মধ্যে বিদ্যুৎ-স্ফুলিঙ্গ ছোটাতে শুরু করল সে। ঘুরতে ঘুরতে মগজে জমা হচ্ছে। অনুভব করতে পারছে। তীরে আছড়ে পড়ার জন্যে ছুটে চলা ঢেউয়ের মত শক্তি সঞ্চয় করছে স্ফুলিঙ্গগুলো। মগজ থেকে বের করে আনল সে। ঘাড়ে নামাল। সেখান থেকে পার করে দিতে লাগল ডান হাতে। বাহু আর আঙুল বেয়ে পৌঁছে গেল আঙুলের ডগায়। ইথারে ভর করে অদৃশ্য বিদ্যুৎ-শক্তি ঢুকে যেতে শুরু করল হাওয়ার্ডের বুকে।
চার্জ হয়ে যাচ্ছে নিথর হৃৎপিণ্ড। আচমকা ঝটকা দিয়ে ধনুকের মত পেছনে বাঁকা হয়ে গেল হাওয়ার্ডের শরীর। মাটির ওপর থেকে ফুটখানেক ওপরে উঠে গেল পিঠ। ধড়াস করে পড়ল আবার।
ততক্ষণে দ্বিতীয় মেশিনটা নিয়ে এসেছে ডাক্তারের সহকারী। কিন্তু ওটার আর প্রয়োজন নেই। চালু হয়ে গেছে হৃৎপিণ্ড।
মনিটরও সচল হয়ে গেছে আবার। কোন্ জাদুবলে আবার চার্জ হয়ে গেছে ওটার ব্যাটারি। সবুজ রেখাটা ঢেউ তুলতে শুরু করেছে। কানে স্টেথো লাগানোই আছে ডাক্তারের। নিখুঁত, স্পষ্ট হার্টবীট কানে বাজছে তার। সুস্থ, সবল মানুষের হৃৎপিণ্ডের মত। খানিক আগে যে মারাত্মক অ্যাটাক হয়েছিল, তার কোন লক্ষণই নেই।
অবিশ্বাসীর দৃষ্টিতে হাওয়ার্ডের দিকে তাকিয়ে আছেন ডাক্তার আর তার দুই সহকারী।
হার্ট তো চলছে! চালু হলো কি করে?,
বুঝতে পারছেন না ডাক্তার। এতক্ষণে চোখ পড়ল বিলির ওপর। খানিক দুরে দাঁড়িয়ে আছে সে। চোখাচোখি হতেই হাসি ছড়িয়ে পড়ল মুখে। সিনেমার অভিনেতাদের কায়দায় কাঁধ ঝাঁকাল। কোন ব্যাখ্যা দেয়া থেকে বিরত রইল।
হিরো হয়ে গেল সে। এমন হিরো, যাকে সবাই ভালবাসে।
ওকে নিয়ে এখন গর্ব বোধ করবে মিলি। আপন করে পাওয়ার জন্যে অস্থির হবে।
বিলির অন্তত তা-ই মনে হলো।
.
১০.
হিলটাউন কমিউনিটি হাসপাতালের নার্স স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছে কিশোর। জোসেফ হাওয়ার্ডের সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছে। কিন্তু ইমার্জেন্সি বিভাগের এক কেবিনে সেই যে তাঁকে নিয়ে গিয়ে দরজা আটকে দিয়েছেন ডাক্তাররা, আর খোলার নাম নেই। দেখা করার ব্যাপারে ক্রমেই নিরাশ হয়ে পড়ছে সে।
কিন্তু সময়টা অহেতুক নষ্ট হতে দিচ্ছে না। বিলি ফক্সের মেডিক্যাল ফাইলের পাতা ওল্টাচ্ছে। প্রথমবার এসেছিল বজ্রপাতের শিকার হয়ে। রাতের বেলা। দ্বিতীয়বার হার্ট অ্যাটাক হয়ে, মাস পাঁচেক আগে। ঘাড়, মাথা আর পিঠে প্রচণ্ড ব্যথা হচ্ছিল। কয়েকদিন রাখার পর ডাক্তাররা লক্ষ করলেন প্রি-এগজিস্টিং কনডিশনে রয়েছে সে। ডাক্তারি পরিভাষায় এসে বলে অ্যাকিউট হাইপোকেলামিয়া।
