আর কি করতে পারি তোমার জন্যে? জিজ্ঞেস করল বিলি।
আর কিছু না। বাবা বলেছিল, আজ একসঙ্গে লাঞ্চ খাব আমরা।
দ্রুত ভাবনা চলল বিলির মাথায়। মিস্টার হাওয়ার্ড যখন নেই, সে নিজেও তো খাওয়ানোর প্রস্তাব দিতে পারে মিলিকে। ও নিশ্চয় সেটা পছন্দ করবে।
তোমার কি খিদে পেয়েছে? জানতে চাইল বিলি। তোমাকে আমি খাওয়াতে পারি। কি খাবে? হেসে বলল, আমার কাছে জেলি ডোনাট আছে। কালকের বানানো। তবে এখনও তাজা। খাবে একটা?
নিজের অজান্তেই এক পা আগে বাড়ল সে।
পিছিয়ে গেল মিলি। মাথা নাড়ল।
বিলি মনে করল তার নোংরা পোশাক দেখেই সরে গেছে মিলি। ওর ঝলমলে জামাকাপড় আর চকচকে জুতোর দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল বিলির বুক থেকে। খাবে না কেন? কালকের বলে?
এই সময় একটা টো ট্রাক ঢুকতে দেখা গেল গ্যারেজের গেট দিয়ে। এসে গেছেন মিস্টার হাওয়ার্ড–মিলির বাবা এবং বিলির বস।
ট্রাকটাকে দেখামাত্র তাড়াতাড়ি দুই পা পিছিয়ে গেল বিলি।
কাছে এসে দাঁড়াল ট্রাক। ক্যাব থেকে বেরিয়ে এলেন জোসেফ হাওয়ার্ড লম্বা, সুদর্শন। মিলির দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বললেন, সরি, দেরি হয়ে গেল। অনেকক্ষণ এসেছিস?
মাথা নাড়ল মিলি, না, এই এলাম।
ওই অভাগা পিজ্জা-বয়টার পোড়া গাড়িটা আনতে আনতে দেরি হয়ে। গেল।
মেয়ের সঙ্গে কথা শেষ করে বিলির দিকে তাকালেন হাওয়ার্ড। বিলি, পোড়া গাড়িটার একটা ব্যবস্থা করো। তাড়াহুড়ো নেই। ও হ্যাঁ, ভাল কথা, রেডিওতেই তোমাকে বলতে চেয়েছিলাম কয়েকটা ছেলে তোমার সঙ্গে দেখা করতে আসবে। শখের গোয়েন্দা। আমাকে এসে ধরল। বললাম, আমার গ্যারেজেই কাজ করে। ছেলেগুলোকে ভাল মনে হলো আমার। বলে দিলাম, তুমি অবশ্যই দেখা করবে।
বিষণ্ণ, গভীর ভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকাল বিলি। মনে মনে প্রশ্ন করল নিজেকে, গোয়েন্দা, না? আমার কাছে কি কাজ ওদের? গাড়ি সেরে দেয়ার জন্যে ভাল মেকানিক চায়?
কিন্তু নিশ্চিত জবাবটা পেল না। ESR।
মেয়ের সঙ্গে হেসে হেসে কথা বলছেন হাওয়ার্ড। সেদিকে দীর্ঘ একটা মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে টো ট্রাকটার দিকে পা বাড়াল সে।
*
হু, এই বোকাটাই তাহলে মারা পড়েছে?
লেসলি কার্টারিসের ছবিটার দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল বিলি। লেসলির স্কুল জীবনের ছবি। ঝাকড়া চুল, সুন্দর স্বাস্থ্য, মিষ্টি হাসিতে দুনিয়া জয় করার ভঙ্গি। এধরনের মানুষকে অপছন্দ করে বিলি, দুচোখে দেখতে পারে না। নিজের চেয়ে ভাল স্বাস্থ্য আর সুন্দর চেহারার কাউকে দেখলেই ঈর্ষা হয় তার। ঘৃণা হয়। একে শেষ করে দিয়েছে বলে অনুশোচনা তো দূরে থাক, খুশি হলো মনে মনে।
ঘটনাটা খুব দুঃখজনক, নীরস কণ্ঠে বলল সে।
ছবিটা দিয়েছে কিশোর। কিন্তু রবিনের হাতে ফিরিয়ে দিল বিলি। কিশোরের তীক্ষ্ণ চোখের দিকে তাকানোর সাহস হচ্ছে না তার। দৃষ্টি তো নয়, যেন ধারাল ছুরি। অন্তরের অন্তস্তলটা পর্যন্ত যেন দেখে নেয়। রবিন কিংবা মুসার দিকেও তাকাল না সে। যন্ত্রপাতি নিয়ে খুটুরখাটুর শুরু করল। অনুভব করল, তিন জোড়া চোখ এখন তাকিয়ে আছে তার দিকে। নিচের দিকে মুখ নামিয়ে রেখে কাজ করার ভান করতে করতে জানতে চাইল, কি করে মারা গেল?
