ফিরে তাকাল কিশোর।
কাছে এসে দাঁড়াল রবিন। ডাক্তারদের সঙ্গে কথা বলেছে এলিজা। তাজ্জব হয়ে গেছে ডাক্তাররা।
কেন?
এটা দেখলেই বুঝবে, লম্বা, সরু একটা কাগজ কিশোরের হাতে তুলে দিল রবিন। জোসেফ হাওয়ার্ডের ইলেকট্রোকার্ডিওগ্রাম।
কাগজটার দিকে তাকাল কিশোর। লম্বা, সোজা একটা রেখা। তারপর হঠাৎ করে বেঁকে গিয়ে ছোট-বড় ত্রিকোণ তৈরি করেছে। স্বাভাবিক হার্টবীটের সঙ্কেত। মাঝে মাঝে বর্শার মত চিহ্ন রয়েছে।
তাকিয়ে থাকতে থাকতে কিশোর জিজ্ঞেস করল, এটা দেখে কি বুঝব? ডাক্তারি বুঝি না আমি।
রবিন বলল, একজন নার্স আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছে। এই যে বর্শার মত জিনিস, এগুলো হার্ট চালু হওয়ার সময়কার… তখন কোন ধরনের বৈদ্যুতিক অনুপ্রবেশ ঘটেছিল হাওয়ার্ডের হৃৎপিণ্ডে।
তো?
ডাক্তার বলছেন ডিফাইব্রিলেটরে চার্জ ছিল না। প্যাডেলগুলো অচল ছিল।
খাইছে! বলে উঠল মুসা, গ্রীক ভাষা বলছ নাকি?
না, ডাক্তারি শব্দ। আমিও বুঝি না। আমাকে যা বলা হলো, তাই উগরে দিলাম।
মোদ্দা কথাটা কি তাই বলো? হাতের কাগজটা নাচিয়ে জিজ্ঞেস করল কিশোর।
হার্ট এভাবে চালু হওয়ার কোন ব্যাখ্যা দিতে পারছেন না ডাক্তাররা। মরা হার্ট হঠাৎ চালু হয়ে গেল।
মুসার দিকে তাকাল কিশোর।
অজ্ঞতার ভঙ্গি করে হাত ওল্টাল মুসা।
আবার রবিনের দিকে ফিরল কিশোর। এবার এসো, আমি তোমাকে একটা জিনিস দেখাই। নার্স স্টেশনের ফাইল র্যাকের দিকে এগোল সে। বিলি ফক্সের ফাইলটা তুলে নিয়ে বাড়িয়ে দিল। নাও। দেখো। বিলি ফক্স ভর্তি হয়েছিল এ হাসপাতালে। ওর মেডিক্যাল চার্টটা দেখো…
ফাইলটা হাতে নিয়ে দ্রুত পাতা উল্টে চলল রবিন। একটা পাতার পাশে লেখা নোটে আঙুল বোলাতে বোলাতে পড়ল। থেমে গেল একটা লাইনে এসে। মাথা নাড়তে নাড়তে বলল, এ তো অদ্ভুত কথা! ব্লাড টেস্ট অ্যাকিউট হাইপোকেলামিয়া শো করছে!
মুচকি হাসল কিশোর। রবিনের চোখেও পড়ল তাহলে। পড়ে কিনা, এটাই দেখতে চেয়েছিল সে।
কিশোরের দিকে তাকাল রবিন। ইলেকট্রোলাইট ইমব্যালান্স, তাই?
হ্যাঁ।
এবং ইলেকট্রোলাইট আমাদের শরীরে বৈদ্যুতিক স্পন্দন সৃষ্টি করে।
হ্যাঁ। হার্টের প্রতিটি বীটের সময়… চুপ হয়ে গেল রবিন। দীর্ঘ একটা মুহূর্ত কিশোরের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। কি বলতে চাইছ তুমি?
