হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিল বিলি। ওর সঙ্গে তাল রাখতে হিমশিম খেয়ে গেল পটেটো।
না না, আমি একবারও তোমার নাম বলিনি। সত্যি।
মাঠে বেরিয়ে এসেছে ওরা। বিলিদের বাড়ির পেছনের তৃণভূমিটা বছরের এসময়ে সবুজ ঘন ঘাসে ভরা থাকে। এক সময় এটা ফক্স পরিবারের সম্পত্তি ছিল, বিলির দাদার। কিন্তু পরে হাতছাড়া হয়ে যায়। যেমন করে সব কিছু খুইয়েছে ওরা।
কাঁটাতারের বেড়াটা লাফ দিয়ে পেরিয়ে এল বিলি। তারের মাঝের ফাঁক দিয়ে ঢোকার চেষ্টা করতে লাগল পটেটো।
থাকো ওখানেই! বিলি বলল।
ঢাল বেয়ে পাহাড়ে উঠতে শুরু করল সে।
পটেটো ভাবল ওর ওপর রেগে যাওয়ায় ওকে সঙ্গে যেতে মানা করছে বিলি। সত্যি বলছি, বিলি, আমি কিছু বলিনি। তোমার কোন ক্ষতি কি আমি করতে পারি?
পাহাড়ের ওপরে ছোট একটা চত্বরমত জায়গা আছে। ঘাস খেতে খেতে ওখানে উঠে যায় গরুর পাল। রাতে বেশির ভাগ নেমে আসে। কিছু কিছু বেশি দুঃসাহসী গরু আছে, বাড়ি ফিরতে ইচ্ছে করে না, রাতেও থেকে যায় ওখানেই। গরু কি করে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘুমায়, ভাবতে অবাক লাগে বিলির।
তুমি চলে যাও, পটেটো, ফিরে তাকিয়ে বলল বিলি। আমার এখন কাবাব খেতে ইচ্ছে করছে।
ভারী দম নিল পটেটো। কাঁপা গলায় বলল, এখন? না না বিলি, গরু ঝলসানোর সময় এটা নয়!
জবাবে হা-হা করে হাসল বিলি। যাও, চলে যাও। প্র্যাকটিসটা চালু রাখতে হবে আমাকে। নইলে শেষে দেখা যাবে অস্ত্র ভোতা হয়ে গেছে। ঠিকমত কাজ করছে না আর।
প্লীজ, বিলি, এখন ওসব করতে যেয়ো না!
ওর কাকুতি-মিনতিতে কান দিল না বিলি। আবার হেসে উঠল। সে কিছু করতে গেলে পটেটোর এভাবে বাধা দেয়া দেখে মজা পায়।
মানুষের সাড়া পেয়ে এক এক করে জেগে উঠতে শুরু করেছে গরুগুলো। বাবা করে ডাকছে। বুঝতেই পারছে না কি ভয়ঙ্কর ব্যাপার ঘটতে যাচ্ছে, ওদের ভাগ্যে।
পটেটোর কাছ থেকে সুরে এসেছে বিলি। পাহাড়ের ওপরে উঠে। আকাশের দিকে চোখ তুলে তাকাল। মেঘ জমেছে। তারা ঢেকে দিচ্ছে। ঝোড়ো বাতাস বইতে শুরু করল। পা ফুলে উঠল মেঘ। ঘন নীল, হয়ে গেল রঙ। বিদ্যুৎ-শক্তিতে বোঝাই। প্র্যাকটিস করার উপযুক্ত সময়।
হ্যাঁ, হ্যাঁ, শুনতে পাচ্ছি আমি, আকাশের দিকে তাকিয়ে মেঘের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করল বিলি। আমি রেডি। চলে এসো!
আরও ছড়িয়ে পড়ল মেঘ। সব তারা ঢেকে দিল। ঝোড়ো বাতাসের গর্জনের মাঝে গরুগুলোর ডাকাডাকি বেড়ে গেল। আকাশের অনেক উঁচুতে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে ঘন ঘন।
আমি এখানে! চিৎকার করে বলল বিলি। এই যে এখানে! পারলে এসে ধরো আমাকে! বলেই যতটা জোরে সম্ভব দৌড়াতে শুরু করল সে। গরুগুলোর মাঝখানে চলে এল।
কই আসছ না কেন? আকাশের দিকে তাকিয়ে আরও জোরে চিৎকার করে উঠল সে। এসো! ধরো আমাকে!
