হঠাৎ মাথার কাটা দাগটা চুলকাতে শুরু করল বিলির। বাজ পড়েছিল ঠিক ওখানটাতেই। অন্য যে কেউ হলে সঙ্গে সঙ্গে পরপারে চলে যেত। কিন্তু সে তো যায়ইনি, বেঁচে গেছে, আগের চেয়ে ক্ষমতাশালী হয়েছে আরও। ওর বেঁচে যাওয়াটা ডাক্তারদের কাছে একটা বিস্ময়।
হ্যাঁ, সেদিক থেকে আমাকে ভাগ্যবান বলতে পারো অবশ্য। প্রশ্নটা অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছে বিলিকে। কিশোরকে বিদেয় করার জন্যে একটা বুদ্ধি বের করল সে।
কিশোর! চেঁচিয়ে উঠল রবিন। আগুন! তোমার পকেটে ধোয়া!
চট করে চোখ ফেরাল কিশোর। সত্যিই তার জ্যাকেটের পকেট থেকে ধোয়া বেরোচ্ছে।
হাসি ঠেকানোর জন্যে জোরে জোরে চিউয়িং গাম চিবাতে লাগল বিলি।
পকেট থেকে সেলুলার ফোনটা টেনে বের করল, কিশোর। ধোয়া বেরোচ্ছে ওটা থেকে।
আগুন লাগল কি করে? চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে মুসা। ব্যাটারি কখনও এভাবে পোড়ায় বলে তো শুনিনি!
হাতে ছ্যাকা লাগতে তাড়াতাড়ি যন্ত্রটা ফেলে দিল কিশোর। মাটিতে পড়ে গলতে শুরু করল ওটার প্লাস্টিক বডি। ধোয়া বেরোচ্ছে অনবরত। হাতের তালুতে আঙুল বোলাতে লাগল সে।
পুড়ে যাওয়া ফোনটার দিকে তাকিয়ে আনমনে মাথা নাড়ার ভঙ্গি করল। বিলি, এসব আধুনিক যন্ত্রপাতির ওপর বিশ্বাস নেই। কখন যে কোন অঘটন ঘটাবে কিশোরের দিকে এতক্ষণে মুখ তুলে তাকাল সে। তোমাদের কথা শেষ হলে যেতে পারো। আমার জরুরী কাজ পড়ে আছে।
গম্ভীর হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে রয়েছে কিশোর। তারপর বলল, সাহায্যের জন্যে ধন্যবাদ। অনেক বিরক্ত করলাম তোমাকে।
না-না, ও কিছু না।
একটা এঞ্জিন খোলায় মন দিল বিলি।
০৫.
ছোট্ট যে বাংলো বাড়িটাতে বাস করে বিলি আর তার মা, এই এলাকার সবচেয়ে পুরানো বাড়ি ওটা। রঙ চটে গেছে বহুকাল আগে। কাত হয়ে পড়েছে একপাশে। সামনের সিঁড়ির তিনপাশ ঘিরে আগাছা জন্মেছে। ড্রাইভওয়েটা ঘাস আর আগাছায় ঢেকে গিয়ে চেনাই যায় না। বাড়ির সামনে সুপ হয়ে আছে জঞ্জাল।
বাড়ি ফিরে বিলি দেখল তন্ময় হয়ে টেলিভিশনের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন। তার মা। নিজের সমান লম্বা একটা কাউচে কনুইয়ে ভর দিয়ে কাত হয়ে শুয়েছেন। টক-শো হচ্ছে টিভিতে। গভীর মনোযোগে ওদের বাদানুবাদ শুনছেন তিনি।
দরজায় দাঁড়িয়ে মুচকি হাসল বিলি। পর্দার দিকে বিশেষ দৃষ্টিতে তাকাল। সঙ্গে সঙ্গে চ্যানেল বদলে গিয়ে দেখা গেল এমটিভি।
ঝটকা দিয়ে ফিরে তাকালেন মা। চিৎকার করে বললেন, রিমোট টেপাটেপি করছিস কেন? দে আগেরটা!
