শেষ ওকে দেখেছি এই মেশিনটাতে একটা সিকি ঢোকাতে, পাশ থেকে বলল আরেকটা কণ্ঠ।
ফিরে তাকাল কিশোর। গোলআলুর মত মুখওয়ালা টিনেজ অ্যাটেনডেন্ট রবিনের সঙ্গে কথা বলছে মেশিনটার দিকে তাকিয়ে। পেছনে দাঁড়িয়ে আছে মুসা।
তারপর বেরিয়ে গেল, পটেটো বলছে। কিছুক্ষণ পর শুনলাম অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন।
কৌতূহলী দৃষ্টিতে ওকে দেখতে লাগল কিশোর। কিন্তু একটা চোখ রয়েছে মেশিনের পর্দায়। নামের স্তম্ভ ফিরে আসার অপেক্ষা করছে।
পটেটোর দিকে তাকাল রবিন, অ্যাম্বুলেন্স আসার আগে বাইরে অস্বাভাবিক কিছু চোখে পড়েছে তোমার?
মাথা নাড়ল পটেটো। শূন্য দৃষ্টিতে তাকাল। চোখ মিটমিট করল। বলা কঠিন। আমি বলতে চাইছি, এতটাই শোরগোল শুরু হয়েছিল, আলাদা করে কিছু বোঝা যাচ্ছিল না, বলেই ঝট করে ফিরে তাকিয়ে দেখে নিল মুসাকে, সে আবার অস্বাভাবিক কিছু ঘটানোর তালে আছে কিনা। এরকম ঘটনা ঘটলে যা হয় আরকি।
কাছাকাছি এমন কাউকে দেখেছ, যে মনে করতে পারবে কোন কিছু দেখেছে?
অ্যা…না মনে পড়ছে না।
পটেটোর পা থেকে মাথা পর্যন্ত চোখ বোলাল কিশোর। কথা গোপন করার জোর চেষ্টা চালাচ্ছে টিনেজ অ্যাটেনডেন্ট, বুঝতে অসুবিধে হলো না তার। কাকে বাঁচাতে চাইছে সে? কেন? মেশিনের পর্দায় ফিরে গেল তার। দৃষ্টি। আবার ফিরে এসেছে নামের স্তম্ভ।
অই, আলু, চিৎকার করে উঠল একটা ছেলে, আমার ভাঙতি পয়সা কই?
বাচল যেন পটেটো।এক্সকিউজ মি বলে তাড়াতাড়ি ছুটে গেল, সেদিকে।
রবিন, এদিকে এসো, হাত নেড়ে ডাকল কিশোর। পর্দার দিকে হাত তুলল, দেখো।
কি? চোখের পাতা সরু করে তাকাল রবিন।
ফাইল। বজ্রপাতের শিকার অন্য ছেলেগুলোর নাম কি ছিল?
ফাইল খুলল রবিন। একটা লিস্ট দেখল। হ্যারি গাটস… মরিস নিউম্যান..বিলি ফক্স বব-..
দাঁড়াও দাঁড়াও! বিলি ফক্স। ওর মিডলনেমটা কি? লেখা আছে?
আছে।
বিলি পিটার ফক্স?
হ্যাঁ।
বজ্রপাতের শিকার হয়েছিল পাঁচজন। তাদের মধ্যে একজন বেঁচে গিয়েছিল। তার নাম বিলি পিটার ফক্স। তাই তো?
ফাইলের দিকে আরেকবার তাকিয়ে মাথা ঝাঁকাল রবিন, হ্যাঁ। তুমি জানলে কি করে?
ওই দেখো, আবার পর্দার দিকে হাত তুলল কিশোর। হাই স্কোরারদের মধ্যে ওর নাম সই করা আছে নামের আদ্যক্ষর। বি পি এবং এফ। কি দাঁড়াল? বিলি পিটার ফক্স।
পর্দার কাঁচে সইটার ওপর আঙুল রাখল সে। ধীরে ধীরে পাশে সরাল আঙুলটা। তারিখ এবং সময় লেখা আছে। লেসলি কার্টারিসের নাম আছে। কখন খেলেছে, সময় লেখা আছে
পর্দা থেকে হাত সরিয়ে এনে দৃনে দুই সহকারীর মুখোমুখি হলো। কিশোর। এর একটাই মানেনসৰি কাৰ্টারিস খুন হওয়ার সময় বিলিও–এখানে ছিল।
.
