। মাঝে মাঝে মনে হতো–এক অদ্ভুত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তারা সব্বাই অন্য মানুষে রূপান্তরিত হয়ে গেছে।
