ট্রাকের কাছে দাঁড়িয়ে আছেন শেরিফ। ড্রাইভারের স্টেটমেন্ট নিচ্ছেন।
হাওয়ার্ডের বুকের ব্যথাটা কমছে না। বরং বাড়ছে। বুক ডলতে ডলতে ঘন ঘন শ্বাস নিচ্ছেন। শ্বাস নিতেও কষ্ট। একবারে বাতাস টেনে ফুসফুস ভরে না ফেলে অল্প অল্প করে টানছেন।
ফিরে তাকাতে তাঁর ওপর চোখ পড়ল ডেপুটির। কি হয়েছে, মিস্টার হাওয়ার্ড? এমন লাগছে কেন আপনাকে? অসুস্থ নাকি?
সমস্যাটা বলতে যাচ্ছিলেন হাওয়ার্ড, এই সময় ভিড়ের কিনারে একটা পরিচিত মুখ চোখে পড়ল।
বিলি ফক্স! ওকে এখানে দেখবেন ভাবেননি
একটা অদ্ভুত অনুভূতি হলো তার। মনে হলো বুকের মধ্যে ঢুকে গেছে। বিলি। ব্যথাটাকে জুলুনি থেকে আস্তে আস্তে ঠেলে ভয়াবহ যন্ত্রণার দিকে নিয়ে। যাচ্ছে। বুকের মধ্যে আগুন জ্বলতে আরম্ভ করল যেন তার।
বিলি কি করে তার ভেতরে ঢুকবে! এই উদ্ভট ভাবনা কেন?
অনুভূতিটা কিছুতেই যাচ্ছে না মন থেকে। হৃৎপিণ্ড খামচি দিয়ে ধরে তাকে খুন করছে ছেলেটা।
ডেপুটির দিকে ফিরে কথা বলার জন্যে মুখ খুললেন। যন্ত্রণাকাতর একটা গোঙানি বেরোল, শুধু। ব্যথার আরেকটা বর্শা এসে ঘ্যাঁচ করে বিধল যেন হৃৎপিণ্ডে। চোখের সামনে মহাসড়কটা আবছা হয়ে এল।
হাওয়ার্ডের দেহটা বাঁকা হয়ে যেতে দেখল ডেপুটি। গাড়ি সরানো বাদ। দিয়ে দৌড়ে এসে ধরে ফেলল তাঁকে।
*
ভিড়ের কিনারে দাঁড়িয়ে আরও অনেকের সঙ্গে স্বরচিত বাস্তব নাটকটা দেখছে বিলি।
কি হলো, বিলি? শঙ্কিত কণ্ঠে জানতে চাইল পটেটো।
কানেই তুলল না বিলি। জবাব দিল না।
হাওয়ার্ডের হৃৎপিণ্ডটা তার বুকের খাঁচায় বেঁচে থাকার জন্যে আকুলি বিকুলি করছে। রাস্তার ওপর শুইয়ে দেয়া হয়েছে তাঁকে। চিৎকার করে। ডাক্তারদের ডাকছে ডেপুটি।
হাওয়ার্ডকে মাটিতে দেখে দৌড়ে এলেন একজন ডাক্তার।
আপনমনে হাসল বিলি। কিছুই করতে পারবে না ওরা, ভাবল সে। বোকার দল। চেষ্টাই হবে সার। কাজের কাজ কিছু হবে না।
কি হয়েছে? চিৎকার করে জানতে চাইলেন ডাক্তার।
হাওয়ার্ডের পাশ থেকে উঠে গিয়ে ডাক্তারকে জায়গা করে দিল ডেপুটি। বুঝলাম না! বেহুশ হয়ে গেলেন হঠাৎ!
ভাল করে দেখার জন্যে পাশে সরল বিলি।
পটেটোও সরে এল তার সঙ্গে সঙ্গে।
হাওয়ার্ডের গলার কাছে আঙুল চেপে ধরে নাড়ী দেখছেন ডাক্তার।
আনমনে মাথা নাড়ছে বিলি। যেন ক্রিকেট খেলায় নিজের দলকে হারতে দেখে হতাশ হয়েছে খুব।
নাড়ী তো নেই! এক সহকারীর দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠলেন। ডাক্তার। জলদি ব্যাগটা নিয়ে এসো!