০৪.
ওয়াকম্যানের হেডফোন কানে লাগিয়ে একটা বুইক গাড়ির পেটের নিচে ঢুকে, কাজ করছে বিলি ফক্স। এ শহরের অর্ধেক ছেলেই মেকানিক। বিলিকে যা দিচ্ছেন তার অর্ধেক বেতনে ওর চেয়ে দক্ষ মেকানিক রাখতে পারতেন জোসেফ হাওয়ার্ড। কিন্তু ছেলেটাকে দেখে মায়া হয়েছে। তাই ইচ্ছে করেই বেতন বেশি দিচ্ছেন।
চিত হয়ে থেকেই পিঠ উঁচু করে পিঠের নিচের গদিটা টেনে ঠিক করল বিলি। পাশে হাত বাড়াল রেঞ্চের জন্যে। পেল না। কোথায় ওটা দেখার জন্যে মুখ ঘুরিয়ে তাকাল। চোখে পড়ল একজোড়া সুন্দর পা।
হাসিতে ঠোঁটের একটা পাশ নিচে নেমে গেল ওর। যে কোন জায়গায় লক্ষ পায়ের মধ্যে ওগুলোকে চিনে নিতে পারবে সে। স্কুলে, এখানে ওখানে, নানা জায়গায় ওই পা আর পায়ের মালিককে হাজার বার দেখেছে। জীবনে। এক জিনিস বলতে সবচেয়ে বেশি দেখেছে বোধহয় ওই পা-জোড়া।
গ্যারেজের কংক্রীটের মেঝেতে হাই-হীলের খটখট শব্দ তুলে গাড়িটার দিকে এগিয়ে আসছে পায়ের মালিক। চিত হয়েই হাত আর পায়ের সাহায্যে নিজের শরীরটাকে মুচড়ে গাড়ির নিচ থেকে বের করে আনল বিলি। স্প্রিঙের মত লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল।
ওকে হঠাৎ এভাবে উঠে দাঁড়াতে দেখে চমকে গেল হাই-হীলের মালিক। পিছিয়ে গেল এক পা।
তাড়াতাড়ি কানের ওপর থেকে হেডফোন সরিয়ে নিল বিলি। বেজবল ক্যাপটা টেনে ঢেকে দিল মাথার কাটা দাগ। তার সবচেয়ে মধুর আর মোলায়েম হাসিটা উপহার দিয়ে বলল, মিলি, কেমন আছ?
ওফ, বিলি, যা কাণ্ড করো না! ভয় পাইয়ে দিয়েছিলে!
কথা হারিয়ে ফেলল বিলি। ভয় দেখানো দূরে থাক, কোনমতেই সামান্য চমকে দিতেও চায় না সে মিলিকে।
সরি, মিলি, মেয়েটার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল সে। তার মতে পুরো কাউন্টিতে এত সুন্দর চোখ অন্য কোন মেয়ের নেই। হয়তো পুরো আমেরিকাতেও এত সুন্দরী নেই আর কেউ। এটাও কেবল ওর ধারণা। মিলি হলো বিলির বয়েসী একেবারে নিখুঁত সুন্দরী একটা মেয়ে।
নিজের হাতের দিকে তাকাল সে। তেলকালি মাখা। গ্যারেজে থাকলে সব সময়ই হাতে ময়লা লেগে থাকে। হাত দুটো সরিয়ে নিল।
বাবা কোথায়? জানতে চাইল মিলি।
প্রশ্নটা নিরাশ করল বিলিকে। সে ভেবেছিল শুধু তার সঙ্গেই দেখা করতে এসেছে মিলি। ওর সঙ্গে কথা বলতে।
একটা নষ্ট গাড়ি আনতে গেছেন।
মিলির মুখের দিকে তাকিয়ে রইল বিলি। ওকে সামনে দেখলে কিছুতেই, চোখ সরাতে পারে না। লক্ষ করেছে এতে অস্বস্তি বোধ করে মিলি। কিন্তু সে সরাতে পারে না, কি করবে? এত সুন্দর একটা মুখের ওপর থেকে চোখ সরায় কি করে মানুষ? শিল্পীর হাতেগড়া চেহারা!