একটা ধারণা রূপ নিতে শুরু করল কিশোরের মনে। মুসার দিকে তাকাল। জানালায় দাঁড়িয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে সে। রবিনকে পাঠিয়েছে ডক্টর এলিজাকে ফোন করতে। এলিজাকে পেলে তাকে দিয়ে কমিউনিটি হাসপাতালের ডাক্তারদের ফোন করিয়ে জেনে নেবে হাওয়ার্ডের অবস্থা।
পেছনে একটা শব্দ হলো।
ফিরে তাকাল কিশোর।
হলওয়ের ওয়াটার কুলারটার কাছে দাঁড়িয়ে আছে মিলি হাওয়ার্ড। হাত থেকে পড়ে যাওয়া পেপার কাপটার দিকে চোখ। মেঝেতে পানি।
মোছার জন্যে নিচু হতে গেল সে।
দাঁড়াও, পা বাড়াল কিশোর, আমি মুছে দিচ্ছি।
তাড়াতাড়ি পড়ে যাওয়া কাপটা, তুলে ওয়েস্টবাস্কেটে ফেলল। একটা পেপার টাওয়েল দিয়ে মেঝের পানি মুছে আরেকটা কাপে পানি ভরে বাড়িয়ে দিল মেয়েটার দিকে।
থ্যাংক ইউ, কাঁপা কাঁপা গলায় বলল মিলি।
তাকিয়ে আছে কিশোর। হাওয়ার্ডের মেয়ে। একে ধরেই তাঁর কাছে যেতে হবে এখন।
মেয়েটী ভীত এবং ক্লান্ত।
কেন?
বাবার জন্যে দুশ্চিন্তায়?
মিলি, সহানুভূতির সুরে বলল কিশোর, তোমার বাবার জন্যে আমি দুঃখিত।
থ্যাংক ইউ, আবার বলল মিলি। ভাল করে তাকাল কিশোরের দিকে। চোখে জিজ্ঞাসা।
ওকে অনিশ্চয়তার মধ্যে রাখল না কিশোর। জানাল, আমার নাম কিশোর পাশা। সখের গোয়েন্দা। হাত নেড়ে মুসাকে ডাকল। পরিচয় করিয়ে দিল, ও আমার বন্ধু ও সহকারী, মুসা আমান। এখানকার লোক নই আমরা। রকি বীচ থেকে এসেছি।
মাথা ঝাঁকিয়ে বলল মিলি, চিনতে পেরেছি। কাল আমাদের গ্যারেজে গিয়েছিলে তোমরা।
কিশোরও মাথা ঝাঁকাল। জানি, তোমার মন এখন খুব খারাপ। তবু কয়েকটা প্রশ্ন করতে চাই।
মাথা নাড়ল মিলি। হাসি ফোঁটাল মুখে। না না, মন ঠিক হয়ে গেছে। কি জানতে চাও?
বিলি ফক্সের ব্যাপারে।
মুহূর্তে মুখের ভাব বদলে গেল মিলির। বোঝা গেল, সে অনেকই কিছুই জানে।
অ্যাক্সিডেন্টের জায়গায় ও গিয়েছিল, তাই না? জিজ্ঞেস করল কিশোর।
ঝিক করে উঠল মিলির চোখ। এ দৃষ্টি কিশোরের চেনা। কোণঠাসা শিকারি জানোয়ারের চোখে দেখেছে। তারমানে মিলি জানে বিলি ফক্সই কিছু করেছে। কি করে জানল?
হ্যাঁ, গিয়েছিল। আর কিছু জানার আছে? অধৈর্য কণ্ঠে মিলি বলল, তাড়াতাড়ি করো, প্লীজ। আব্বাকে দেখতে যাব।
কিশোরকে চুপ করে ভাবতে দেখে দরজার দিকে এগিয়ে গেল মিলি। কেবিনের দরজার কাছে গিয়ে ফিরে তাকাল একবার। তারপর ঢুকে দরজাটা লাগিয়ে দিল।
জানালা দিয়ে ওকে দেখতে পাচ্ছে কিশোর। বাবার বিছানার পাশে একটা চেয়ারে বসল। বেহুশ হয়ে আছেন হাওয়ার্ড। প্রায় ডজনখানেক মেশিনের সঙ্গে তার আর নল দিয়ে যুক্ত করে দেয়া হয়েছে তার শরীর।
ওই যে, রবিন এসেছে, পেছন থেকে বলে উঠল মুসা।
