আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি দাদা আমি তেমন কিছু করবো না, খোসরু উত্তর দিলো, সরাসরি তার দাদার দিকে তাকিয়ে। সেলিম অনুভব করলো তার বয়স যখন খোসরুর সমান ছিলো তখন সে আকবরের কাছ থেকে এমন উচ্ছ্বসিত প্রশংসা লাভ করেনি।
তুমি খুব ভালো ঘোড়া চালাও খোসরু। আমিও তোমাকে অভিনন্দন জানাচ্ছি, সেলিম এই প্রথম মুখ খুললো।
ধন্যবাদ বাবা। আমি সেই সময়টিতেই ঘোড়া চালনায় এতো দক্ষ হয়ে উঠেছি যখন তুমি রাজধানীতে ছিলে না।
খোসরু আর খুররম, তোমরা দুজন কি আমার সঙ্গে আমার যুদ্ধহাতিগুলি পরিদর্শন করতে যাবে? আকবর জিজ্ঞাসা করলেন। আমার কিছু চমৎকার জানোয়ার আছে। খোসরু, আমি জানি তুমি নিজে বাচ্চা হাতিদের একটি আকর্ষণীয় আস্তাবল গড়ে তুলেছে। আমার মাহুতদের প্রশিক্ষণ কৌশল দেখে তুমি অনেক কিছু শিখতে পারবে।
সেলিমের উভয় পুত্ৰই উৎসাহের সঙ্গে মাথা নাড়লো এবং দাদাকে অনুসরণ করে তার হাতিশালের দিকে অগ্রসর হলো। অবুঝ মানসিকতায় সেলিমের চিৎকার করে বলতে ইচ্ছা করলো, বাবা তোমার হাতিগুলির তুলনায় আমার সংগ্রহের হাতিগুলি অনেক উন্নত মানের। কিন্তু সে কিছুই বললো না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে দেখলো তার তিনজন অতিঘনিষ্ট পুরুষ আত্মীয় তার কাছ থেকে দূরে চলে যাচ্ছে। তার বাবা ইচ্ছাকৃত ভাবে তাকে সঙ্গে যাবার প্রস্তাব করলেন না। কিন্তু বাবা যে তাকে উপেক্ষা করলেন সেটা কি তার পুত্রদ্বয় বিশেষ করে খোসরু উপলব্ধি করতে পেরেছে?
*
দুই মাস পরের ঘটনা। সেলিম এবং সুলায়মান বেগ, দুজনে সেলিমের কক্ষে রয়েছে। সেলিম সুলায়মান বেগেকে লক্ষ্য করে প্রায় চিৎকার করে উঠলো, কি বললে? তুমি ভুল শোননি তো?
মোটেই না। কুচকাওয়াজের মাঠে অনুশীলন শেষে সেনাপতিরা যে নির্দিষ্ট হাম্মাম খানায় গোসল করে আমি সেখানে ছিলাম। গোসল শেষে আমি যখন পার্শ্ববর্তী কক্ষে পোশাক পড়ছিলাম তখন দুজন সেনাকর্তা হাম্মামে প্রবেশ করে। আমি তাদের দেখতে পাইনি এবং তারাও আমার উপস্থিতি টের পায়নি। গোসলের পানি পড়ার শব্দের মধ্যেও আমি তাদের আলাপ পরিষ্কার শুনতে পাই। প্রথম জন জিজ্ঞাসা করছিলো, তুমি কি এটা শুনেছ যে সম্রাটের কিছু সভাসদ সেলিম বা দানিয়েলের পরিবর্তে খোসরুকে তার উত্তরাধিকারী নির্বাচন করতে অনুরোধ করেছে? এবং দ্বিতীয় জন উত্তর দেয়, না এমন কিছু আমি শুনিনি, কিন্তু আমি প্রস্তাবটির তাৎপর্য বুঝতে পারছি। দানিয়েল একজন অকর্মণ্য মাতাল এবং সেলিমের মাঝে আত্মনিয়ন্ত্রণ শক্তির অভাব রয়েছে যার ফলে সে যে কোনো মুহূর্তে তার পুরানো অভ্যাসে ফিরে যেতে পারে।