এটা আমার ধারণা মাত্র, রবিন। নিশ্চিত হয়ে বলতে পারছি নাতবু, যদি ধরে নিই, বিলির শরীরের ইলেকট্রোলাইট ইমব্যালান্স ওকে প্রচণ্ড ক্ষমতার অধিকারী করে তুলেছে? অন্যান্য বিদ্যুৎ-উৎপাদনকারী প্রাণীর মত সে-ও তার নিজের দেহে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে? অস্বাভাবিক হাই-ভোল্টেজ?,
হা করে তাকিয়ে আছে মুসা। এতটাই অবাক হয়েছে, যেন ভূত দেখতে পাচ্ছে সামনে।
কতটা হাই? অবাক রবিনও হয়েছে।
ইলেকট্রোকার্ডিওগ্রামের কাগজটা নাচাল আবার কিশোর, যতটা হলে একজন মানুষের হৃৎপিণ্ড নিয়ে খেলা করতে পারে কেউ। কাবাব করতে। পারে, আবার মরাটাকে জ্যান্ত করে তুলতে পারে।
ফ্যান্টাসি, কিশোর! রূপকথা মনে হচ্ছে! মাথা নাড়তে নাড়তে রবিন বলল, মানুষের শরীর কখনও বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে না।
মানুষের শরীর এবং মন সম্পর্কে কখনোই শিওর হয়ে বলা যায় না কিছু। অনন্ত শক্তির অধিকারী মানুষের মন। মনের শক্তি দিয়ে কি না করতে পারে মানুষ? শরীরটাকেও মনের জোরে ইচ্ছেমত চালাতে পারে। ভারতীয় যোগীদের কথাই ধরো। কিংবা ব্যালে ড্যান্সাররা। ওরা যে সব কাণ্ড করে, আমরা জানি বলে এখন আর অবাক লাগে না। হঠাৎ করে দেখলে কি বিশ্বাস করতে পারতাম? সবচেয়ে বড় কথা, অন্য প্রাণী যে কাজটা করতে পারে, মানুষ কেন সেটা করতে পারবে না? কেন নিজের দেহে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবে না?
পারবে, যদি তার শরীরে ওই প্রাণীদের মত বিশেষ যন্ত্রগুলো থাকে।
হ্যাঁ, যদি থাকে। উত্তেজিত ভঙ্গিতে রবিনের দিকে এক পা এগোল কিশোর। কিংবা তৈরি করে দেয়া যায়!
মানে? বুঝতে পারল না রবিন।
এমন হতে পারে, রবিনের কথা যেন শুনতেই পায়নি কিশোর, বিলি ফক্সের শরীর সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেক অনেক বেশি বিদ্যুৎ সহ্য করতে পারে। ফুলগারাইটে পাওয়া ওর জুতোর ছাপ আমার মাথায় এধারণাটা ঢুকিয়েছে। বজ্রপাতে লক্ষ লক্ষ ভোল্টেজ বিদ্যুৎ শরীরে প্রবেশ করেছে ওর, পা বেয়ে মাটিতে নেমে গেছে। কোন ক্ষতি হয়নি ওর। লাভ হয়েছে। শরীরের বিশেষ কোষে কোষে জমা করে নিয়েছে সেই শক্তি, ব্যাটারির মত।
কি বলছ তুমি! ওকে কোন ধরনের লাইটনিং রড মনে করছ?
শুধু রড নয়, ও নিজে একটা জেনারেটরও বটে, শান্তকণ্ঠে বলল কিশোর, এই শক্তি দানবে পরিণত করেছে তাকে। ফ্রাঙ্কেনস্টাইন। আবার আঘাত হানার আগেই ঠেকাতে হবে এই দানবকে।
তোমার কথার মাথামুণ্ড আমি কিছু বুঝতে পারছি না, কিশোর! এমন ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে মুসা, যেন পাগল হয়ে গেছে কিশোর। সারা জীবন আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করেছ ভূত বিশ্বাস করি বলে, এখন নিজেই…
হাসল কিশোর, ভূত আমি এখনও বিশ্বাস করি না, মুসা। এখানে যেটা ঘটছে, যা দেখতে পাচ্ছি, সেটা পিওর সায়ান্স, খাঁটি বিজ্ঞান। দেখেও অস্বীকার করি কিভাবে?
.
১১.
পাঁচ মাস আগে হঠাৎ করেই জানতে পারে বিলি, এক সাংঘাতিক ক্ষমতা তৈরি হয়েছে ওর মধ্যে।
প্রথম যেদিন বজ্রপাতের শিকার হলো, সেদিনকার কথা মনে পড়ল তার। রাত করে ভিডিও আর্কেড থেকে বাড়ি ফিরছে। মাঠের মধ্যে দিয়ে চলেছে। হঠাৎ কালো হয়ে গেল আকাশ। ঘন ঘন বিদ্যুৎ চমকানো শুরু হলো। হিলটাউনে এটা কোন নতুন ঘটনা নয়। ঝড়বৃষ্টি আর বজ্রপাতের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে গেছে এখানকার অধিবাসীরা। তাই বিশেষ গুরুত্ব দিল না বিলি। তাড়াহুড়ো না করে স্বাভাবিক গতিতেই হেঁটে চলল বাড়ির দিকে।