শেরিফ আর করোনারের কাছে শুনলাম বজ্রপাতে, জবাব দিল কিশোর।
না হেসে পারল না বিলি। হ্যাঁ, এরকম ঘটনা এখানে আজকাল হরহামেশাই ঘটে। মোড়ক খুলে একটা চিউঙিং গাম মুখে ফেলে চিবাতে শুরু করল। কোথায় মরল?
ভিডিও আর্কেডের বাইরে, জানাল কিশোর। লোকটা যখন মারা গেছে। আকাশে মেঘ থাকলেও একবারও বিদ্যুৎ চমকায়নি। বজ্রপাতের শব্দ শোনা যায়নি।
বিলির ওপর থেকে ক্ষণিকের জন্যেও চোখ সরাচ্ছে না সে।
অস্বস্তি বোধ করতে লাগল বিলি। এভাবে তাকিয়ে আছে কেন ছেলেটা? কিছু আঁচ করে ফেলেছে? নাকি কায়দা করে ওর পেটের কথা বের করার চেষ্টা এটা?
কাল রাতে তুমি ওখানে গিয়েছিলে, তাই না? জিজ্ঞেস করল কিশোর।
হ্যাঁ, সত্যি জবাবটাই দিল বিলি। নিজেকে বোঝাল, মিথ্যে যত কম বলে পার করা যায়, ততই মঙ্গল। এই ছেলেটাকে ফাঁকি দেয়া সহজ হবে না।
তাহলে নিশ্চয় অস্বাভাবিক কিছু চোখে পড়েছে তোমার?
মাথা নাড়ল বিলি। দেখো, আমি যখন খেলা নিয়ে মেতে থাকি, দুনিয়ার কোন কিছুই চোখে পড়ে না আমার। অ্যাটম বোমা ফাটালেও শুনতে পাব না
আমি কেন, কালা নাকি মোটর মেকানিক বিলি। চট করে ভা।
কেন, কালা নাকি ব্যাটা তুই? মনে মনে রেগে উঠল মুসা। প্রথম দর্শনেই অপছন্দ করেছে এই মোটর মেকানিককে।
যেন তার মনের কথাটাই শুনে, ফেলল বিলি। চট করে চোখ তুলে তাকাল মুসার দিকে। ওর দিকেই তাকিয়ে আছে নিগ্রো ছেলেটা। তবে কোঁকড়া-চুল ছেলেটার মত দৃষ্টির তীক্ষ্ণতা নেই এর, আছে ঝাজ।
আবার চোখ নামিয়ে নিজের কাজে মন দেয়ার ভান করল বিলি।
কিশোর বলল, বিলি, একটা ব্যক্তিগত প্রশ্ন করি? নিজেকে কি ভাগ্যবান মনে করো তুমি?
আমি? নিজের বুকে হাত রাখল বিলি। মনে মনে বলল, বেকুবটা বলে কি? আমি ভাগ্যবান হলে দুনিয়ায় হতভাগা মানুষ আর কে? নাহ, চোখ দেখে যতটা মনে হয়েছে, ততটা বুদ্ধিমান তো নয়। জবাব দিল, না, সেটা মনে করবার কোন কারণ নেই।
কেন ভাগ্যবান, বুঝিয়ে দিচ্ছি আমি। তোমার মাথায়ও বাজ পড়েছিল। কিন্তু বেঁচে গেছ। বাকি সব কজন মারা গেছে। ওদের চেয়ে তুমি ভাগ্যবান নও?