গায়ে শক্ত কি যেন লাগল তার। চোখ নামিয়ে দেখেন রিমোটটা তাঁর পাশে কাউচেই পড়ে আছে। বিস্মিত চোখ তুলে তাকালেন ছেলের দিকে।
বিলি তখন টিভির দিক থেকে নজর সরিয়ে নিয়েছে। চকোলেট মিল্কের একটা ব্যাগ কাটতে ব্যস্ত। রিমোট টিপে অনুষ্ঠান আবার আগের চ্যানেলে ফিরিয়ে আনলেন মা।
কি যে ছাইপাশ দেখো তুমি, মা, বিলি বলল। যত সব ছাগলের দল!
ছাগল হোক আর যাই হোক, টেলিভিশন তো ওদেরকে দাওয়াত করে নিয়ে যায়, কাটা জবাব দিলেন-মা। তোকে তো নেয় না।
ছাগলে ছাগল চেনে, পাগলে পাগল, যেন কি একটা মস্ত রসিকতা করে ফেলেছে ভেবে খিকখিক করে হাসতে লাগল বিলি। বিশ্রী ভঙ্গিতে শব্দ করে ঢেকুর তুলল।
মাথা নাড়তে নাড়তে মা বললেন, ভদ্ৰব্যবহার করতে পয়সা লাগে না, বিলি। তুই আর মানুষ হবি না কোনদিন। কোন মেয়ে তোর এই জঘন্য ঢেকুর। তোলা সহ্য করবে?
যে করবে, তাকে দেখলে তোমার জবান বন্ধ হয়ে যাবে, মা।
ছেলের দৌড় জানা আছে মায়ের। তার কথাকে গুরুত্বই দিলেন না। আবার মনোযোগ ফেরালেন টেলিভিশনের দিকে।
মা যতই খোঁচা দিয়ে কথা বলুক, ভাবছে বিলি, টেলিভিশনের ওই গর্দভগুলোর দলে কোনদিন যোগ দেব না আমি। ওদের চেয়ে অনেক বেশি ক্ষমতা আমার, অনেক বড় কাজ করতে পারি। সারা পৃথিবীকে কাঁপিয়ে দিতে পারি।
মনে মনে নানা রকম পরিকল্পনা করতে লাগল বিলি। সবগুলোই মিলিকে জড়িয়ে। ওকে বাদ দিয়ে কোন কিছু করার ইচ্ছে নেই তার। মিলি তার সঙ্গে অন্য মেয়েদের মত খারাপ আচরণ করে না। তাকে অবহেলা করে না। এড়িয়ে চলে না। তাকে বোকা বলে না। তার রসিকতায় হাসে। তার খাতায় ভাল ভাল কথা লিখে দেয়। তাকে উৎসাহ দেয়। তাকে যে পছন্দ করে, তার জন্যে মায়া আছে, তার খারাপ কিছু হলে কষ্ট পাবে, এটা স্পষ্টই বুঝিয়ে দেয়। তাকে বেঁচে থাকার প্রেরণা জোগায়।
দরজায় টোকার শব্দ ভাবনার জগৎ থেকে ফিরিয়ে আনল বিলিকে। বিশেষ ধরনের পরিচিত টোকা। পটেটো এসেছে। দরজা খুলতে যাওয়ার আগে টেলিভিশনের দিকে তাকাল বিলি আরেকবার। মুহূর্তে হট্টগোল শুরু হয়ে গেল তাতে। ছবি ঠিকই থাকল, শব্দ হয়ে গেল গোলমেলে। কিছু বোঝ যায় না। মুচকি হাসল সে। গেল বিরক্তিকর গাধাগুলোর বকবকানি।
মা কিছু বলার আগেই ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে গেল সে। দরজায় দাঁড়িয়ে আছে পটেটো। ঠোঁটে আঙুল রেখে তাকে এখানে কথা না বলতে ইশারা করল। নেমে গেল আঙিনায়।
পিছন পিছন গেল পটেটো। বললে বিশ্বাস করবে না, বিলি। আজ কারা এসেছিল আর্কেডে, তুমি কল্পনাও করতে পারবে না!
অনুমান করতে বলছ? গোয়েন্দা।
থমকে দাঁড়াল পটেটো। কি করে জানলে?
গ্যারেজেও হানা দিয়েছিল ওরা।
তোমাকে খুঁজে বের করল কিভাবে?
সেটাই তো আমি জিজ্ঞেস করতে চাই তোমাকে! কঠিন হয়ে উঠল বিলির কণ্ঠ। নিশ্চয় কোন ফাঁকে ভুল করে আমার নামটা বলে দিয়েছ ওদের কাছে।