অ্যামবুলেন্সের দিকে দৌড় দিল সহকারী।
লম্বা দম নিয়ে পা বাড়াল বিলি।
তার হাত খামচে ধরল পটেটো।
ঝাড়া মেরে সরিয়ে দিল বিলি।
কি করছ? ফিসফিস করে বলল আতঙ্কিত পটেটো। চলো, পালাই!
ঠাণ্ডা, চিকন ঘাম ফুটেছে তার কপালে।
কিন্তু ফিরেও তাকাল না বিলি। এগিয়ে চলল দৃঢ়পায়ে।
শার্টের বুকের কাছটা খুলে ফেলেছেন ডাক্তার। স্টেথো লাগিয়ে দেখতে শুরু করলেন। তার মুখের ভঙ্গিই বলে দিচ্ছে হাওয়ার্ডের অবস্থা।
খুব খারাপ!
মুমূর্ষ বসের দিকে এগিয়ে চলেছে বিলি। কেউ লক্ষ করল না তার উপস্থিতি। কিংবা করলেও গুরুত্ব দিল না। সবাই উত্তেজিত। নানা কারণে। কার্ডিয়াক কিট নিয়ে দৌড়ে এল ডাক্তারের সহকারীরা। প্রথমজনের সঙ্গে আরও একজন এসেছে। ডাক্তার তখন হাওয়ার্ডের বুকে ম্যাসেজ করছেন। জাগিয়ে তুলতে চাইছেন নিথর হয়ে পড়া হৃৎপিণ্ডটাকে।
দ্রুতহাতে হাওয়ার্ডের শরীরে ইলেকট্রোডের তার লাগানো শুরু করল ডাক্তারের সহকারীরা। একঘেয়ে শব্দ কানে আসছে বিলির। মনিটরে দেখতে পাচ্ছে হার্টের গতিবিধির সবুজ রেখাটা। আঁকাবাকা ঢেউ তোলার বদলে স্থির হয়ে আছে।
পাম্প শুরু করলেন ডাক্তার। হৃৎপিণ্ডটাকে সতেজ করার আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগলেন।
মেশিনের সঙ্গে যুক্ত তারগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে বিলি। সিনেমায় কারও হার্ট অ্যাটাক হলে হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে এভাবে তার লাগায়, দেখেছে সে।
কিছুতেই কিছু করতে না পেরে সহকারীর দিকে তাকালেন ডাক্তার, তিনশো জুল দাও।
দিয়েছি। চার্জ হয়ে আছে, জবাব দিল এক সহকারী।
কই, হয়নি তো।
কিন্তু আমি তো দিয়েছি…
হাঁ করে যন্ত্রের দিকে তাকিয়ে আছেন ডাক্তার এবং তার দুই সহকারী। মাটিতে পড়ে থাকা মানুষটার মতই যন্ত্রও নিথর। মৃত।
মনে মনে হাসল বিলি। যন্ত্রের ব্যাটারি শুষে নেয়া কিছুই না তার জন্যে। ট্রাফিক লাইট বদলে দেয়ার চেয়ে অনেক সহজ।
ঘটনাটা কি? কাজ করছে না কেন? অবাক হয়ে গেছেন ডাক্তার। যাও তো, আরেকটা নিয়ে এসো।
উঠে আবার অ্যামবুলেন্সের দিকে দৌড় দিল এক সহকারী। অন্যজন ডাক্তারের সঙ্গে বসে মেশিনটা চালানোর চেষ্টা করেই চলেছে।
পায়ে পায়ে কাছে এসে দাঁড়াল বিলি।
নড়ে উঠল হাওয়ার্ডের চোখ। তার কথা তিনি শুনতে পাবেন কিনা, বুঝবেন কিনা জানে না বিলি। বোঝার চেষ্টাও করল না। তার কাজ এখন সে করে যাবে। বিড়বিড় করে শান্ত, মোলায়েম কণ্ঠে বলল, চিন্তা করবেন না, মিস্টার হাওয়ার্ড। টিভিতে কি করে ভাল করে ওরা আমি দেখেছি।
ডান হাতের আঙুলগুলো ছড়িয়ে সামনে বাড়িয়ে ধরল দুই হাত। হাওয়ার্ডের বুকের দিকে তাক করল।
জীবন আর মৃত্যুর সন্ধিক্ষণ এক অদ্ভুত জিনিস, ভাবল বিলি। একে নিয়ন্ত্রণ করা কি সাংঘাতিক উত্তেজনার কাজ!