সেলিমের চেহারা ক্রোধে আড়ষ্ট হয়ে উঠলো তবে মুখে সে কিছু বললো না। সুলায়মান বেগ বলে চললো, এবার প্রথম জন আবার কথা বললো। সত্যিই তাই। তবে পরিস্থিতি যেদিকেই গড়াক না কেনো সেলিমকে তার অস্থাভাজন লোকদেরকে ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণকারী পদগুলিতে প্রতিস্থাপন করতে হবে। এক্ষেত্রে তার বিশ্বাসঘাতকতা মূলক বিদ্রোহে যারা তাকে অনুসরণ করেছিলো তাদেরকেই তার নির্বাচন করতে হবে। আমাদেরকে নয় যারা তার বাবার প্রতি বিশ্বস্ত থেকেছি। আমি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করবো যদি আবুল ফজলের পরিণতি আমাকে বরণ করতে না হয়। প্রথম জনের এই বক্তব্যের পরপরই আরো কিছু সেনাকর্তা হাম্মাম খানায় প্রবেশ করে এবং ঐ দুজনের কথোপকথন বন্ধ হয়ে যায়।
সেলিম চেষ্টা সত্ত্বেও কয়েক মুহূর্ত কোনো কথা বলতে পারলো না, এ সময়টি তার ব্যয় হলো নিজের আবেগের মাঝে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য। এলাহাবাদের অবস্থান করার সময় সবচেয়ে গুরুতর যে আশঙ্কা তার মনে সৃষ্টি হয়েছিলো তা হলো আকবর হয়তো তার নাতিদের একজনকে তাঁর উত্তরাধিকারী হিসেবে মনোনীত করবেন, কিন্তু এই চিন্তা খুররমকে ঘিরে কেন্দ্রীভূত ছিলো যেহেতু তাঁকেই তিনি অধিক স্নেহ করেন। অন্যদিকে খুররমের অল্পবয়স বিবেচনা করে তার সেই চিন্তা খারিজও হয়ে যায়। কিন্তু খোসরুকে মনোনীত করার বিষয়টি বর্তমানে যথেষ্ট যুক্তিযুক্ত। সে যথেষ্ট বড় হয়েছে এবং রাজধানীতে ফিরে আসার পর সেলিম লক্ষ্য করেছে খোসরুর আশেপাশে বেশ কিছু সহযোগিও জুটে গেছে যারা তার থেকে বয়সে সামান্য বড়। অবশেষে সেলিম জিজ্ঞাসা করলো, বিশ্বাসঘাতক নির্বোধেরা যে এমন সম্ভাবনার কথা আলোচনা করছে তা কি তুমি এবারই প্রথম শুনলে?
এমন সরাসরি ভাবে এবারই প্রথম। আবার যখন কথা বলা শুরু করলো তখন মনে হলো সুলায়মান বেগ কিছুটা অস্বস্তিবোধ করছে, কিন্তু তুমি যদি ক্ষমতা লাভ করো তাহলে তাদের ভাগ্য অনিশ্চিত হয়ে পড়বে বলে অনেকে আশঙ্কা করছে এটা আমি শুনেছি। তোমার এবং তোমার বাবার মাঝে যে ফাটল তৈরি হয়েছে সকলে তার দৈর্ঘপ্রস্থ পরিমাপ করার চেষ্টা করবে এটাই স্বাভাবিক এবং কীভাবে তা জোড়া লাগবে সেটাও তাঁদের ভাবনার বিষয়। এর উপর ভিত্তি করেই তারা তাদের ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা স্থির করতে চায়।
আমি এই সব জল্পনাকল্পনাকে শাখা প্রশাখা বিস্তার করতে দিতে চাই না, সেলিম ক্রুদ্ধভাবে চিৎকার করে উঠলো এবং তার পাশের নিচু টেবিলের উপর রাখা একটি রত্নখচিত থালা প্রচণ্ড জোরে দেয়ালের দিকে ছুঁড়ে মারলো।
শান্ত হও, সুলায়মান বেগ বললো। নিজেদের কিসে মঙ্গল হবে তা নিয়ে মানুষ চিন্তাভাবনা করবেই, এটাই মানুষের স্বাভাব। তোমার পক্ষে তাতে বাধা দেয়া সম্ভব নয়। তবে তোমাকেও তোমার প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। তোমার সৎগুণাবলী এবং যোগ্যতা সম্পর্কে আরো বেশি মানুষের মনে আস্থা সৃষ্টি করতে হবে।