দুই হাত ছড়িয়ে দিয়েছে সে। তাকিয়ে আছে রেগে যাওয়া মেঘের দিকে। বা এসো এসো! ধরো। আমি অপেক্ষা করছি! ওপর দিকে দুই হাত তুলে দিল সে। এসো! ধরো আমাকে।
বিলি দেখেছে, এভাবে ওপর দিকে হাত তুলে দিলে বিদ্যুৎ ছুটে আসে তার দিকে। বাড়ির ছাতে বসানো দণ্ডের মত আকর্ষণ করে সে বিদ্যুৎকে।
ফেটে পড়ল যেন আকাশটা। কোটি কোটি সাপের আঁকাবাকা জ্বলন্ত লেজ সৃষ্টি করে দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ল বিদ্যুৎ-শিখা। বজ্রপাত ঘটতে লাগল ধরণী কাঁপিয়ে।
অন্যান্যবারের মত এবারেও ব্যতিক্রম ঘটল না। বিদ্যুৎ-শিখা ছুটে ছুটে আসতে লাগল তার দিকে। গরুগুলোর মাঝখান দিয়ে ছুটে বেড়াতে লাগল সে। বিদ্যুৎ তাকে ধরতে না পেরে যেন প্রচণ্ড আক্রোশে গরুগুলোকে আঘাত হানতে লাগল। ভয়ে চিৎকার শুরু করেছে ওগুলো। বজ্রপাতে ঝলসে যাচ্ছে। মাংসপোড়া দুর্গন্ধে ভরে গেল বাতাস।
একটা বজ্র আঘাত হানল বিলিকে। শিরা বেয়ে তীব্র গতিতে বিদ্যুৎ ছড়িয়ে গেল সারা শরীরে। হাতের আঙুলের মাথা দিয়ে ছড়ছড় করে ছিটকে বেরোতে লাগল স্ফুলিঙ্গ। পায়ের পাতা আর আঙুল বেয়ে নেমে গেল মাটিতে।
পড়ে গেল বিলি।
থেমে গেল বজ্রপাত, কমে এল বিদ্যুৎ চমকানো।
মাটিতে লুটিয়ে পড়ে আছে বিলি। যেন অগ্নিপরীক্ষায় ক্লান্ত। দেহটা অসাড়। হাত-পা ঠিকমত নড়াতে পারছে না। অন্য কোন মানুষ হলে পুড়ে ছাই হয়ে যেত। বিলির কিছু হয়নি। তবে প্রচণ্ড ইলেকট্রিক শক সামলে নিতে কিছুটা সময় লাগবে।
দূর থেকে এতক্ষণ এই ভয়াবহ দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেছে পটেটো। দৌড়ে এল কাছে। পড়ে থাকা দেহটার ওপর ঝুঁকে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জানতে চাইল, বিলি! তুমি ঠিক আছ তো? বিলি!
খবরদার! ধোরো না এখন আমাকে! ফোঁস করে উঠল বিলি। উঠে বসল। ওর কানের দুল, দাঁতের গর্ত ভরাট করা ধাতুতে এখনও স্পার্ক করছে। বিদ্যুৎ। শরীরের মধ্যে বিদ্যুৎ জমে আছে। বাতাসে বিদ্যুতের গন্ধ।
খুব ভাল আছি, হাসিমুখে জবাব দিল সে।
.
০৬.
একটা মরা গরুর সামনে এসে দাঁড়ালেন শেরিফ রবার্টসন। হতভাগ্য প্রাণীটার খোলা নিষ্প্রাণ দুই চোখে এখনও মৃত্যুক্ষণের বিস্ময়ের ছাপ প্রকট। ওটার সামনে থেকে সরে গিয়ে সেলুলার ফোন তুলে কানে ঠেকালেন। হিলটাউন শেরিফ ডিপার্টমেন্টে মান্ধাতার আমলের যন্ত্রপাতি সরিয়ে কিছু কিছু যেসব আধুনিক জিনিস ঢোকানো হচ্ছে, এই ফোনটা তার একটা।
পুরানো বন্ধু অস্টারিয়ান লাইটনিং অবজারভেটরির প্রোজেক্ট ডিরেক্টর হোমার বেলের সঙ্গে কথা বলছেন তিনি। গতরাতের বিদ্যুৎ-ঝড় সম্পর্কে শেরিফকে বিস্তারিত জানাচ্ছেন বেল।
